• বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্ব এবং পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ 

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্ব এবং পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ 

  • অলোক আচার্য
  • প্রকাশিত ২২ জুলাই ২০১৯

ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমেই উপ্তত্ত হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি এমন যে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছুদিন আগেও মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার জবাবে ইরানে হামলার একেবারে শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। হামলার জবাব দিতে ইরান প্রস্তুত রয়েছে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। হুমকি-পাল্টা হুমকিতেই তাদের সে অবস্থা সীমাবদ্ধ ছিল। তবে আপাতত আলোচনার মাধ্যমে দু’পক্ষই শান্ত রয়েছে। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়েই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি। 

ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার প্রথম দিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এতটা সংকটপূর্ণ ছিল না। ২০১৫ সালের জুনে ভিয়েনায় ইরানের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যরাষ্ট্র- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন (পি ফাইভ) ও জার্মানি (ওয়ান) পরমাণু চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দেয় তেহরান। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই এ চুক্তির বিরোধিতা করতেন। ক্ষমতায় আসার পর পূর্বসূরি ওবামা আমলে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে ‘ক্ষয়িষ্ণু ও পচনশীল’ আখ্যা দিয়ে তিনি গত বছরের মে মাসে তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তারপর নভেম্বরে তেহরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হয়। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়ানোর ঘোষণায় দেশটির গতিবিধি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা। ইরানে থাকা সংস্থাটির প্রতিনিধিরা দ্রুতই তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন পাঠাবেন। এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পরমাণু চুক্তি লঙ্ঘনকে উল্লেখযোগ্য নয় এবং চাইলেই বদলানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মোগারিনি।  

এ ঘটনার পর থেকেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। হালের দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতির কারণ এটাই। এসব উত্তেজনার মধ্যেই আগুনে ঘি ঢালার মতো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধি করে ৫ শতাংশে উন্নীত করার খবর প্রকাশিত হলে তা আরো বেশি উত্তেজনার সৃষ্টি করে। চুক্তিতে এটি সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ করার কথা ছিল। ট্রাম্পের ধারণা, এর মাধ্যমে দেশটি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে যাচ্ছে। 

ইরান একথা বরাবরই অস্বীকার করেছে। কিন্তু ইরান যতই অস্বীকার করুক না কেন, যদি তা হয় তাহলে বিশ্ব আবারো পরমাণু অস্ত্রের হুমকিতে পড়বে। ইরানকে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বৃদ্ধি করলে তা থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। এমনিতেই বিশ্ব পরমাণু অস্ত্র নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে। পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের বৈরিতা নিয়ে গত বছর উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। যুদ্ধের অবস্থা থেকেও ফিরে আসে তারা। যুদ্ধ হলে এ উপমহাদেশে যে বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ হতো তা থেকে বেঁচে গেছে বিশ্ব। বিশ্বের মানুষের প্রত্যাশা, পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকিমুক্ত বিশ্ব। ইরান যদি নতুন করে পরমাণু অস্ত্রধর দেশ হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কিছু হবে না। এমন আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। ইরানকে থামাতে একের পর এক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে ইরানের ওপর। তবে এসবকে থোরাই কেয়ার করে ইরান তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক তৎপরতা দুই দেশের মধ্যে অধিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তবে ইরানে সামরিক পদক্ষেপ সহসাই নেবে না বলে মনে হয়। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতিকর প্রভাব অবশ্যই বিবেচনায় আনবে।  

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে সামরিক হামলা চালায় তাহলে তা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। রাশিয়া এমন সময় এই মন্তব্য করল যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনার পারদ চরমে উঠেছে। পুতিন আরো বলেন, যদি এমন হামলা হয় তাহলে এর ফলে ব্যাপকভাবে যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে, তার পরিণতি কল্পনা করাও সম্ভব নয়। সংঘাত একবার ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণে আনাও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেন। তবে এতকিছুর মধ্যেও সুখবর হলো, পরমাণু চুক্তিটি টিকিয়ে রাখতে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্রগুলো বিবেচনার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে ইরান ও ফ্রান্স। এক ফোনালাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ এ ব্যাপারে সম্মতি জানান। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালনে ইউরোপীয় দেশগুলোর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে দেশটি চুক্তি থেকে আংশিক সরে আসার ঘোষণা দেয়।  

এই উত্তেজনা কমাতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ট্রাম্প, পুতিন ও হাসান রুহানির সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সমঝোতা বাস্তবায়নের জন্য দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে সেই সময়সীমা। প্রেসিডেন্ট রুহানি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক চাপ, হুমকি ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান গত ১৪ মাস ধরে কৌশলগত ধৈর্য অবলম্বন করে একতরফাভাবে পরমাণু সমঝোতা মেনে চলেছে। কিন্তু এখন সেই ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে এসেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ইরানের অর্থনীতি চাপে পড়তে শুরু করেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিপরীতে জনগণের জন্য নিরাপদ অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ রয়েছে ইরানের। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে ইরানের সামনে তিনটি পথ খোলা আছে। প্রথমত আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করা, দ্বিতীয়ত আগামী বছরের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করা, যদি ট্রাম্প পরাজিত হন এবং তৃতীয়ত উত্তেজনার মধ্যেই যতটা সম্ভব নিজেকে রক্ষা করা। এরই মধ্যে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে যাত্রা শুরু করেছেন। ওমান উপসাগরে মার্কিন ট্যাংকারে হামলার জন্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানকে বার বার সতর্ক করেছেন। যুদ্ধ বিশ্বের কোনো দেশই চায় না। এখন যুদ্ধ হলে তা হবে ভয়াবহ। কারণ বিশ্ব আজ অত্যাধুনিক অস্ত্রের সাজে সজ্জিত। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে আরো অনেক এলাকা। মারা যাবে নিরীহ মানুষ। যুদ্ধের বৈশিষ্ট্যই এটা। অতীতের যুদ্ধকবলিত এলাকাগুলোর দিকে তাকালে করুণ দৃশ্যই চোখে পড়ে। ফলে এই দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের লক্ষ্যে অগ্রসর হবে- এটাই সবার প্রত্যাশা।  

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads