• সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬
ads
স্বপ্নের পদ্মা সেতু এবং মাথা কাটা গুজব

ফাইল ছবি

মুক্তমত

স্বপ্নের পদ্মা সেতু এবং মাথা কাটা গুজব

  • প্রকাশিত ২২ জুলাই ২০১৯

পদ্মা সেতু আমাদের স্বপ্নের প্রকল্প। সেতু নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করার আগে পরিকল্পনা গ্রহণের সময় থেকেই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে অনেকবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কার্যক্রম। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলো হঠাৎ সেতু নির্মাণ কার্যক্রম থেকে নিজেদের হাত গুটিয়ে নিলেও কার্যক্রম থেমে নেই। বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করছে দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু। এর চেয়ে আনন্দের, সৌভাগ্যের ও গৌরবের বিষয় আর কী হতে পারে! অতি সম্প্রতি হঠাৎ একটি মহল মাথা কাটার গুজব ছড়িয়ে পদ্মা সেতুর কার্যক্রম স্থবির করতে তৎপর হয়ে ওঠে। এর নেপথ্য কারণ কী হতে পারে? জাতীয় অগ্রযাত্রায় শরীর জ্বলে ওঠে কাদের? দেশের বৃহৎ অংশের ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত এসব প্রোপাগান্ডা কারা কোন উদ্দেশ্যে ছড়াচ্ছে?

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে। ইতোমধ্যে মূল সেতুর ২৯৪টি পাইলের মধ্যে ২৯২টি শেষ হয়েছে। ৪২টি পিয়ারের মধ্যে ৩০টি পিয়ার এবং ১৪টি স্প্যান স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাস্তব কাজের প্রায় ৮১% অগ্রগতি হয়েছে। অবশিষ্ট কাজও দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভয়াবহ গুজব বিদ্যুৎগতিতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে-‘পদ্মা সেতু তৈরিতে এক লাখ মানুষের কাটা মস্তক লাগবে’। এরপর থেকেই মাথা কাটা আতঙ্কে অনেকের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে একটি মেসেজ হঠাৎ করে ভাইরাল হয়ে পড়ে। হয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী এমন কোনো ব্যক্তি নাই, যিনি মেসেজটি পাননি। মেসেজ প্রেরণকারী সবাই যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়াচ্ছে বিষয়টি তেমনও নয়। অনেকেই সহজ-সরল মনে প্রতারিত হয়ে মেসেজটি ফরওয়ার্ড করছে। গুজবী বার্তাটি হুবহু এমন, ‘বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণ চলতে পথে বাধা হয়েছে তাই ১০০০০০ বা তার অধিক পরিমাণ মানুষের মাথা প্রয়োজন পদ্মা সেতুর কাজ চালাতে। তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সারা বাংলাদেশজুড়ে ৪২টি দল বের হয়েছে এই মাথা সংরক্ষণের জন্য। এরা পথে-ঘাটে, খেলার মাঠে, হাটবাজার ইত্যাদি জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। এদের কাছে আছে ধারালো ছুরি এবং বিষাক্ত গ্যাস জা স্প্রে। যা ১০-১৫ হাত দূর থেকে স্প্রে করলে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যাবে এবং তখন তারা মাথা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য মাথা কাটা। এর ভেতরে খুলনায় অনেক মাথা কেটে নেওয়া হয়েছে। তাই সাবধানে থাকবেন। বাসার সবাইকে সতর্ক করে দেবেন এবং বাসায় কোনো ভিক্ষুক এলে সাবধানে থাকবেন। কোনো অপরিচিত কেউ এলে দরজা খুলবেন না। (সাবধান বাঙালি)। বেশি বেশি ফরওয়ার্ড করুন এবং অন্যের জীবন রক্ষা করুন।’

গুজবটির সূত্রপাত কোথায়? কেন সাধারণ মানুষ মিথ্যা গুজবকে বাস্তব মনে করে বিশ্বাস করছে আর ভয়ে তটস্থ হচ্ছে? চলুন, একটু পেছনের দিকে যাওয়া যাক। স্থানীয় জনসাধারণের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২ মার্চ সকালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় চায়না সামাজিক ধারণা অনুযায়ী, পদ্মা নদীতে পশুর রক্ত ঢেলে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন দায়িত্ব পাওয়া চাইনিজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। নদীতে গরু ও খাসির রক্ত ঢালতে দেখা যায় চাইনিজ ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের। ভাসিয়ে দেওয়া হয় কয়েকটি মুরগিও। চীনা নাগরিকরা তাদের প্রথাগত বিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী, দুটি কালো ষাঁড়, দুটি খাসি এবং দুটি মোরগ পদ্মাতীরে জবাই করেন। পরে পশুর রক্ত ঢেলে দেওয়া হয় পদ্মায়। এ ছাড়া ষাঁড়ের সামনের দুটি পা এবং জবাই করা দুটি মুরগিও তারা ভাসিয়ে দেন। অবশ্য অবশিষ্ট মাংস প্রকল্পে কর্মরত চীনা নাগরিকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। হাজার বছরের চায়না সামাজিক বিশ্বাস হলো, কাজের শুরুতে পশু উৎসর্গের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, এড়ানো যায় বড় দুর্ঘটনা। সম্প্রতি সেই খবরটি বিভ্রান্তিকরভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে অন্যভাবে-‘পদ্মা সেতু  তৈরিতে এক লাখ মানুষের মাথা প্রয়োজন’। এটি সুস্পষ্ট, একটি মহল অপপ্রচারের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পাঁয়তারা করছে। সংগত কারণেই পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রথম থেকেই যারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছে তারাই গুজবটিকে বাতাসের বেগে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

পদ্মা সেতুর কাজ সঠিকভাবে শেষ করতে পারলে এটি হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই সফলতা যারা সহ্য করতে পারবে না তারা কোনোক্রমেই দেশ ও জাতির মঙ্গল চায় না। দেশবিরোধী অপশক্তি বিশেষ কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার। পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক গুজবটি ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়লে নড়েচড়ে বসে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। সেতু কর্তৃপক্ষও সজাগ হয়েছে। গুজবের পরিপ্রেক্ষিতে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এটি একটা গুজব। এর কোনো সত্যতা নেই। এমন অপপ্রচার আইনত দণ্ডণীয় অপরাধ।

এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করা যাচ্ছে।’ যত দিন সমাজ থেকে প্রচলিত যাবতীয় কুসংস্কারের সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হবে না, তত দিন জাতীয় অগ্রগতির মিছিল পিছুটান মুক্ত হতে পারবে না। শুধু পদ্মা সেতুর বিষয়ে গুজব ছড়ানোদের শাস্তির আওতায় আনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পাশাপাশি মানুষের অন্তরে বদ্ধমূল কুসংস্কার দূরীকরণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ হোক নির্বিঘ্নে।

মুহাম্মদ ইয়াকুব

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads