• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

মুক্তমত

নয়া উদ্যোক্তা, লজ্জাবতী বীরুৎ ও ঘুঘু পাখির গল্প

  • সাদিকুর সাত্তার আকন্দ
  • প্রকাশিত ৩০ আগস্ট ২০১৯

পৃথিবীতে যত রাষ্ট্র অনুন্নত থেকে উন্নয়নশীল বা কালক্রমে উন্নত দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে, সেগুলোর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, তারা নয়া উদ্যোগ বা ব্যবসাকে পেট্রোনাইজ করেছে অন্যান্য খাতের চেয়ে বেশি। ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়ার কিছু দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা ব্যবসায় বা উদ্যোগমুখী। উদাহরণ হিসেবে মালয়েশিয়া, চীন ও জাপানের নাম খুবই জোরালো। এশিয়ার অনেক দেশই একথা বলতে বাধ্য হচ্ছে যে, মালয়েশিয়া বর্তমানে সবচেয়ে উদ্যোগমুখী রাষ্ট্র। অথচ তারা ১৯৬৫ সালের আগে বাংলাদেশ থেকেও পিছিয়ে ছিল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। ব্যবসা হলো উন্নয়নের এমন এক প্যানাসিয়া যা কখনো নষ্ট হয়ে যায় না। কোনো দেশের হর্তাকর্তারা যদি ভাবেন যে, অন্য যে কোনো ধরনের আয় উৎসকে কম গুরুত্ব দিয়ে হলেও ব্যবসাকে দেশের উন্নয়নের বড় নিয়ামক হিসেবে চিন্তা করবে, তাহলে সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে। কারণ একজন ব্যবসায়ী বা একটি ব্যবসায় একবার তৈরি হলে বা গড়ে উঠলে আচমকাই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যায় না। যদিও রাজনীতির মেরূকরণ হয়, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসাও টিকে থাকে। বর্তমানে চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে ব্যবসায়ী রাষ্ট্রগুলো যত না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত শ্রমশক্তিনির্ভর রাষ্ট্রগুলো।

বাংলাদেশকে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে জ্যামিতিক গতিতে এর উন্নয়ন হবে। উদ্যোক্তা তৈরির সব উপাদান বিদ্যমান রয়েছে বাংলাদেশে। কেবল কিছু শাণিত চিন্তা ও সংশোধনীই পারে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে নিয়ে যেতে। বাংলাদেশে উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে কি সমস্যা রয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসবে, তা হলো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের অস্পষ্টতা। প্রকৃতপক্ষেই আমরা ব্যবসায়িক জাতি হিসেবে নিজেদের বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে চাই কি-না? ব্যবসায়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল প্যানাসিয়া হিসেবে বিবেচনা করি কি-না? এমন প্রশ্নগুলো হরহামেশাই ঘুরপাক খায় নয়া উদ্যোক্তাদের অন্তরে। দেশে যারা উদ্যোক্তা হচ্ছেন বা হয়েছেন, তারা নিজেদের প্রচেষ্টায় হয়েছেন। উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কতটুকু ভূমিকা রয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য যে কোর্সগুলো পড়ানো হয় তা কি আদৌ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে যথার্থ রস সঞ্চার করতে পারছে? শিক্ষার্থীদের মনে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে মোটা দাগে উদ্যোক্তাদের প্রকৃতি নির্ণয় করা জরুরি।

মূলত যারা উদ্যোক্তা হতে চান, তারা তিন ধরনের মানুষ— এক. কিছু মানুষ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু আশপাশের পরিবেশকে দোষারোপ করেন প্রতি পদক্ষেপে। তারা অনেক কাজের প্রস্তুতি নেন কিন্তু মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণে পিছু হটেন। এসব উদ্যোক্তা অনেকটা লজ্জাবতী গাছের মতো। গ্রামগঞ্জে একটা গল্প প্রচলিত আছে লজ্জাবতী গাছ নিয়ে। লজ্জাবতী গাছ নাকি নিজেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। তার গঠন তেঁতুল গাছের মতো। সে একদিন তেঁতুল গাছের মতোই বড় হয়ে অন্যান্য গাছের মতো বাতাসে দোল খাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে এক হাতের চেয়ে বেশি লম্বা হতে পারে না। এর কারণ হিসেবে লজ্জাবতী গাছগুলো প্রাণিকুলের অন্যান্য উপকরণকেই দায়ী করে। কেননা কোনো ব্যক্তি বা জীবজন্তু অথবা বস্তুর স্পর্শ পেলেই লজ্জাবতী গাছ চুপসে যায়। বিভিন্ন সময়ে এভাবে চুপসে যাওয়ার কারণেই নাকি লজ্জাবতী বীরুৎ প্রকাণ্ড বৃক্ষে রূপ নিতে পারে না। এমন মুখরোচক কিচ্ছা প্রচলিত রয়েছে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে। লজ্জাবতী বীরুতের মতো কিছু উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা নিজেদের প্রবণতার চেয়ে বাস্তব পরিবেশকে বেশি দায়ী করেন। যদিও বাস্তব পরিবেশ উদ্যোক্তার উপযোগী হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন উদ্যোক্তার দৃঢ় মনোবল।

দুই. দ্বিতীয় একশ্রেণির মানুষ যারা উদ্যোক্তা হতে চান অথচ অতি ছোট কোনো অসুবিধাকেও ভবিষ্যতের জন্য বড় ভয়ের কারণ বলে মনে করেন। এ ধরনের উদ্যোক্তারা কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে যান। কিন্তু হঠাৎ নগণ্য বিষয়কে ভয়ের কারণ হিসেবে মনে করে পিছু হটেন। আবার নতুন করে নতুন কাজ শুরু করার কথা ভাবেন। কিন্তু শুরু করেও পরের কাজটিতে সফল হতে পারেন না। এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ঘুঘু পাখির জীবন আচারের কিছু দিক মিলে যায়। অজপাড়াগাঁয়ে ঘুঘু পাখির আচরণ নিয়ে একটি প্রবাদ আছে, ‘ঘুঘুর ডিম ঘুঘুই খায়, ডরে ভয়ে দিন হারায়।’ প্রবাদটির সারকথা হলো— ঘুঘু পাখি অত্যন্ত শৌখিন ও ভীতু প্রকৃতির। অতি সাধারণ কোনো শব্দ কিংবা তার বাসার আশপাশে জনপ্রাণীর উপস্থিতিতে ঘুঘু পাখি খুব ভয় পায়। ঘুঘু যদি বুঝতে পারে তার বাসার ডিম কেউ স্পর্শ করেছে, তাহলে ঘুঘু তৎক্ষণাৎ ডিম ভেঙে ফেলে অথবা বেশিরভাগ সময়েই নিজের ডিম নিজে খেয়ে ফেলে। পরে ঘুঘুটি অদূরে অন্য কোনো জায়গায় বাসা বাঁধে এবং যথারীতি ডিম পাড়ে। কিন্তু প্রতিবারই এ ধরনের আশঙ্কা থেকে সে একই আচরণ করে থাকে। এভাবে ঘুঘুর ডিম দেওয়ার সময় পেরিয়ে যায়। ওই ঋতুতে আর ঘুঘুর দ্বারা বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব হয় না। এজন্য অন্যান্য পাখির তুলনায় ঘুঘুর বংশবিস্তার নিতান্তই কম।

কথিত দুই ধরনের উদ্যোক্তা ছাড়া আরেক ধরনের উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা নিজেদের চারপাশের পরিবেশ বা প্রবণতা দ্বারা চালিত হন না। বরং ভয়কে জয় করেন অদম্য গতিতে। কিন্তু এ ধরনের গতিশীল উদ্যোক্তা তৈরির কাজ আরো অনেক সহজ হবে যদি প্রাতিষ্ঠানিক কিছু বিষয়ে পরিমার্জন ও নবায়ন করা যায়। তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ব্যবসায় ডিসিপ্লিনে পড়াশোনা করেন তারা সাধারণত অতিরিক্ত জ্ঞানলব্ধ কাজের মধ্যে টার্মপেপার, ইন্টার্নশিপ বা কিছু বিষয়ে থিসিস নিয়ে কাজ করেন যা তাদের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের দিকে উৎসাহিত করে। কিন্তু প্রায়োগিক জ্ঞানের শক্তিতে শিক্ষার্থীরা অতটা বলিয়ান হন না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি প্রায়োগিক জ্ঞান বাড়াতে হয়, তাহলে অন্তত ব্যবসায় ডিসিপ্লিনের সিলেবাসে অর্থাৎ থিসিস বা ইন্টার্নশিপ এমনভাবে সম্পন্ন করতে হবে, যেন শেষ বর্ষে অধ্যয়নকালে কম মূলধন দিয়ে একটি ব্যবসা শুরু করতে পারে। এক বছর তারা নিজেদের পছন্দমতো অবসর সময়ে ব্যবসা করবে। এক বছরে লাভ হোক বা লোকসান হোক এর হিসাব সম্পন্ন করতে হবে। আর হিসাব অবশ্যই তাদের একাডেমিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সম্পন্ন করবে। বিষয়টি আরেকটু জোরালোভাবে বললে বলতে হয়, এক বছর একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা করলে ব্যবসায়টি অবশ্যই একটা আইনগত অবস্থান পাবে। সেক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও বাস্তব দু’ধরনের জ্ঞানই অর্জিত হবে। টার্মপেপার বা ইন্টার্নশিপ নিজের এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানেই হয়ে যাবে। সাধারণত অন্য প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করা অথবা টার্মপেপার বা থিসিস রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যে প্রক্রিয়া বা ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন নিজের তৈরি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের বেলায়ও তা-ই করবেন। আর শিক্ষকদের যথার্থ মূল্যায়নের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থী ছাত্র থাকাকালীনই ক্ষুদ্র একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বনে যাচ্ছেন স্ব-উদ্যোগে বা একাডেমিক বাধ্যবাধকতার কারণে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ছাত্রজীবনের ইতি টানার সুযোগ হবে স্বনির্ভর হয়ে।

এভাবে যদি চিন্তা করা যায় তবে বাংলাদেশ হবে উদ্যোক্তাদের অভয়াশ্রম। তখন লজ্জাবতী গাছ কিংবা লাজুক ঘুঘু পাখির মতো কোনো উদ্যোক্তার উদ্যোগ অংকুরে বিনষ্ট হয়ে যাবে না। একাডেমিকভাবে বা প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে একজন উদ্যোক্তা গড়ে তুললে তার মানসিক প্রবণতা হবে অনেক সুদৃঢ় ও মজবুত। আর এভাবেই সম্ভব একটি ব্যবসায়িক জাতি গড়ে তোলা।

 

লেখক : প্রভাষক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads