• বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ঘরোয়া সাংবাদিকতায় চলছে অনলাইন পোর্টাল

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

ঘরোয়া সাংবাদিকতায় চলছে অনলাইন পোর্টাল

  • মুহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন
  • প্রকাশিত ১৮ জুলাই ২০১৯

গত ২৬ মে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০টি এবং দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা মিলে রয়েছে আরো ৩ হাজার ৫০০টি পত্রিকা। প্রথমত এটি আশার কথা যে বাংলাদেশে এতগুলো সংবাদমাধ্যম রয়েছে, যার দ্বারা মানুষ নিয়মিত খোঁজখবর জানতে পারছেন। দেশ এবং বিশ্বের হালচাল জানতে পারছেন। দেশের উন্নয়ন সম্পর্কে অবগত হতে পারছেন বা কোথাও অনিয়ম-দুর্নীতি ঘটলে জনগণ তা জানতে পারছেন। তথ্যমন্ত্রী ৩ হাজার ৫০০টি অনলাইন পোর্টালের কথা বললেও বাস্তবে অনলাইন পোর্টালের সংখ্যা আরো অনেক বেশি, যা হিসেবের বাইরে মানে এক কথায় অগণিত। কিন্তু এর সাংবাদিক কারা? এর সংবাদগুলো সংগ্রহ কে করে? যদি ৩ হাজার ৫০০টি পোর্টাল ধরি, আর এক একটি পোর্টালের জেলাভিত্তিক একজন করে অন্তত সংবাদ প্রতিনিধি হিসেব করি তবে সাংবাদিক হওয়ার কথা ২ লাখ ২৪ হাজার। তারপর সম্পাদক মিলে আরো কমপক্ষে ৩ হাজার ৫০০ জন, যদি মাত্র একজন করে সম্পাদক হিসেব করি। আবার জাতীয় পত্রিকায় এভাবে হিসেবে করলে আরো ২ লাখ ২৪ হাজার সাংবাদিক এবং ৩ হাজার ৫০০ জন সম্পাদক হবে। মোট কথা ব্যাপক একটি কর্মসংস্থান হওয়ার কথা এবং ঘরে ঘরে সাংবাদিক হওয়ার কথা। কিন্তু আদৌ কি তা হচ্ছে? বরং সাংবাদিকদের সম্মান কমছে। আগে যেভাবে সাংবাদিকদের সম্মানের চোখে দেখা হতো এখন ঠিক এর উল্টোভাবে দেখা হয়। সাংবাদিক নাম শুনলে প্রথমেই প্রশ্ন চলে আসে- কোন পোর্টাল, কত ফলোয়ার? যদিও পোর্টালের মাধ্যমে কিছু সাংবাদিক তৈরি হচ্ছেন, কিছু নতুন ছেলেমেয়ে সাংবাদিকতায় যুক্ত হচ্ছেন।

দেশের প্রায় ৮৫ ভাগ পোর্টালে সাংবাদিকদের বেতন দেওয়া হয় না। তাই স্বাভাবিকভাবে এসব পোর্টালের সাংবাদিকদের সুযোগসন্ধানী হতে বাধ্য হতে হয়। কারো কাছ থেকে ৫০০ বা ১০০ বা ১০০০ টাকা যা-ই পাওয়া যায় তা গ্রহণ করেন। এছাড়া তাদের উপায় নেই। যার ফলে সাংবাদিকদের ওপর মানুষের আস্থা কমছে। অন্যদিকে সাংবাদিকতার মূলনীতি থেকেও সাংবাদিকরা এক প্রকার দূরে সরে যাচ্ছেন। সাংবাদিকতায় সব ধরনের বাধ্যবাধকতা মুক্ত থাকা, উপহার বা অন্য কোনো সুযোগের বিনিময়ে পক্ষাবলম্বন না করা, কারো স্বার্থ হাসিলের জন্য অর্থের লেনদেনে সংবাদ প্রকাশ না করা, বিজ্ঞাপনকে সংবাদের ছদ্মবেশে প্রকাশ না করা, গুজব না ছড়ানো, আদালত অবমাননা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কিছু না লেখা সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু সাংবাদিকতায় আর সংবাদমাধ্যমের এহেন হালে এর কতটুকু মানা হচ্ছে? আদৌ হচ্ছে না। আর অন্যের লেখা কপি করে নিজেদের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা অবশ্যই বেআইনি।

এখন মোটামুটি স্পষ্ট হলো যে পোর্টালগুলো কীভাবে চলছে! পোর্টালগুলোতে সাধারণত প্রথমে কয়েকদিন বেতন পাবে পাবে করে সাংবাদিকরা সংবাদ তৈরি করে অফিসে পাঠাতে থাকলে যখন দেখেন যে আর বেতন পাচ্ছেন না তখন আর সংবাদ পাঠান না। যে এলাকার বা যেখানকার প্রতিনিধি খবর পাঠান না সেই এলাকায় এই পোর্টালগুলো আবার সাংবাদিক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেন। পরে আবার নতুন কাউকে নিয়োগ দিয়ে আবার দু-এক মাস চলে। এভাবেই চলছে কার্যক্রম। তবে এসব পোর্টালে ৫-৭ জন করে সহসম্পাদক থাকেন। যারা অফিসে বসেই জাতীয় পত্রিকার পোর্টালের নিউজ কপি করে নিজেদের পোর্টালে প্রকাশ করেন। স্বাভাবিকভাবে হুবহু যেহেতু কপি করতে পারেন না, কিছু পরিবর্তন করতে হয়, সেহেতু যিনি স্পটে যাননি অফিসে বসা ছিলেন তিনি কি ঐ কপির বাইরে কোনো তথ্য দিতে পারেন? তিনি যদি আলাদা কোনো তথ্য দিতে চান তবে কি সংবাদটাই পরিবর্তন হলো না? গুজব তৈরি হলো না?  আর যে লোকটি ঘরে মানে অফিসে বসে সাংবাদিকতা করেন তিনি মূল বিষয় কতটুকু অনুধাবন করতে পারেন? এরাই মূলত একজন জীবিত মানুষকে অফিসে বসে সাংবাদিকতা করে মেরে ফেলেন। এসব পোর্টালের ঘরোয়া সাংবাদিক বা অফিস সাংবাদিকদের (সাংবাদিকবিহীন সম্পাদকদের) কাজ। আর এভাবে চলতে থাকলে সাংবাদিক, সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। এসব পোর্টালের আরো একটি বিষয় খুবই মর্মান্তিক যে, এর মধ্যে কিছু পোর্টালের পৃষ্ঠপোষক সরকারদলীয় লোকজন, আবার কিছু বিরোধীদলীয় লোকজন। তাই এ ধরনের পোর্টাল মিথ্যা, গুজব, বানোয়াট তথ্য দিয়ে ভরপুর থাকে। সাংবাদিকতার মূলনীতি যে নিরপেক্ষতা তা এখানে আকাশকুসুম ভাবনার মতো। নিরপেক্ষতা আশা করা বোকার স্বর্গে বাস করার মতো।

তবে আশার বাণী এই যে, গত ৭ জুলাই অনলাইন পোর্টালে বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য প্রকাশ বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। তিনি আরো জানিয়েছেন, কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টাল আছে, অনেক সংবাদ পরিবেশন করে, তার কিছু কিছু হয়তো ঠিক নয়। আমরা বিভ্রান্তিকর বা বিব্রতকর খবর সেখানে দেখতে পাই। এটা বন্ধে যেসব অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলো নিবন্ধনের লক্ষ্যে আবেদনের জন্য ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। এই সময় ১৫ জুলাই পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। আবেদনের সময় শেষ হলে এগুলো পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই করে যোগ্য নিউজ পোর্টালগুলোর নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হবে। আশা করি, এটি বাস্তবায়ন হলে কিছুটা হলেও এসব পোর্টালকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। তারা ভুয়া  সংবাদ-মিথ্যাচার প্রকাশ করতে সাহস করবে না। তবে এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের বা সংবাদপত্রের কি তেমন ভাগ্য পরিবর্তন হবে? আমার মনে হয় হবে না। এক্ষেত্রে যেটি জরুরি সেটি হলো কারা পোর্টালের মালিক? তারা কী করেন? তাদের সাংবাদিকদের বেতন দেওয়ার মতো সামর্থ্য আছে কি না এটি খোঁজ নেওয়া। যদি না থাকে তবে তাদের পোর্টাল বন্ধ করে দেওয়া। আর এটি যদি করা যায় তবেই যারা সব নিয়ম মেনে সংবাদমাধ্যম চালাচ্ছেন তাদের সংবাদপত্রের আরো মানোন্নয়ন ঘটবে এবং এসব মাধ্যমে সাংবাদিক যারা রয়েছেন তাদেরও সুদিন ফিরে আসবে।

মুহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন

লেখক : প্রচার ও প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads