• বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
সরকারিভাবে কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন

ফাইল ছবি

মুক্তমত

কােরবানির চামড়া

সরকারিভাবে কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন

  • প্রকাশিত ২০ আগস্ট ২০১৯

বিশ্ববাজারে মানসম্মত অধিক পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অধিক গতিশীল করতে দেশীয় শিল্প, শিল্পের কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার একান্ত অপরিহার্য। আমাদের কৃষিজ পাট, চা এবং চামড়াশিল্প ও শিল্পের কাঁচামাল এদেশেই উৎপন্ন হচ্ছে। কৃষিজ এই তিনটি খাতের কাঁচামালের দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে আমরা বিদেশে রপ্তানি করে থাকি এবং রপ্তানিকারক হিসেবে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে।

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে চামড়াশিল্পের ভূমিকা অনন্য। দেশে সারা বছরে উৎপাদিত চামড়ার মধ্যে ৬০ শতাংশ চামড়া কোরবানির ঈদে পাওয়া যায় আর বাকি ৪০ শতাংশ চামড়া বছরজুড়ে সংগ্রহ হয়ে থাকে। একদিনে এই বিপুল পরিমাণ চামড়া পাওয়ার নিশ্চয়তায় বিভিন্ন ধরনের চামড়া ব্যবসায়ীকে উৎসাহিত করে তোলে। দু-তিন হাত বদল হয়ে চামড়া আসে বড় বড় চামড়া ক্রেতাদের কাছে (আড়তদার)। এসব বড় বড় আড়তদার সমিতি বা সিন্ডিকেটের ইশারায় অলিখিতভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চামড়া ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে পারে না। দেশের সর্বত্র সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়া বেচাকেনা হয়ে থাকে। চামড়া কেনাবেচায়  সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও বাস্তবতায় তা প্রতিফলিত হয়নি। বিভিন্ন অজুহাত তুলে বড় চামড়া ব্যবসায়ীরা সরাসরি কোরবানির চামড়া কেনা থেকে বিরত থাকেন। কোরবানির চামড়া বিক্রেতাদের চামড়া বিক্রিতে হিমশিম খেতে হয়। ক্রেতা না থাকায় বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদরাসাগুলোতে দানের  চামড়ার পাহাড় জমে যায়।

সারা বছর দেশের সর্বত্র প্রচুর পরিমাণে চামড়া না পাওয়ায় দেশের সব উপজেলা ও জেলা শহরে চামড়া বেচাকেনার কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। দেশের কয়েকটি জেলা শহর ও বিভাগীয় শহর ছাড়া চামড়া বেচাকেনার বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আর কোথাও নেই। ফলে ক্ষুদ্র এবং মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট জেলা ও বিভাগীয় শহরে অবস্থিত চামড়ার আড়তদারদের কাছে তাদের চামড়া বিক্রি করে দেয় এবং আড়তদারদের নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়। দেশের চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে সঠিক দাম না পাওয়ায় মাঝারি ও ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায় লোকসান ঠেকাতে ও কিছুটা লাভের মুখ দেখতে কালোবাজারিদের কাছে চামড়া বিক্রি করে থাকে। দেশের সম্পদ পাচার হয়ে যায় অন্য দেশে। দেশের ট্যানারি শিল্পগুলো বিশেষ করে কোরবানি ঈদের সময় উপজেলা পর্যায়ে অস্থায়ী চামড়া ক্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলে ক্ষুদ্র, মৌসুমি ও মাঝারি পর্যায়ের চামড়া ব্যবসায়ীরা সঠিক দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা পেত। এর ফলে কোরবানি করা পশুর চামড়ার টাকার হক দাবিদার ক্ষুদ্র, মৌসুমি ও মাঝারি এবং বড় ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হতে পারত, তেমনি চোরাপথে চামড়া পাচার রোধ করা যেত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানি ঈদে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ পশু কোরবানি হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশব্যাপী কোরবানির চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেন এবং কোরবানির চামড়া নিয়ে যাতে কোনো কারসাজি বা সিন্ডিকেট না হয়, চামড়া যাতে চোরাপথে পাচার না হতে পারে তা দেখার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক রাখা হবে বলে জানিয়েছিলেন।

প্রত্যেক জেলায় রয়েছে বিসিক শিল্পনগরী এবং এসব শিল্পনগরীতে সংরক্ষণাগার থাকলে চামড়া ব্যবসায়ীরা তাদের চামড়ার ন্যায্যমূল্য পেত, তেমনি দেশের এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হতো। ট্যানারি শিল্প-কারখানা হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া প্রক্রিয়াজাত জোন অঞ্চলে শোধনাগারসহ অন্যান্য সুবিধা পুরোমাত্রায় না পাওয়ায় চামড়াশিল্পের অবনতির কারণ বলে উল্লেখ করেছে ট্যানারি মালিক সমিতি। বিশ্ববাজারে অংশীদারিত্ব কমে যাওয়াই কোরবানির চামড়া কেনায় ট্যানারি মালিকদের অনীহার কারণ বলে উল্লেখ করেন। দীর্ঘদিন লোকসান দিতে দিতে ব্যবসায়ীরা ধারদেনায় জর্জরিত। নানা কারণ দেখিয়ে ট্যানারি মালিকদের ঋণ দিচ্ছে না ব্যাংকগুলো। একসময় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল চট্টগ্রামের ট্যানারি শিল্প-কারখানাগুলো, এখন তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দায়। বর্তমানে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় নিম্নমুখী, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে ২০১৬-১৭ সালে আয় হয়েছিল ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার, সেখানে ২০১৭-১৮ সালে আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ডলার। মাত্র কয়েক বছর আগে হাজারীবাগের ট্যানারি মালিকরা চামড়ার দাম দিতেন ৮৫ থেকে ৯০ টাকা প্রতি বর্গফুট, আজ চামড়াজাত পণ্যের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেলেও চামড়ার দাম কমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে।

কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী দেশীয় বড় বড় মহাজনরা ট্যানারি শিল্প মালিকদের কাছে তাদের কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। ব্যবসা চালানোর তাগিদে এসব ব্যবসায়ী চামড়া কিনেছেন, তবে নিম্নতম দামে চামড়া কেনার জন্য ফড়িয়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আগেই পরামর্শ দিয়েছিলেন। এলাকাবাসী তাদের কোরবানির চামড়া এলাকার মাদরাসা ও এতিমখানায় দান করে থাকেন এবং এসব মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর বছরের খরচের বেশিরভাগ অর্থই এই কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা থেকে আসে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গ্রামগঞ্জে ঘুরে কম দামে চামড়া কিনলেও আশানুরূপ দামে তারা মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে পারছে না। গত কয়েক বছরে চামড়ার বাজার নিম্নমুখী, ক্রেতার চাহিদা না থাকায় গরুর চামড়া রকমভেদে ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, ১৫ টাকা থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে ছাগলের চামড়া। বর্গফুটের কোনো হিসাব চামড়া বিক্রিতে ছিল না। প্রতি পিস হিসেবে বেচাকেনা হয়েছে। এর আগেও চামড়া ব্যবসায়ীরা জনসাধারণের কাছ থেকে পিস হিসেবে চামড়া কিনতেন।

২০১৩ সালে বিশ্ববাজারে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধি পায়। বিশ্ববাজারে প্রথম শ্রেণির চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী কয়েকটি দেশ বিকল্প চামড়ার উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবিত বিকল্প চামড়া দিয়ে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করে। বাংলাদেশের কাঁচা চামড়া বিক্রির বড় বাজার ছিল চীন। চীন বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে চামড়া নিয়ে উন্নতমানের প্রক্রিয়াজাত করে তাদের বড় ক্রেতা আমেরিকায় রপ্তানি করত। বর্তমানে রপ্তানিযোগ্য চীনা পণ্যের ওপর আমেরিকা অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় চীন বিশ্ববাজার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং বাংলাদেশ থেকে চামড়া আমদানি বন্ধ করে দেয়। এতে চামড়াশিল্পের গতি স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে মূলত প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে থাকে। কিন্তু এসব দেশ বিকল্প চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করছে যা বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের জন্য হুমকি। ইপিবি (এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো)-র তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে (জুলাই-এপ্রিল) চামড়াশিল্প খাত থেকে আয় হয়েছিল ৯১৬ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন বা প্রায় ৯১ কোটি ৭০ লাখ ডলার; সেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে (জুলাই-এপ্রিল) চামড়া খাত থেকে আয় কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৮৩৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন বা প্রায় ৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার।              

একসময় সারা বিশ্ব বাংলাদেশের কৃষিজ সম্পদ সোনালি আঁশের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পাটের তন্তু বা আঁশ ছিল চাহিদার শীর্ষে, যা একসময় বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একমাত্র ও প্রধান রপ্তানিযোগ্য কৃষিজ সম্পদ। বাংলাদেশের পাটতন্তু যখন বিশ্ববাজারে চাহিদা ও মূল্যমানে আকাশচুম্বী, ঠিক তখন উন্নত দেশগুলো পাটতন্তুর বিকল্প তন্তু উৎপাদন ও বাজারজাত করায় আমাদের সোনালি আঁশ পাটশিল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও বর্তমানে সারা বিশ্ব বিকল্প তন্তু ব্যবহার বাদ দিয়ে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক পাটতন্তু ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

বিশ্ববাজার থেকে চীনের চামড়াজাত পণ্যের প্রত্যাহার বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এই শিল্প থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। প্রশিক্ষিত জনবল ও উন্নতমানের প্রক্রিয়াজাত চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য লেদার স্টুডিও ও প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের কাজ চলছে। চামড়াশিল্পের পরিবেশগত সমস্যা, বর্জ্য পরিশোধন, দক্ষ জনশক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত পণ্য বিশ্বমানের হলেই বাংলাদেশ চামড়াশিল্পে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে পারবে। চামড়া দেশের মানুষের কাছে অবহেলিত বোঝা হয়ে থাকবে না; বরং দেশের অর্থনীতিতে চামড়াশিল্প মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

লেখক: নির্মল সরকার

সাংবাদিক

nkshompath@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads