• মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

মুক্তমত

ডিপ্রেশন বনাম স্বপ্ন জয়

  • প্রকাশিত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আরিফ ইকবাল নূর

 

 

 

ডিপ্রেশন মানুষকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তেও নিয়ে যেতে পারে। শুধু স্বপ্ন ব্যর্থ হওয়াই কি একমাত্র কারণ? যদিও তাও হয়, তবু নিজেকে অবসাদের ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া কি উচিত হবে? জীবনের মূল্য কি এতই কম?  না, প্রতিটি মানুষ নিজেকে সফল হিসেবে দেখতেই ভালোবাসে। জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত আমরা মুখোমুখি হই কঠিন বাস্তবতার। সব কাজ সঠিক সময়ে করে উঠেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অধরাই থেকে যায়। কিন্তু কোনো কাজে যখন আমরা ব্যর্থ হই, তখন আমাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করে। অনেকে ব্যর্থ হয়ে সুইসাইড করে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ডিপ্রেশনে পড়ে ড্রাগস নিয়ে থাকে। যারা সফলতা অর্জন করেছে তাদের অনেকের কষ্ট ছিল, জীবনের শুরুতেই বারবার হতাশা বাসা বেঁধেছিল। কিন্তু তারা হাল ছেড়ে দেয়নি, নিজের মধ্যে ডিপ্রেশনকেও স্থান দেয়নি। এমনকি সুইসাইডও করেনি। কারণ তারা জানত, ব্যর্থতা মানে নিচে পড়ে যাওয়া নয়। নিচে পড়ে যাওয়ার পর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা না করাই হলো ব্যর্থতা।

আব্রাহাম লিংকন আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ব্যর্থতাকে হার মানাতে হয়। তিনি ২৩ বছর বয়সে চাকরি হারান এবং রাজনীতিতে পরাজিত হন। ২৪ বছর বয়সে ব্যবসায় ক্ষতি হয়। ২৬ বছর বয়সে হারান প্রিয়তমাকে। ২৯ বছর বয়সে স্পিকার পদে পরাজিত হন। ৩৪ বছর বয়সে কংগ্রেস প্রার্থী নির্বাচনে হেরে যান। ৩৯ বছর বয়সে আবার কংগ্রেস প্রার্থী নির্বাচনে হেরে যান। ৪০ বছর বয়সে ভূমি অফিসার পদে রিজেক্ট হন। ৪৫ বছর বয়সে সিনেট নির্বাচনে হেরে যান। ৪৭ বছর বয়সে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচনে হেরে যান। ৪৯ বছর বয়সে আবারো সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হন। অবশেষে ৫২ বছর বয়সে তিনি হন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তিনি চলার পথে এতগুলো হারের পরও যিনি কখনো ভাবেননি, রাজনীতি তার জন্য নয়। আর তাই তো তিনি হতে পেরেছিলেন আমেরিকার সর্বকালের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত প্রেসিডেন্টেদের একজন।

আবার অনেকে আর্থিক সমস্যার কারণে সবসময়ই ডিপ্রেশনে থাকে এবং বড় স্বপ্ন দেখার সাহস করে না। অথচ যারা আজ পৃথিবীতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তাদেরও আর্থিক সমস্যা ছিল। কিন্তু আর্থিক সমস্যা তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। ৯ বছর বয়সের এক ছেলে খাবারের অভাবে মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিল, তারপর গ্রামের এক ভাইয়ের সহযোগিতায় দোকানে রুটি বানানোর কাজ পায়। তারপর পড়াশোনা। সেই ছেলেটির নাম আজ সবার মুখে মুখে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আরেক বালকের কথা জানি, বাড়ি জামালপুর। খড়ের ঘরে থাকত আর ছাগল চড়াত। ছাগলের দুধ বিক্রি করে বিড়ি-সিগারেটের দোকান করত। একপর্যায়ে বাজারে গামছা বিছিয়ে টাকা তুলে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। সেই ছেলেটিই হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান। শ্যাম নাজোমা পেশায় ছিল নাপিত। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে কিংবা সেলুনে চুল কাটত। সে-ই হয়েছিল কৃষ্ণ-আফ্রিকার মুক্তি আন্দোলনের নেতা এবং স্বাধীন নামবিয়ার রাষ্ট্রপতি। জন মেজর অভাবের তাড়নায় কুলিগিরি করত। একদিন বাসের কন্ডাক্টরের কাজের জন্য গেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। যে যুবকটি অঙ্কে পারদর্শী নয় বলে বাসের কন্ডাক্টর হতে পারেনি, পরবর্তীতে সে-ই হয় ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী।

মুস্তাফিজুর রহমানের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। পড়াশোনাও বেশি করেনি। বেকার থাকার কারণে মা-বাবা প্রায়ই বকাঝকা করত। তবুও ছেলেটি ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। প্রায় প্রতিদিনই ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্র্যাকটিস করতে যেত। সেই বেকার ছেলেটিই আজ বাংলাদেশের গর্ব সবচেয়ে আলোচিত ও দুর্দান্ত বোলার। অসাধারণ পারফর্ম করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যাকে আজ পুরো বিশ্ব চেনে।

আজকের ফুটবল কিংবদন্তি মেসি ছোটবেলা থেকে হরমোন ডেফিশিয়েন্সি, অপুষ্টির শিকার এক বালক। যার বাবার চিকিৎসা করানোর মতো টাকা ছিল না। আলবার্ট আইনস্টাইন পড়ালেখায় মারাত্মক দুর্বল ছিল। ক্লাসে শেষ বেঞ্চে বসে থাকত। সাত বছর বয়স পর্যন্ত রিডিং পড়তে অক্ষম ছিল। কোনো কিছু মনে থাকত না। যাকে মানসিক প্রতিবন্ধী হিসেবে ধরে নিয়েছিল। সেই বালকটি পৃথিবীকে অবাক করে দেয় তার ‘থিউরি অব রিলেটিভিটি’ দিয়ে। নোবেলও জিতেছে। টমাস আলভা এডিসনও ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল ছাত্র ছিল। তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই দুর্বল ছাত্রটি পৃথিবীকে আলোকিত করেছে তার আবিষ্কার ইলেকট্রিক বাল্ব দিয়ে।

জিরো থেকে হিরো হওয়া উদাহরণগুলো দেওয়ার কিছু কারণ আছে। এদের অনেকের কষ্ট ছিল, জীবনের শুরুতেই বারবার হতাশ হয়েছিল। কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়নি। আর তারা কেউই অসাধারণ প্রতিভাধরও ছিল না। তবে হ্যাঁ, অসাধারণ পরিশ্রমী ছিল। প্রতিভা কম-বেশি সবারই থাকে। এটা বিশেষ কোনো ফ্যাক্টর নয়। মূল বিষয় হচ্ছে নিজের লক্ষ্য পূরণে তুমি কি করছ। আমরা সবাই একটা ভালো ব্র্যান্ড খুঁজি। কিন্তু নিজেদের ব্র্যান্ড বানানোর চেষ্টা করি না। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষই একেকটা ব্র্যান্ড। সমস্যা হচ্ছে এটা বুঝতেই আমরা জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়ে দিই।

সৌভাগ্য অথবা সফলতা নামের সোনার হরিণ করায়ত্ত করতে পরিশ্রমের পাশাপাশি এর সঙ্গে যোগ করতে হবে সঠিক প্রচেষ্টা আর কিছু সাধারণ কৌশল। মনে রাখতে হবে, কোনো কাজে একবার ব্যর্থ হলে ভেঙে পড়লে চলবে না, পুনরায় চেষ্টা করতে হবে। সবসময় ইতিবাচক মানসিকতার অনুশীলন করে ইতিবাচক মানুষদের সাহচর্য বজায় রাখতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে হবে। অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের দৃঢ়তাকে মজবুত ও অনুসরণ করতে পারলে নিশ্চিতভাবে আমরা প্রত্যেকেই পৌঁছে যেতে পারব সাফল্যের স্বর্ণশিখরে। কিন্তু ডিপ্রেশনকে জায়গা দেওয়া যাবে না। আমরাও দ্বিতীয় কোনো আতিউর রহমান কিংবা আব্রাহাম লিংকন হব না, তার কি-বা নিশ্চয়তা আছে? তাই হতাশ না হয়ে লেগে থাকতে হবে স্বপ্ন জয়ের লক্ষ্যে।

সুতরাং জীবনে যত ব্যর্থতাই আসুক না কেন, তাকে জয় করার মতো ধৈর্য ও সাহস রাখতে হবে। তবেই আমরা স্বপ্ন পূরণের সফল পথেই হেঁটে যেতে পারব।

 

লেখক :  শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads