• বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৫
ads
ইংরেজি ভাষা শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

ইংরেজি ভাষা শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব

  • প্রকাশিত ১৬ জুলাই ২০১৯

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হলেও ইংরেজি আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষা। বলা যায় ইংরেজি আমাদের দ্বিতীয় ভাষা। এটা ঠিক, ব্রিটিশরা প্রায় দুইশ বছর এই উপমহাদেশ শাসন করে তাদের ভাষা ইংরেজি এখানে প্রবর্তন করেছিল। ব্রিটিশ আমলে এদেশের পাঠ্যপুস্তক ইংরেজিতেই পঠিত হতো। ব্রিটিশ সরকার তাদের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনার জন্য ইংরেজি ভাষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু ইংরেজ আমলে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা বিস্তারে বা বলার ক্ষেত্রে হিন্দুধর্মের অনুসারীরা যেভাবে স্বাগত জানিয়েছিল, মুসলিমরা সেভাবে স্বাগত জানায়নি। এ প্রসঙ্গে আমি আমার মায়ের বিষয়ে কিছু বলতে চাই, তা হলো গত চল্লিশের দশকে তিনি তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং পঞ্চম শ্রেণি শেষে দাদার নিষেধের কারণে ওনার (মায়ের) আর বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। কারণ ওই একটাই- দাদা তার নাতনিকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে আগ্রহী ছিলেন না। আমার মা আজো ইংরেজি বলতে ও লিখতে পারেন না। এটা তার জন্য একটি বিরাট দুঃখ। আমি মাঝে-মধ্যে মাকে ইংরেজি পড়ে শোনালে এবং আমার ইংরেজি বলার ধরন শুনে তিনি খুব খুশি হন এটা আমি বুঝি।

যাহোক, আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে যখন প্রত্যাশিত মানের ইংরেজি ভাষাজ্ঞান না পাই, তখন মনটা ব্যথিত হয়। আমরা জানি, চারটি মানদণ্ডের ওপর ইংরেজি ভাষার দক্ষতা নির্ভর করে। এগুলো হলো শোনা, বলা, পড়া ও লেখা। আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এগুলোর চর্চা নেহাত কম। তাই তো আমরা দেখছি এদেশের প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ইংরেজির ভিত অত্যন্ত দুর্বল। জাতীয় পর্যায়ের এক জরিপে দেখা যায়, প্রাথমিকে তৃতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বিষয়ের পঠন-পাঠন আশানুরূপ নয়। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর ইংরেজি ভাষাজ্ঞান অত্যন্ত দুর্বল। তারা ভালো করে ইংরেজি পড়তে ও লিখতে পারে না। আর মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এটা তো ঠিক যে, বিশেষজ্ঞ ইংরেজি স্যারের অনেক চাহিদা। তারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষন-শিখনকে শ্রেণিকক্ষে দেওয়া অপেক্ষা কোচিং সেন্টারে দিতেই বেশি আগ্রহী। তাই তো অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা এসব কোচিং সেন্টারে রীতিমতো লাইন দিয়ে তাদের (শিক্ষার্থীদের) নাম রেজিস্ট্রেশন করিয়ে থাকেন। একটি ব্যাচে অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়ে একজন শিক্ষকের পক্ষে পাঠদান যতটুকু না ফলপ্রসূ হয়, তার থেকেও এখানে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যের চিত্রটি ফুটে ওঠে। বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের কাছে ইংরেজি শেখাতে পাঠিয়ে অভিভাবকরা একটু তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন।

কিন্তু বাস্তবতা কী? অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা কতটুকু ইংরেজি শিখছে, এটি একটি পরিসংখ্যান থেকে সহজে অনুধাবন করা যায়। আর সেটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় ৪০ হাজার ৫৬৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র দুজন ইংরেজি বিভাগে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেছিল। ২০১৬ সালে গ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৯০ ভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করে ইংরেজিতে। আমাদের দেশের ইংরেজি বিষয়ের এই তথৈবচ অবস্থা দেখে শিক্ষাবিদরাও হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে একটি শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষার্থীরা যখন ইংরেজিতে দুর্বল থেকে যায়, তখন তা হয় দেশের জন্য বোঝাস্বরূপ। বর্তমান যুগ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। এখানে ইংরেজি ভাষাজ্ঞান প্রয়োগ করেই আমাদের বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়। বিদেশে কর্মসংস্থান (ইংরেজি জ্ঞান ভালো হলে এটি দক্ষতা হিসেবে ভাবা হয়), গবেষণা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা প্রতিটি সেক্টরে রয়েছে ইংরেজির গুরুত্ব। যদিও ইংরেজি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা; তবু ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে আমরা যেন একধরনের লজ্জাবোধ করি। ইংরেজি ভাষাজ্ঞান আমাদের এতই দুর্বল যে, আজকাল ফেসবুকেও দেখছি একের সঙ্গে অন্যের মনের ভাব প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে ইংরেজিতে রূপ দিয়ে লিখছেন। এতে আসলে নতুন বাংলিশের একটি ব্যাপার ঘটছে। মনের ভাব প্রকাশে প্রকৃত ইংরেজি ভাষার ব্যবহার খুব কম দেখা যায়। অনেকে বিএ, এমএ পাস করেও ইংরেজিতে দু-চারটি কথা বলতে পারছে না। এটা কি শিক্ষা ব্যবস্থাপনার চ্যুতি, নাকি ইংরেজি ভাষাশিক্ষা অর্জনে অনীহা- এ বিষয়টি আরো বেশি করে ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

বর্তমানে শিক্ষার চালচিত্র দেখে মনে হয় শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট অর্জনই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা ঠকছে। তারা শিক্ষার গভীরে যেতে পারছে না। যা পড়ছে তা গৎবাঁধা পড়ালেখা। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, নিজের ইংরেজি শিক্ষা অর্জনের আগ্রহ ও দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আজকাল আধুনিক যেসব প্রযুক্তি আমাদের হাতের নাগালে আছে, যেমন— ফেসবুক, ইউটিউবের মতো বিভিন্ন অ্যাপস্ ইত্যাদি ব্যবহার করে ইংলিশ মুভি, বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা ইত্যাদি চ্যানেল নিয়মিত দেখে ও শুনে একজন ইংরেজিতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। ইংরেজি ভাষায় সাবলীলতা অর্জনের জন্য পরিবেশও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিজ পরিবার, বিদ্যালয় বা চারপাশের মানুষজনের সঙ্গে ইংরেজিতে বেশি করে কথা বলার আগ্রহ থেকে ইংরেজি ভাষা প্রয়োগের একটি পরিবেশ হতে পারে। শ্রেণিকক্ষে শিখন-শিখানোর ক্ষেত্রে ইংরেজি ক্লাসে শিক্ষককে যেমন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার মন-মানসিকতা থাকতে হবে, তেমনি শ্রেণিভিত্তিক প্রান্তিক যোগ্যতা ও শিখনফল অর্জন নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষককে। এছাড়া ইংরেজি ভাষার প্রসারে সরকারের উদ্যোগে বয়স উপযোগী বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে। মোদ্দাকথা ইংরেজিতে দক্ষ জনগোষ্ঠী দেশের প্রয়োজনেই গড়ে তুলতে হবে। দেশের উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত করতে এর কোনো বিকল্প নেই।

ইফতেখার হোসেন সিদ্দিকী

লেখক : নিবন্ধকার    

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads