• সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৫
ads
সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ১৯ জুলাই ২০১৯

সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে যে ডিসকোর্সগুলো পশ্চিমা দেশগুলো বিনির্মাণ করে তা অনেকাংশে রাষ্ট্র এবং জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কিত। অর্থাৎ রাষ্ট্রবিরোধী এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড হচ্ছে সন্ত্রাসবাদের একটি অন্যতম রূপ। কিন্তু অনেক সময় জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের স্বার্থ একই পথে অগ্রসর হয় না। জিয়াউল হক ও কিম জং উনের তার জনগণকে ঘাস খাইয়ে বা ভারত সরকারের তাদের কৃষকদের ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে রেখে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা জাতীয় স্বার্থ হতে পারে তবে জনগণের স্বার্থ নয়।

অন্যদিকে রাষ্ট্র অনেক সময় নিজেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আজ পর্যন্ত যত মানুষ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদে নিহত হয়েছে, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হাতে তার তুলনায় খুব কম মানুষ নিহত হয়েছে। রাষ্ট্রের সহিংসতা হচ্ছে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা। ব্যক্তিসহিংসতাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করলেও আমরা প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতাকে খুব সহজে ভুলে যাই। কারণ এর পক্ষে তৈরি হয় শক্তিশালী বয়ান। বর্তমান সময়ের বিখ্যাত দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক স্লাভো জিজেকের মতে, ব্যক্তিসহিংসতার হোতাকে খুব সহজে চিহ্নিত করা গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক সহিংতার হোতাদের চিহ্নিত করা খুবই জটিল কাজ। কিন্তু এ সহিংসতার দায়ভার কিছুটা আমাদের ওপর বর্তায়, যেহেতু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় জনগণের নামে জনগণের কল্যাণে।

পাকিস্তানের বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী একবাল আহমদ, যিনি ফ্রান্স ফানোর সঙ্গে আলজেরিয়া সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধেকে সমর্থন করেন তিনি একটি বই লেখেন ‘ঞবৎৎড়ৎরংস : ঞযবরৎং অহফ ঙঁৎং’ নামে। এ বইতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে তাদের দ্বিমুখী নীতির স্বরূপ উন্মোচন করেন। পশ্চিমা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ শব্দটি সবসময় তাদের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ অর্থে ব্যবহূত হয়। সতেরো ও আঠারোশ শতকে ফরাসি এবং ব্রিটিশ সাহিত্যে সন্ত্রাস শব্দটি ব্যবহূত হতো রেড ইন্ডিয়ানদের ক্ষেত্রে। উনিশ শতকে এ শব্দটি ব্যবহূত হতো টাগসদের বিরুদ্ধে। এরা ছিল উপনিবেশ বিস্তারের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে পশ্চিমা দেশগুলো উপনিবেশ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। সেই যুগে পাশ্চাত্যে এনলাইটেনমেন্টের বিকাশ ঘটে, বিভিন্ন দার্শনিক তখন তাদের চিন্তা-ভাবনা দিয়ে উপনিবেশবাদকে বৈধ করার চেষ্টা চালান। ইউরোপের আলোকায়নের যুগে প্রাচ্য ছিল অন্ধকারে। যোসেফ কনরাডের হার্ড অব ডার্কনেস উপন্যাসে দেখা যায়, উপনিবেশ শক্তি হাতির দাঁত সংগ্রহ করতে গিয়ে আদিবাসী বর্বর ও সন্ত্রাসীদের (উপনিবেশবাদীদের ভাষায়) অবলীলায় হত্যা করছে। কনরাডের এ উপন্যাস নিছক কাল্পনিক উপন্যাস নয়, এটি তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা। তিনি নিজ চোখে পর্যবেক্ষণ করেছেন উপনিবেশবাদের আসল রূপ। এ সবকিছু হচ্ছিল ইউরোপে এনলাইটেনমেন্টের সময়। এই এনলাইটেনমেন্ট গর্ভেই জন্ম নিয়েছিল নাৎসিবাদ এবং ফ্যাসিবাদের ধারণা। এজন্য এমে সেজায়ার বলেছিলেন, ‘এটি আবার কিসের এনলাইটেনমেন্ট, যে এনলাইটেনমেন্টের পরে দুটি বিশ্বযুদ্ধ হলো।’

উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত ধারণা পশ্চিমা বিশ্বে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ লাভ করে। ব্রিটিশদের অধীনে থাকাকালীন ফিলিস্তিনে ইহুদি গুপ্তহত্যাকারীরা ছিল সন্ত্রাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে তারা হয়ে গেল মহান মুক্তিযোদ্ধা। যে আফগান মুজাহিদরা ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যের পরম বন্ধু, তাদের উত্তরসূরিরা একসময় পরিণত হলো পরম শত্রু হিসেবে। সন্ত্রাসবাদ বলতে যদি বর্বরতাকে বোঝায়, তাহলে বোমা ফেলে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা, প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে দেওয়াও সন্ত্রাসবাদ।

পশ্চিমা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে আধিপত্যশীল ডিসকোর্সগুলো বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক। পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমগুলো ইসলাম এবং মুসলিমদের যেন এর জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। এক্ষেত্রে তারা কিছু নির্দিষ্ট দেশকে বেছে নেয়। ভারতেও যে বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী আছে, সেটি তাদের নজরে আসে না। অন্যদিকে সৌদি আরব বা অন্যান্য মক্কেল রাষ্ট্রের সহিংস কার্যাবলিকে খুব সহজেই এড়িয়ে যায়। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও উদারনীতিবাদের ব্যর্থতার ফল হচ্ছে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ। ভিএস নাইপলের মতো ঔপন্যাসিকরা যখন ভারতবর্ষে মুসলমানদের শুধু বিদেশি ও দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন উগ্র হিন্দুত্ববাদকে আরো বেশি শক্তিশালী করে। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘আমরা’ এবং ‘তোমরা’ নামক ধারণার। এ তোমরা হচ্ছে অপর বা প্রতিপক্ষ। এই প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে তখন রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সহিংসতা ব্যাপকভাবে কাজ করে।

সন্ত্রাসবাদ এবং সন্ত্রাসী চিহ্নিতকরণের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে ভাষাগত সমস্যা। এর নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। রাজনৈতিক কৌশল ও গণতান্ত্রিক অপতৎপরতাই এর জন্য দায়ী। একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কারো কাছে সন্ত্রাসী আবার কারো কাছে বিপ্লবী। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পশ্চিমাদের কাছে সন্ত্রাসী। তাই এডওয়ার্ড সাঈদকে পশ্চিমারা বলত প্রফেসর অব টেরর। সাঈদের দোষ ছিল, তিনি শুধু বক্তব্য এবং লেখনীর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্যতা তুলে ধরতেন। তিনি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন তার ‘ওরিয়েন্টালিজম’, ‘কাভারিং ইসলাম’, ‘কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজমে’র মতো ক্ষুরধারা লেখনীর মাধ্যমে।

পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী তালিকায় থাকা অবস্থায় একজনকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি হচ্ছেন নেলসন ম্যান্ডেলা। এই মহান নেতা ১৯৯৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অনেক পরে ২০০৮ সালে তাকে এবং এএনসিকে সন্ত্রাসী তালিকা থেকে বাদ দেয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের গর্বের জায়গা হচ্ছে তিনি একটি বিদ্রোহী দলকে সমর্থন করেছেন, যাদের বলা হতো কন্ট্রা বিদ্রোহী এবং এদের কর্মকাণ্ড ছিল সহিংসতায় ভরপুর। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিকারাগুয়ার গণতান্ত্রিক সরকারকে উচ্ছেদ করা। ইতিহাসে রিগ্যানের স্থান কন্ট্রা বিদ্রোহী বলে, কন্ট্রা সন্ত্রাসী বলে নয়। পশ্চিমাদের নির্মিত সন্ত্রাসবাদের ধারণা অনেকাংশে দ্বিমুখী এবং একপাক্ষিক, যা দিয়ে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সহিংসতাকে ব্যাখ্যা করা জটিল কাজ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশেষত ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে ধর্মীয় সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে। এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার ফলে বাংলাদেশেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। যেমনটি হয়েছিল ১৯৯২ সালে। এসব সহিংসতা বন্ধের অন্যতম উপায় হলো সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদিতা। বৈচিত্র্য সব ধর্ম ও বর্ণের অবস্থান এ অঞ্চলে। সহিংসতা এড়ানোর জন্য প্রয়োজন পরধর্ম সহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক উদারতা। তাই যখন রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো গণতন্ত্রের কথা বলবে তখন তা চর্চা করবে। যখন আইনের শাসনের কথা বলবে তখন জনগণকে তার মধ্যে অবস্থান করতে দিতে হবে। অন্যদিকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমন করতে হলে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিমুখী নীতি ও একপাক্ষিক নীতি পরিহার করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক  

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads