• বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
বড় বন্যার পূর্বাভাস : কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

সিরাজগঞ্জে বন্যায় নারী-শিশুদের দুর্ভোগ

ছবি: বাংলাদেশের খবর

মুক্তমত

বড় বন্যার পূর্বাভাস : কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

  • বিশ্বজিত রায়
  • প্রকাশিত ১৯ জুলাই ২০১৯

চারপাশ পানিতে থইথই। হাওর-বাঁওড়, নদীনালা উপচে রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরে ঢেউ খেলছে বন্যার ঘোলাটে পানি। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বাসযোগ্য স্থান। পল্লী জনপদের বিপর্যস্ত মানুষ মারাত্মক সংকটকাল অতিক্রম করছে। পানিতে ভাসছে ভাটির জনপদসহ দেশের নিম্নাঞ্চল। জীবনযাপনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। তলিয়ে গেছে ফসল, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, শিক্ষাঙ্গন, ঘরবাড়ি ও উঠান। বেড়ে চলেছে পানির প্রবাহ। চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে বন্যার্তরা। চারদিকে পানি থাকায় নিজেরা যেমন অসহায় হয়ে পড়েছেন, তেমনি গবাদিপশু নিয়ে আছেন মহাবিপদে। গো-সংকটের পাশাপাশি খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছে ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জসহ দেশের বন্যাকবলিত লাখ লাখ মানুষ।  

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ১৬ জেলায় নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খবরে বলা হয়, রাঙামাটি, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুরে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১২ লক্ষাধিক মানুষ। এসব এলাকার কয়েকটিতে নদীর পানিবৃদ্ধি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, পুকুর, বীজতলাসহ বিভিন্ন সম্পত্তি। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় কয়েকটি জেলা সদর অন্যান্য এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে বন্যার্তরা আশ্রয়কেন্দ্রসহ উঁচু জায়গাগুলোতে অবস্থান করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিনে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা মধ্যাঞ্চলেও (ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল) ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, সোমেশ্বরী, কংস, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ধরলা, তিস্তা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা নদীর পানি ২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।  

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, সারা দেশে তাদের পর্যবেক্ষণে ৯৩টি পানির সমতল স্টেশন আছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৭টি সমতল স্টেশনের পানি বেড়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ভারতে ভারী বর্ষণে চাপ পড়েছে বাংলাদেশের নদ-নদীর ওপর। যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ পয়েন্ট, গাইবান্ধার ফুলছড়ি পয়েন্ট ও তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি এরই মধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্রের পানি বালাসীঘাট পয়েন্টে ৪৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। উত্তরাঞ্চলের বুড়ি তিস্তা, দেওনাই, চাড়ালকাটা, খড়খড়িয়া, যমুনেশ্বরীর পানি বাড়ছে। এ ছাড়া সিলেটের কানাইঘাট স্টেশনে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। সুনামগঞ্জ অংশে ৮৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। দোহাজারী স্টেশনে সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার ৯২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট ও হবিগঞ্জে কুশিয়ারার পানিও বিপদসীমার উপরে রয়েছে।  

বন্যার আগ্রাসী বহমানতায় ভাসছে অসহায়ত্বের নিরুপায় নিয়তি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ নামের বিদ্ঘুটে বন্যা বৈরিতায় ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের জীবনে নেমে এসেছে মহাদুর্ভোগ। বিশেষ করে গরিব-দুঃখী নিরুপায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অন্নহীন এক অস্বস্তিকর পরিবেশে সময় কাটাচ্ছেন। আমাদের সমাজব্যবস্থা এসব বন্যাসংক্রমিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা যেন বুঝেও বোঝে না। অনেক বিত্তশালী সমাজপতি আছেন, যারা নিজের সুখ-শান্তি এবং আরো চাই নীতিতে বিশ্বাসী। আর রাজনীতির সংস্পর্শে থাকা কিছু চাটুকার হাইব্রিড নেতার কথা বলাটাও ঝুঁকির ব্যাপার। বন্যায় বিপদসংকুল মানুষের জন্য সরকারি বরাদ্দ করা ত্রাণসামগ্রীর বেশিরভাগ অংশ চলে যায় ওদের পকেটে, যারা ফুলে-ফেঁপে হয় হূষ্টপুষ্ট আর পীড়িত জনতা বন্যার ঘোলাটে পানিতে ভেসে বেড়ায় সারাক্ষণ। 

আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। এ সময় অন্যান্য মাসের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি বৃষ্টিপাত হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে হাওরাঞ্চলের প্রতিটি এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। এবার বর্ষার শুরুতেই দেখা দিয়েছে বন্যা। বন্যার কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে খেটেখাওয়া মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বন্যাবিপর্যস্ত মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বন্যার আঘাতই সবচেয়ে ভয়াবহ। অন্যান্য দুর্যোগ কিছু কিছু এলাকায় আঘাত হানলেও বন্যা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। নদীনালা, হাওর-বাঁওড়, খালবিল, ডোবানালা, নিম্নাঞ্চল যখন পানিতে ডুবে গিয়ে রাস্তাঘাটের ক্ষতিসহ সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে, তখন তাকে বন্যা হিসেবে গণ্য করা হয়। তখনকার পরিবেশে গৃহপালিত পশু থেকে শুরু করে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধির সংক্রমণ ঘটে। 

বন্যা মানুষকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেমন- বাড়িঘর ভেঙে বসবাসের অনুপযোগী করে তোলে, ঘের-পুকুরের চাষ করা মাছ ভাসিয়ে নিয়ে যায়, পানিতে তলানো রাস্তাঘাট ভেঙে চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত ও বানের পানিতে ডুবে মানুষ মারা যায় এবং ফসল ডুবিয়ে সর্বস্বান্ত করে কৃষককে। সর্বোপরি চরম বিপদ ও সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হয় বন্যাকবলিত হাওরের জনপদ। প্রায় প্রতি বছরই ছোট-বড় বন্যায় আক্রান্ত হয় হাওরাঞ্চলসহ দেশের নিম্নাঞ্চল। 

জলে ভাসা গ্রামগুলো আজ চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বাড়িঘরে পানি ওঠায় একদিকে খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানির সংকট; অন্যদিকে সাপের মতো বিষাক্ত প্রাণীর ভয় তাড়া করছে বানভাসি মানুষকে। নানা সমস্যায় জর্জড়িত মানুষ একটু সাহায্য-সহযোগিতার আশায় পথ চেয়ে বসে আছে। কিন্তু সরকারি কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে যে ত্রাণ তৎপরতা চলছে তা যথেষ্ট নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছেন- এমন খবর পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া খবরে জানা যায়, যেসব জেলা দুর্গত হতে পারে সেগুলোর পাশাপাশি অন্য জেলাগুলোতেও সমান প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় দুই হাজার প্যাকেট করে মোট ৫০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার পাঠানো হয়েছে। একটি প্যাকেটে চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট, তেল, আটা, মসুরের ডাল, শিশু খাবারসহ একটি পরিবারের সাত দিনের খাবার রয়েছে। এখন পর্যন্ত ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং দুই দফায় সাড়ে ১৭ হাজার টন চাল বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়েছে। তবে সরকারের এই ত্রাণ তৎপরতায় কতটুকু উপকৃত হবে বানভাসি মানুষ সেটা বড় কথা। 

প্রাকৃতিকভাবে বিস্তীর্ণ এই দুর্যোগ ঠেকানোর সক্ষমতা হয়তো কারো নেই। তবে বন্যা চলাকালীন দুর্ভোগ-দুর্গতি নিরসনে সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে সহযোগিতা বানবিপন্ন মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। বানে ভাসা অসহায় মানুষের নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনে নিরন্ন মুখে ত্রাণ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা সংস্থা দিতে পারে দায়িত্ববোধের পরিচয়। কিন্তু বন্যা চলাকালীন এই দায়িত্ববোধ অনেকটা স্তিমিত আকারে দেখা যায়। বন্যাকবলিত মানুষজন এই আপদকালে একটু সাহায্য-সহযোগিতার আশায় চেয়ে থাকলেও কোনো মাধ্যম থেকেই তেমন মেলে না সাহায্য। তবে সরকারের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে যৎসামান্য ত্রাণতৎপরতা চালানো হলও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পান না বানভাসি মানুষ। ছোটখাটো সামাজিক সংগঠনের তরফ থেকে টুকটাক ত্রাণ সহযোগিতার চিত্র চোখে পড়লেও তা কেবল ফেসবুককেন্দ্রিক সস্তা বাহবা কুড়ানোর অভিলাষ ছাড়া আর কিছু নয়। 

২০১৭ সালের অকাল বন্যায় হাওরে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় মানবিক বিপর্যয় ঘটে ওই অঞ্চলে। কিন্তু পরবর্তী বছরেই পানির দেখা পায়নি সেখানকার মানুষ। গত বর্ষা মৌসুমটি ছিল প্রায় পানিশূন্য। রাস্তাঘাট তলানো দূরের কথা, বর্ষায় যে স্বাভাবিক পানি হওয়ার কথা ছিল তা-ও হয়নি। তাই পরের মৌসুমে ফসল বন্ধ্যাত্বের উদ্বেগ কাজ করছিল কৃষক পরিবারে। কারণ বর্ষায় পানিস্বল্পতা দেখা দিলে পলিহীনতায় কৃষিজমি হারায় উর্বরতা। এক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ফসলি জমি। কিন্তু এ বছর বর্ষার শুরুতেই দেখা দিয়েছে বন্যা। মাত্রাতিরিক্ত পানিতে ভাটির সর্বত্র নেমে এসেছে ভোগান্তি। ঘরবাড়িতে পানি উঠে আশ্রয়শূন্য করে তুলেছে মানুষকে। প্রকৃতিসৃষ্ট এই বিপর্যয় হয়তো ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে হাওরপাড়ের মানুষকে প্রকৃতির অভিশাপ বন্যার জলযন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে যথেষ্ট পূর্বপ্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।  

লেখক : সাংবাদিক  

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads