• বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
শূকরের চর্বি নিয়ে যত বিপত্তি

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

শূকরের চর্বি নিয়ে যত বিপত্তি

  • প্রকাশিত ২০ আগস্ট ২০১৯

উপমহাদেশে ইংরেজবিরোধী সবচেয়ে বড় ও প্রথম প্রতিরোধ সংগ্রামের নাম ঐতিহাসিক ‘সিপাহী বিপ্লব’ বা ‘সিপাহী বিদ্রোহ’। ১৮৫৭ সালে ঝাঁকে ঝাঁকে সৈন্য ব্যারাক ছেড়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ইংরেজ দখলদারদের বিরুদ্ধে। ‘সিপাহী বিপ্লবে’র প্রধান কারণ ছিল ‘ধর্মীয়’। উপমহাদেশের মুসলিম সৈন্যদের এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজের সঙ্গে শূকরের চর্বি ও হিন্দু সৈন্যদের কার্তুজের সঙ্গে গরুর চর্বি মিশিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত হানার প্রতিবাদে সৈন্যদের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনকে প্রায় পরাস্ত করে ফেলেছিল। বিজয় সুনিশ্চিত দেখে সিপাহীরা সর্বশেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বয়োবৃদ্ধ গদিহীন সম্রাটের সমর্থনও আদায় করে নিয়েছিল। কিন্তু ইংরেজ কূটচালের কাছে এই বিদ্রোহ তুরুপের তাসের মতো ভেঙে পড়েছিল। খুবই নির্দয়ভাবে দমন করা হয়েছিল বিদ্রোহী সেনাদের।

পরাধীনতার পিঞ্জরে আবদ্ধ হওয়ার একশ বছর পর উপমহাদেশের নিম্নবর্গীয় শ্রেণির হঠাৎ জেগে ওঠার নেপথ্যে ছিল দুই ধর্মের দুই নিষিদ্ধ পশুর চর্বি। ব্রিটিশ ভারতীয় বাহিনীতে নতুন ইস্যু করা এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ দাঁতের কামড়ে খুলে লোড করা হতো। ইসলাম ধর্মে শূকর হারাম এবং হিন্দু ধর্মে গরুর মাংস নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে ইস্যুটি ব্রিটিশ ভারতের উপমহাদেশীয় সেনাদের কাছে খুবই স্পর্শকাতর ছিল। গত একশ বছরে ব্রিটিশদের নানামুখী শোষণ একত্র হয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ শূকর আর গরুর চর্বি ইস্যুর মাধ্যমে বিপ্লবী বিস্ফোরণ ঘটেছিল। বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে। বিদ্রোহী সিপাহীরা দিল্লির লালবাগ কেল্লায় মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে স্বাধীন ভারতের সম্রাট ঘোষণা দিয়ে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথগ্রহণ করে। সর্বশেষ মোগল সম্রাট আজাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন- এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ক্রমেই এই বিদ্রোহ গোটা উত্তর ও মধ্যভারতের অধুনা উত্তরপ্রদেশ, বিহার, উত্তর-মধ্যপ্রদেশ ও দিল্লি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। দ্রুততম সময়ে দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে মিরাট, দিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য অংশে। সে সময় চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রতিরোধ এবং সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরের খণ্ডযুদ্ধগুলো বাংলাদেশকে উত্তেজিত করে তুলেছিল। ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্যে বিদ্রোহে যোগদান করে এবং জেলখানা থেকে সব বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়। সিপাহী বিপ্লবকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে অভিহিত করা হয়। শুরুতে এই বিদ্রোহের নাম ছিল আজাদী আন্দোলন। ইংরেজরা উপমহাদেশের প্রথম আজাদী আন্দোলন সিপাহী বিপ্লবকে সুকৌশলে খুবই নির্মম ও নির্দয়ভাবে দমন করে এবং আজাদী সংগ্রামের নামকরণ করে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ হিসেবে। পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে এলে বহু নিরপরাধ নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে রাজ্যহীন সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে নির্বাসিত করা হয়। সম্রাটের সাত সন্তানের কাটা মস্তক ট্রেতে সাজিয়ে সম্রাটের সামনে হাজির করে বশ্যতা স্বীকারের আহ্বান জানানো হলে সম্রাট তা প্রত্যাখ্যান করেন। ইংরেজদের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় ১৮৫৮ সালে কনিষ্ঠ স্ত্রী, অবশিষ্ট দুই পুত্র ও এক কন্যাসহ মোগল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ সম্রাটকে তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনি বার্মার রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানো হয়।

সিপাহী বিপ্লবের সময় ইংরেজ সুবিধাবাদীরা সিপাহীদের বিরুদ্ধে ছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকেই ইংরেজ বাহিনীকে গরু ও ঘোড়ারগাড়ি এবং হাতি সরবরাহ করেছিল। তারা সিপাহিদের গতিবিধির সন্ধান এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে কোম্পানির স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কৌশলগত সমর্থন দেয়। ব্রিটিশ বেনিয়া সরকার কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জমিদার-জোতদারদের এসব সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ নওয়াব, খানবাহাদুর, খানসাহেব, রায়বাহাদুর, রায়সাহেব প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করে এবং মূল্যবান পার্থিব সম্পদ দ্বারা পুরস্কৃত করে।

যা হোক, সম্প্রতি খবর হয়েছে, শূকরের মাংস আর চর্বি দিয়ে তৈরি সয়াবিন তেলের কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছে বাংলাদেশে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান মাছ এবং মুরগির খাদ্য তৈরির জন্য নিষিদ্ধ শূকরের মাংস, হাড় ও চর্বি আমদানি করছে। সম্প্রতি ঢাকার ধামরাইয়ে একটি ভোজ্যতেল তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ১১ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ২ হাজার টন নিষিদ্ধ শূকরের মাংস, হাড় ও চর্বি জব্দ করেছে। কেবিসি অ্যাগ্রো লিমিটেড নামের ওই কারখানাটিকে ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করে সিলগালা করা হয়েছে। গত মাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও এ-জাতীয় বড় ধরনের তিনটি চালান আটক করেছে। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ৮৫ টিইইউএস কন্টেইনারে মিলেছে ফিশ ফুডের নামে আমদানি করা ১৪ লাখ ৮ হাজার ৭২০ কেজি (১ হাজার ৪০৮ টন) শূকরসহ গবাদিপশুর বর্জ্য। মাছ-মুরগির খাদ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই বর্জ্য আমদানি করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, এসব খাবার জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

অনেকেই এসব সংবাদ হালকাভাবে নিচ্ছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও কেউ কেউ সাফাই গাইছে। সবার অনুধাবন করা উচিত, বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারকে বিষয়টি সিরিয়াসলি নিতে হবে। দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অশান্ত করার মাধ্যমে কোনো গোষ্ঠী ফায়দা হাসিল করতে চায় কি-না, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সয়াবিন তেলের আড়ালে আবার নতুন কোনো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিশেষ সুবিধা নিতে চাইছে কি-না, তাও খতিয়ে দেখা উচিত। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনুভূতিতে সুকৌশলে আঘাত হানার চেষ্টা কোনোক্রমেই শুভ লক্ষণ নয়। শূকরের মাংস, হাড়, চর্বি ও বর্জ্য দিয়ে তৈরি সয়াবিন তেল, মাছ-মুরগির খাবার এদেশের মানুষের মনে তিনটি কারণে অস্বস্তিকর— সংখ্যাধিক্যের কঠোর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা; খাদ্যাভ্যাস না থাকা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে।

বিষয়টিকে শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ খাদ্যাভ্যাস মানুষের দৈনন্দিন জীবনে খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এমনকি বৈধ হলেও স্বাভাবিক অনেক দেশীয় খাবারও অনেকে অভ্যাস না থাকার কারণে গ্রহণ করে না। আর স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি তো আছেই।

মাত্র কয়েকজন ফটকাবাজ ব্যবসায়ী নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সতেরো কোটি মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধে কুঠারাঘাত করবে, তা কোনোক্রমেই হতে পারে না। প্রশাসনের আন্তরিকতা ও সচেতনতার কারণেই শূকরের মাংস, হাড়, চর্বি ও বর্জ্য দিয়ে কী হচ্ছে তা গণমানুষের চোখের সামনে এসেছে। নয়তো এসব বিষয় অন্য দশটি গোপনীয় কাজের মতো চিরগোপনীয়ই থেকে যেত। এই পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হবে, এসব কাজের সঙ্গে জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নেপথ্য ঘটনা জেনে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মুহাম্মদ ইয়াকুব

লেখক :   প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads