• সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
কৃষকের সন্তানের উচ্চশিক্ষা

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

কৃষকের সন্তানের উচ্চশিক্ষা

  • আরাফাত শাহীন
  • প্রকাশিত ০৭ আগস্ট ২০১৯

একটা প্রশ্ন প্রায়ই আমার মাথায় এসে ঘুরপাক খায়। একজন কৃষক কেন সরকারের কাছ থেকে বেতন পান না? আপনাদের কাছে হয়তো এ প্রশ্নটিকে অবান্তর অথবা নেহাত ছেলেমানুষি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একজন কৃষকের সন্তান হিসেবে যে সমস্যাসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি সে কারণেই হয়তো প্রশ্নটা আমার মাথার ভেতর এসে জট পাকিয়ে বসে আছে। একটা বিষয় বিবেচনা করে দেখুন, আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আর কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানে কৃষকের ওপরও তাদের নির্ভরশীলতা। কৃষকরা যদি উৎপাদন বন্ধ করে দেন তাহলে দেশের সমস্ত মানুষকে না খেয়ে মরতে হবে। হয়তো ভাবতে পারেন, আমাদের কৃষকরা চাষাবাদ বন্ধ করে দিলে বাইরের দেশ থেকে খাদ্য এনেও আমরা চলতে পারব। বিষয়টা অত সহজ নয়। বিদেশ থেকে খাবার কিনে এনে কয়দিন দেশ চালানো যাবে! দেশ গঠনে এই যে বিরাট অবদান তাতে কি এমনিতেই তাদের একটা সম্মানজনক অবস্থান পাওনা হয়ে যায় না? কিন্তু আদতে তারা তার কতটুকু পাচ্ছেন?

সভ্যতা নির্মাণে কৃষি এবং কৃষকের অবদান সবচেয়ে বেশি হলেও আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হন কৃষকরা। যুগে যুগে শাসকের খাজনার টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে কৃষককে সর্বস্বান্ত হতে হয়েছে; নির্যাতন ও নিষ্পেষণে জর্জরিত হতে হয়েছে তাদের। পৃথিবী এখন সামনের দিকে অনেক এগিয়ে গেছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও অনেকটা এগিয়েছে সামনের দিকে। পৃথিবীর বেশিরভাগ সভ্য রাষ্ট্রে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও আমাদের দেশে তার ছোঁয়া খুব একটা লেগেছে বলে মনে হয় না। কারণ কৃষক এখনো আগের মতো অযত্ন এবং অবহেলার শিকার। দেশে কৃষিপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটেছে, কম সময়ে কৃষিপণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে, বিদেশ থেকে উন্নত বীজ ও সার-ওষুধ নিয়ে আসা হচ্ছে। এসবের কারণেই হয়তো কৃষিক্ষেত্রে একটা নীরব বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে এবং আগের চেয়ে উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কিন্তু বাংলা কৃষক কি তার ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন? জমি থেকে ফসল তুলে ঘরে এনে তারপর বাজারে নেওয়া পর্যন্ত যে খরচ তা কি বিক্রি করার পর উঠে আসছে? বর্তমান বাস্তবতা তা বলে না। কিছুদিন আগে দেশে ধানের দাম নিয়ে কম মাতামাতি হয়নি। আমরা কৃষকদের কান্না দেখেছি। এক মণ ধান উৎপাদন করতে গিয়ে ২০০-৩০০ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। সোনালি আঁশের এই দেশে সব পাটকল প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এবার পাটের ক্ষেত্রেও কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন বলে আশঙ্কা করছি। এভাবে প্রতিটা ফসলের ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন হতে থাকলে কৃষকরা কীভাবে চাষাবাদ চালিয়ে যাবেন? আমরা বহুদিন থেকে শুনে আসছি, সরকারের তরফ থেকে কৃষকদের বিনামূল্যে সার, বীজ ও ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু সেটা কতজন কৃষক পান তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমার দেশের কৃষকরা প্রতিনিয়ত বহুমুখী সমস্যার মধ্য দিয়ে গেলেও এখনো যে তারা কৃষিকাজ অব্যাহত রেখেছেন সেটাই বড় আশ্চর্যের বিষয়।

নিজেরা এত এত সমস্যার ভেতর দিয়ে গেলেও একজন কৃষক স্বপ্ন দেখেন তার সন্তান উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ গঠনের কাজে অংশগ্রহণ করবে। আমরা যদি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের পর থেকে আমাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে সেখানে দেখতে পাব, জাতি গঠনের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তানরা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে গ্রামের খেটে খাওয়া পরিশ্রমী কৃষক ও তার সন্তানরা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। পাকিস্তান আমলে এদেশের সন্তানরা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি না পেলেও স্বাধীনতার পর যখন নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা শুরু হলো, তখন উচ্চশিক্ষার পথে প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেল। কৃষকের সন্তানরা লাঙল-জোয়াল নামিয়ে রেখে দলে দলে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করল।

আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কম খরচেই পড়াশোনা করা সম্ভব হয়। গ্রামের দরিদ্র এবং কৃষক পরিবারের সন্তানরা এখন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা আজও সেভাবে সংগঠিত হতে পারিনি। আমাদের মধ্যে লোভ-লালসা বহুল পরিমাণে রয়ে গেছে। মানবিক গুণাবলি অর্জন করার ক্ষেত্রে আমরা আজও অনেকটা পিছিয়ে আছি। সমাজের মধ্যবিত্ত মানুষ পড়াশোনার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। কারণ লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আজকাল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করাও কষ্টকর হয়ে  গেছে। প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে বিনা কারণে অতিরিক্ত ফি আদায় করা শুরু করেছে তাতে গ্রামের কৃষক পরিবারের একজন সন্তানকে পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যেতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো বিভাগে ফরম পূরণের সময় নির্ধারিত ফি থেকে তিন-চারগুণ বেশি টাকা আদায় করতে দেখেছি। এটা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই।

কিছুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখলাম, ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করতে হলে দুই হাজার টাকার অধিক দিতে হবে। একজন আবেদনকারীকে তো শুধু একটা জায়গায় আবেদন করলেই চলবে না। তাকে আরো কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়েই যদি এতগুলো টাকা দিতে হয় তাহলে সে অন্যান্য খরচ জোগাবে কীভাবে? কেউ কেউ বলেছেন, এ বছর ধানের দাম ছিল চারশ থেকে পাঁচশ টাকা মণ। তাহলে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হলে কৃষকের সন্তানকে প্রায় পাঁচ মণ ধান বিক্রি করতে হবে। বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এদেশে এখনো গরিব মানুষের সংখ্যাই বেশি। বহু মানুষ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। আমরা কথায় কথায় সাম্য ও নীতির কথা বলি, সম-অধিকারের কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সবার জন্য সুযোগটা সমান নয়। ওটা ধনীদের জন্য সবসময়ই বেশি।

বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা অজুহাতে অর্থ আদায়ের প্রবণতা দেখলে মনে হয়, আবার যেন সেই ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হয়েছে। যেন বাকি সব বিষয়ের মতো শিক্ষার বাজারটাও ধনীদের একচেটিয়া অধিকারের বিষয়। কিন্তু এতে করে সমস্যা কমবে বলে মনে হয় না। আজকের পরিস্থিতিতে শুধু কৃষক পরিবার নয়, সমস্ত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষই এই সংকটের মুখোমুখি। আমরা মনে করেছিলাম, আর কোথাও না হোক, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের সন্তানরা নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করে দেশ ও দশের কাজে আসবে। কিন্তু সে সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। শিক্ষার ব্যয় দিন দিন এতটা বেড়ে যাচ্ছে যে ধীরে ধীরে তা গরিবের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে নিজের খরচ চালাতে পারেন। এ দেশে সে সুযোগও সীমিত, নেই বললেই চলে। এমতাবস্থায় দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার স্বার্থে তা সহজ ও সুলভ করতে সরকারের প্রতি বিশেষ অনুরোধ করছি।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

smshaheen97@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads