• মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬
ads

মুক্তমত

ইয়েমেন সংকট ও সৌদি আরবের ভূমিকা

  • হিমেল আহমেদ
  • প্রকাশিত ১২ জুন ২০১৯

ইয়েমেন সংকট সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাসীর মনে দাগ কেটেছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এটি কেবল একটি যুদ্ধাহত দেশ নয়। বর্তমানে ইয়েমেন স্মরণকালের সর্বোচ্চ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে, যা থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায়ই দেখা যাচ্ছে না। যতদিন যাচ্ছে ততই ইয়েমেন সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। আর বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের ফলে দেশটি বর্তমানে ইতিহাসের চরম মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে। অচিরেই এই যুদ্ধ থামানো না গেলে বিশ্ব একটি মানব সভ্যতাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে। ক্ষমতা আর আধিপত্যের লোভে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে ইয়েমেন। আরববিশ্বের সুন্দর এই দেশটিতে সৌদি আরবের আগ্রাসন এবং ইরানের পরোক্ষ সাহায্য দেশটির হাজার হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে, যার অধিকাংশই রয়েছে নারী ও শিশু। যুদ্ধ, রোগ ও চরম দুর্ভিক্ষের কারণে দেশটির অধিকাংশ শিশু মরছে। আর জীবিতরা খাবার ও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর অপেক্ষা করছে।

ইয়েমেনের সংকটের শুরু ২০১১ সালে আরববসন্ত থেকে। ইয়েমেন তখন এক প্রকার অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দুর্নীতি আর দরিদ্রতায় ছেয়ে গিয়েছিল দেশটি। তখনি বিদ্রোহ করে বসে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। সরকারের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন সহজ ছিল না। সৌদিপন্থি শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহর পলায়ন এবং ইরানপন্থি শিয়া হুতিদের রাজধানী সানা দখল ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। আর এই গৃহযুদ্ধই বর্তমানে মারাত্মক রূপ নিয়েছে। পলায়নরত ইয়েমেনের শাসক হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদিতার অভিযোগ এনে সৌদি আরবের সাহায্য চান। ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা শুরু হয়। এর পরেই ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। কেননা ইয়েমেন হলো আরববিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশ। দেশের দুই দলের কোন্দল যে গৃহযুদ্ধে রূপ নেবে এমনটা ভাবেনি কেউ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধটা আসলে সৌদি আরব ও ইরানের। ইয়েমেনের শাসনকর্তা আবদুল্লাহ সালেহ মূলত সৌদিপন্থি আর বিদ্রোহী দল শিয়া হুতিরা হলো ইরানপন্থি। সমস্যাটা এখানেই। উভয় রাষ্ট্র মুসলমান হলেও মাজহাবগত সমস্যা যুদ্ধকে বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হয়। সৌদি আরব চায় তার সমর্থিত সরকারকে পুনরায় ইয়েমেনে প্রতিষ্ঠিত করতে। আর ইরান চায় হুতিদের। সৌদির এই জোটকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স। প্রথমদিকে সৌদি কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে এই যুদ্ধ। কিন্তু চার বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হয়েছে এই যুদ্ধ যা এখনো চলছে। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের ইরান সাহায্য করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সৌদিকে ইসলাম ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু বলা হয়। মুসলমানদের তীর্থস্থান হলো সৌদি আরব। তাই ইয়েমেনে হামলা করার আগে সৌদিকে ভাবা উচিত ছিল ইয়েমেন আরববিশ্বের একটি মুসলমান রাষ্ট্র। বর্তমানে ইয়েমেনের যে করুণ অবস্থা তার জন্য দায়ী সৌদি আরব ও ইরান। সৌদি আরবের হামলায় ইয়েমেনে হাজার হাজার মসজিদ ও ইসলামিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। মারা গেছে হাজারো নিরীহ বেসামরিক মানুষ। গত চার বছরে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যার অধিকাংশ নারী ও শিশু। বর্তমানে সৌদি অবরোধের কারণে দেশটি প্রচণ্ড খাদ্যাভাবে পড়েছে। দেশটির ৮০ ভাগ মানুষ খাদ্যাভাবে ক্রমেই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এসব মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। ইয়েমেনে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসকে মুসলিম বিশ্ব মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। সৌদি আরবের এরূপ হত্যাযজ্ঞ সারা বিশ্বে ঘৃণিত হচ্ছে। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৫ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইয়েমেনে অন্তত সাত হাজার ২৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১১ হাজার ১৪০ জন। নিহতদের ৬৫ শতাংশই সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলায় প্রাণ হারায়। তবে এই গৃহযুদ্ধের ওপর নজর রাখা একটি জরিপ জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যে পরিসংখ্যান তৈরি করেছে, তাতে বলা হয়েছে ২০১৬ সাল থেকে বেসামরিক ও যোদ্ধা মিলে ৬৭ হাজার ৬৫০ জন নিহত হয়েছে। আরো কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে অপুষ্টি, রোগ আর খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে। আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার জানিয়েছে, এই যুদ্ধে ৫৭ হাজারেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে। ফরাসি ত্রাণ সহায়তাকারী সংস্থা অ্যাকশন কন্ট্রালা ফেইম বলছে, ইয়েমেনে এই গৃহযুদ্ধের কারণে ৩৩ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতীয় পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে ইয়েমেনে গত তিন বছরে ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং তার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। আর জীবিতদের মধ্যে বিশেষ করে ইয়েমেনের শিশুদের অতি শীঘ্রই চিকিৎসা ও খাদ্য প্রয়োজন। ইয়েমেনের মূল বন্দরেই যুদ্ধ হওয়ার কারণে কোনো ত্রাণসামগ্রী কিংবা সাহায্য যুদ্ধাহতদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে দুর্ভিক্ষ স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্টের একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুদ্ধবিরতি না হলে মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ৩৩ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই হবে শিশু, যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস বলছে, এই বছরের শেষে সরাসরি যুদ্ধের কারণে মারা যাবে ১ লাখ ২ হাজার মানুষ এবং বাকি ১ লাখ ৩১ হাজার মানুষ মারা যাবে খাবার এবং চিকিৎসা সংকটের কারণে। গরিব ও ছোট মিলিয়ে এই দেশটির মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ৪০ লাখ। এর মধ্যে ৮০ ভাগ মানুষেরই মানবিক সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রয়োজন। অন্তত দুই কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা প্রয়োজন। অধিকাংশ মানুষ জানে না পরবর্তী খাবার তারা কখন খেতে পারবে। সম্প্রতি জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইয়েমেনে প্রতি মিনিটে ১২টি শিশু মারা যাচ্ছে। যুদ্ধের চেয়ে সৌদি অবরোধের কারণেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকভাবে এই যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবুও কোনো সুরাহা মিলছে না। এই মুহূর্তে সৌদি আরবকে ইয়েমেনে অবরোধ শিথিল করা উচিত। নিরীহ, নির্দোষ বেসামরিকদের হত্যার অধিকার কারো নেই। ইরান, সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের সবাই ইয়েমেন রক্ষায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসবেন এমনটাই প্রত্যাশা বিশ্ববাসীর। অচিরেই ইয়েমেন সংকটের অবসান ঘটুক। রক্ষা পাক একটি প্রাচীন মানব সভ্যতা।

লেখক : নিবন্ধকার

imparfectheemel@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads