• মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

মুক্তমত

শিশুর ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হোক

  • প্রকাশিত ১৪ অক্টোবর ২০১৯

খায়রুল আহসান মারজান

 

 

নির্জন পার্ক কিংবা ব্যস্ত কোনো পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছেন।  হঠাৎই হয়তো পাশে থাকা কোনো শিশুকণ্ঠ বলে উঠল— ‘ভাই সকাল হইতে কিছু খাই নাই। কয়ডা ট্যাহা (টাকা) দেন’ অথবা জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির গ্লাসে উঁকি দিল কোনো নারীমুখ। কোলের ঘুমন্ত কঙ্কালসার শিশুটিকে ইঙ্গিত করে দু’মুঠো ভাতের দাবি ছুড়ে দিল। অতঃপর শিশুটির কঙ্কালসার দেহ; ধানক্ষেতের আইলের মতো গণনাযোগ্য পাঁজরের হাড় কিংবা ক্ষুধার্ত শিশুর নিষ্পাপ করুণ চাহনি দেখে আমরা অনেকেই হয়তো আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। সামর্থ্য অনুযায়ী টাকাও দিই। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি এই টাকা দিয়ে বাচ্চাটি কী খায়? কিংবা আদৌ খেতে পায় কি না? নাকি সহানুভূতির টানে দান করা এই টাকা চলে যায় কোনো অদৃশ্য চক্রের ভান্ডারে?

আমরা হয়তো এসব ভাবিও না। কারণ দানের বিনিময়ে পাওয়া সওয়াবের পাহাড়ের উচ্চতা কল্পনা করতেই তখন আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অথচ দানের টাকায় মানবতার সেবা তো কিছু হলোই না; বরং একটি চক্র হলো আরো শক্তিশালী এবং এমন হাজারো শিশুর ভিক্ষাযন্ত্রে পরিণত হওয়ার পথ প্রশস্ত হলো। এমনিভাবেই বর্তমানে শিশুদের হাতে ভিক্ষার থালা ধরিয়ে দিয়ে মানুষের সহানুভূতি ও আবেগকে ব্যবহার করে ধোঁকা দিয়ে ভিক্ষা বাণিজ্য শুরু করেছে কয়েকটি চক্র। এরা নগরের হাসপাতাল কিংবা বস্তির অলিগলি থেকে শিশুদের চুরি করে আনে এবং এসব শিশুকে কোলে নিয়ে কিংবা রাস্তার পাশে বসিয়ে দিয়ে চলতে থাকে এসব চক্রের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রমরমা ভিক্ষাযজ্ঞ। এমনকি শিশুগুলো যাতে কান্নাকাটি বা কোনো ঝামেলা করতে না পারে, তাই এসব শিশুকে খাওয়ানো হয় ক্ষতিকর উচ্চ মাত্রার ঘুমের ওষুধ। এমনকি শরীরে দুর্ভিক্ষের আলামত এবং চেহারায় অনাহারী ভাব ধরে রাখার জন্য সারাদিন না খাইয়েও রাখা হয় এসব শিশুকে। এছাড়া একটু বেশি সহানুভূতি পাওয়ার জন্য অনেকের শরীরে পোড়া দাগ কিংবা  হাত-পা কেটে বিকলাঙ্গ করার মতো অমানুষিক কাজ করতেও পিছপা হয় না এসব চক্রের সদস্যরা। যা চরম পর্যায়ের শিশু নির্যাতনের শামিল।

কেননা নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা হয়েছে কোনো শিশুকেই জোর করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োগ করা যাবে না। এমনটা করলে তা শিশু নির্যাতন বলে গণ্য হবে যা দণ্ডনীয় অপরাধ। শিশু আইন ২০১৩-এর ৭১ নং ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি কোনো শিশুকে ভিক্ষার উদ্দেশ্যে নিয়োগ করেন বা কোনো শিশুর দ্বারা ভিক্ষা করান অথবা শিশুর অভিভাবক কোনো শিশুকে ভিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রদান করেন তাহলে তিনি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

এমন সব আইন আইন থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে এমন অমানবিক শিশু ভিক্ষাবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি চক্র। প্রথম আলো এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত শিশুদের ৫৫ শতাংশই ঢাকায় বসবাস করে। আর ৯ শতাংশই সরাসরি ভিক্ষার কাজে ব্যবহূত হচ্ছে যাদের অধিকাংশেরই বয়স দশ বছরেরও কম। ২০২১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম এবং ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের সব ধরনের শিশুশ্রম বন্ধ করার সরকারি প্রত্যয় থাকা সত্ত্বেও শিশু ভিক্ষাবৃত্তির মতো এমন নব্য শিশুশ্রমের আবির্ভাব সত্যিই হতাশাজনক। শিশু আইন ২০১৩-এর ১৩ নং ধারা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি থানায় এ বিষয়গুলো তদারকির জন্য ‘শিশুবিষয়ক ডেস্ক’ থাকার কথা বলা হলেও তা কতটুকু কার্যকর আছে তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তাই প্রশাসনের এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সর্বোপরি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিশুকে অপব্যবহারের হাত থেকে রক্ষা করে তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই এসব শিশুও হয়ে উঠতে পারে আগামীর ভবিষ্যৎ।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads