• বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬
ads
ভালো থাকুক রয়েল বেঙ্গল টাইগার

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

বিশ্ব বাঘ দিবস

ভালো থাকুক রয়েল বেঙ্গল টাইগার

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২৯ জুলাই ২০১৯

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাঘের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। এটা সত্যি হলেও কত কমেছে তা সঠিকভাবে বলা যাবে না। পায়ের ছাপ বিশ্লেষণ করে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না বলে তারা মত প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি। এতে বাঘের গায়ের ডোরাকাটা ছাপ বিশ্লেষণ করা যায়। আর মানুষের হাতের আঙুলের মতো প্রতিটি বাঘের গায়ের ডোরা দাগও স্বতন্ত্র। তাই এই পদ্ধতিতেই সঠিকভাবে বাঘ গণনা করা সম্ভব। বাংলার বাঘ আমাদের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় যে সুদর্শন বাঘ দেখা যায় তা দুনিয়াব্যাপী রয়েল বেঙ্গল টাইগার (Royal Bengal Tiger) নামে পরিচিত।  Panthera Tigris- বাঘ বিশাল বিড়াল পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। বাঘ শুধু বাংলাদেশের জাতীয় পশু নয়- বাঘকে ভারত, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া জাতীয় পশু ঘোষণা করেছে। সুন্দরবনে বর্তমানে যে কয়টি বাঘ আছে, সেগুলোকে চোরা শিকারিদের হাত থেকে রক্ষায় যাত্রা শুরু করেছে বেঙ্গল টাইগার কনজারভেশন অ্যাক্টিভিটি বা ‘বাঘ’ প্রকল্প। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিদেশবিষয়ক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির সহায়তায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা ওয়াইল্ড টিম এবং বন অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এ প্রকল্পে সহযোগিতা করবে বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজ (বিসিএএস) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা স্মিথসোনিয়ন ইনস্টিটিউশন। বন-পশু বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ চোরা শিকার। এ ছাড়া সুন্দরবনের ভেতরে বহমান নদীতে নৌ-রুট থাকাও বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য দায়ী। তবে বাঁচার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করে প্রজনন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে পারলে এ সংখ্যা দ্রুতই বাড়ানো সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাই বাঘের জন্য মায়াকান্না না করে বাঘ বাঁচানোর জন্য উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে জরুরিভিত্তিতে।

২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস

বাঘের বিচরণ রয়েছে বিশ্বের এমন ১৩টি দেশ- বাংলাদেশ, চীন, নেপাল, ভারত, ভুটান, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস ও রাশিয়ায় দিবসটি পালিত হয়। ১৩টি বাঘসমৃদ্ধ দেশকে টাইগার রেঞ্জ বা টিআরসি বলা হয়। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঘ সম্মেলন থেকে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সম্মেলনে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এরপর বিশ্বের ১৩টি দেশের ১৫০ জন বাঘ বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবিদের যোগদানের মধ্য দিয়ে বাঘের বসতি আছে এমন এলাকার পাশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ভারী অবকাঠামো নির্মাণ না করার অঙ্গীকারসহ ৯-দফা ঢাকা ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। এভাবেই দিন দিন বিলুপ্তির পথে যাওয়া এই প্রাণীটি রক্ষায় পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ) এবং গ্লোবাল টাইগার ফোরাম ২০১৬ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাঘ আছে এমন ১৩টি দেশের বন ও পরিবেশমন্ত্রীদের সম্মেলনে জানায়  বৈশ্বিক গণনায় বাঘের সংখ্যা ৩ হাজার ৮৯০টি। ২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২০০। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বন-জঙ্গলের আশপাশের স্থানীয় মানুষ এবং সংরক্ষণ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের তৎপরতায় ব্যাঘ্রকুলের এই সমৃদ্ধি। এই সম্মেলনে বলা হয়েছে, এ সময়ে বাঘের সংখ্যা কমেছে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ায়। বাঘ অধ্যুষিত দেশগুলো ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এই পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের সঙ্গে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশও বাঘের অস্তিত্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

সুন্দরবনে বাঘ বেড়েছে

সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। Bengal Tiger Conservation Activity (BAGH)-2018 প্রকল্পে বাঘ গণনার কার্যক্রম (দ্বিতীয় পর্যায়) শেষে এই আশার খবরটি জানায় বাংলাদেশ বন বিভাগ। এর আগে ২০১৫ সালে USAID BAGH প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে পরিচালিত জরিপে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘের অস্তিত্বের কথা জানানো হয়েছিল। এবার ২০১৮ সালে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ১১৪টি হওয়ায় সুন্দরবনে বাঘ ৮ শতাংশ বেড়েছে বলে মতামত দিয়েছেন জরিপ পরিচালনাকারী বিশেষজ্ঞরা। বন অধিদপ্তরের সঙ্গে চলতি বাঘ শুমারিতে অংশগ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের Wildteam, Smithsonian Conservation Institute। গবেষণায় সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা USAID-এর অর্থায়নে Wildteam, Smithsonian Conservation Institute ও বাংলাদেশ বন বিভাগ সুন্দরবনে যৌথভাবে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা শুরু করে। ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৮ সালে।

সংখ্যাতত্ত্বে বাঘ

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩৫টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে মাত্র ১০টি বাঘ। বাকি ২৫টির মধ্যে ১৪টি বাঘ পিটিয়ে মেরেছেন স্থানীয় জনতা। আর ১০টি মারা গেছে শিকারিদের হাতে এবং একটি বাঘ মারা গেছে ২০০৭ সালে সিডরে। সুন্দরবনে প্রথমবারের মতো বাঘ শুমারি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৫ সালে। একটি বেসরকারি গবেষণায় জার্মান গবেষক হেন রিডসে জানান, সুন্দরবনে ৩৫০টি বাঘ রয়েছে। বাঘ বিষয়ক অনুসন্ধানী রেকর্ড থেকে জানা যায়, ১৯৬৬  থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দুই দফায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিলের ট্রাস্টি ব্রিটিশ পাখিবিদ গাই মাউন্টফোর্ট। তখন বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৩০০টি। ১৯৮২-৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ পরিচালিত এক জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৩০০টি বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৯৮ সালে নেপালি বংশোদ্ভূত আমেরিকান গবেষক কীর্তি তামাং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে পরিচালিত একটি প্রকল্প শেষে বাঘের সংখ্যা ৩৫০টি বলে উল্লেখ করেন। ২০০৪ সালে একটি জরিপ শেষে বন বিভাগ জানায়, সুন্দরবনে বাংঘের সংখ্যা ৪৪০টি। ২০০৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ গবেষক ড. মনিরুল এইচ খান ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে গবেষণা করে জানান, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ২০০টি। ২০১০ সালে বন বিভাগ এবং ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ  যৌথভাবে পরিচালিত বাঘ শুমারির তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৪৫০টি। ২০১৫ সালে বন বিভাগ আরেকটি জরিপের তথ্যে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘ রয়েছে মাত্র ১০৬টি। তবে ২০১৫ সালের জরিপটিতে অত্যাধুনিক ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও আগের প্রায় সব জরিপই করা হয়েছিল পাগমার্ক (পায়ের ছাপ) পদ্ধতিতে।

বিলুপ্তির আশঙ্কায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার

বিভিন্ন সূত্রে দেখা গেছে, পৃথিবীতে তিন হাজারের মতো বাঘ টিকে আছে। এর মধ্যে বিশ্বের একক বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে রয়েছে কয়েকশ’ রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ এই প্রাণীটি মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হলেও বাংলাদেশের জাতীয় পশুর খেতাবটি কিন্তু তারই দখলে। সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধ যা নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলীয় গবেষকদের ওই নিবন্ধে বলা হয়, সমুদ্রসীমা পথকে সুন্দরবনের ৭০ ভাগই মাত্র কয়েক ফুট উঁচুতে। বিশ্বে তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাংলাদেশের মালিকানাধীন সুন্দরবনে থাকা রয়েল বেঙ্গল টাইগার ২০৭০ সালের মধ্যেই বিলুপ্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনে উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর প্রভাব নিয়ে এটিই জাতিসংঘের সবচেয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন। ১৫০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ১৩২টি দেশ। এই নিবন্ধে আরো বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে চিরতরে বিলীন হয়ে যেতে পারে সুন্দরবন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা স্থলভাগের প্রায় ১০ লাখ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে আছে বাঘ, সিংহ, জাগুয়ার, চিতা ও পাহাড়ি চিতার মতো হিংস্র প্রাণীগুলো। বাংলার ঐতিহ্যের পরিচায়ক রয়েল বেঙ্গল টাইগারও রয়েছে এ তালিকায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষায় ভারতের বন বিভাগ অনেক আগেই বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাঘের অস্তিত্ব রক্ষায় তারা সুন্দরবনে জনসাধারণের অবাধ বিচরণ নিষিদ্ধ করেছে। সুন্দরবনের আশপাশের বসতবাড়ি উচ্ছেদ করেছে। এর ফলে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ভারতে মাত্র ৭৬টি বাঘ ২০১৬ সালে বেড়ে ৮৫টিতে দাঁড়িয়েছে। এ প্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সুন্দরবনের আয়তন বাংলাদেশ অংশে বেশি; তারপরও উদ্যোগের অভাব ছাড়া বাঘের সংখ্যা কমার তেমন কোনো কারণ নেই। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads