• সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬
ads
এরদোয়ানের নেতৃত্বে ফের বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্ক

ফাইল ছবি

মুক্তমত

এরদোয়ানের নেতৃত্বে ফের বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্ক

  • প্রকাশিত ২৪ মার্চ ২০২০

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত পৃথিবীর বড় অংশজুড়ে ছিল তুর্কিদের দাপট। বিশেষ করে তিনটি মহাদেশে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ছিল একচেটিয়া আধিপত্য। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, উত্তরে রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর, পশ্চিম এশিয়া, ককেসাস, উত্তর আফ্রিকা ও হর্ন অব আফ্রিকাজুড়ে, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চলসহ বিস্তৃত একটি শক্তিশালী বহুজাতিক, বহুভাষিক সাম্রাজ্যের নাম ছিল অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্য। উসমানীয় আমলের শ্রেষ্ঠ শাসক সুলতান সোলেমানের নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে তাদের একটা বীরত্বগাথা পরিচয় ছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির কাছে পরাজিত হওয়ার পর রসাতলে চলে যায় তাদের জৌলুসপূর্ণ সাম্রাজ্য এবং ধ্বংস হয়ে যায় ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য। ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক শাসন ক্ষমতা দখল করে তুরস্কের খেলাফত ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত চালু ছিল তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। স্বৈরতান্ত্রিক হলেও মূলত তার হাত ধরেই আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর থেকে তারা অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা থেকে বিরত থাকে। নিজেরা ধীরে ধীরে চলতে থাকে স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের পথে। যার জন্য নাজিমুদ্দুন আরবাকানসহ বেশ কয়েকজন শাসক জোরালো ভূমিকা পালন করেন। একে পার্টির (জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি) প্রধান রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান শাসন ক্ষমতা দখল করার পর থেকে ফের বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিয়ে যাচ্ছে ন্যাটোভু্ক্ত এই দেশটি।

এরদোয়ানের নেতৃত্বের নৈপুণ্যে একের পর এক সফলতা অর্জন করেছে তুরস্ক। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে নিজের কবজায় এনে স্বদেশের স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছে। ২০১৬ সালে ইইউর সাথে চুক্তি করে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনের শরণার্থীদের জায়গা দিয়ে যে মানবতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে তিনি এবং তার দেশ সবার কাছেই বেশ প্রশংসিত হয়েছে। অবশ্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বেশ কয়েকবার তার নিজ দেশে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাকে। যেমন, ২০১৬ সালের ১৫-১৬ জুলাই প্রেসিপেন্ট এরদোয়ান ও তার সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর এক ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়। যে পরিস্থিতি তিনি বেশ বুদ্ধিমত্তার সাথেই শান্ত করেছিলেন। এরপর গত বছর তার নিজ দল একে পার্টি থেকে কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করে নতুন দল গঠন করেন। গত বছর এপ্রিলের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের দল স্থানীয় নির্বাচনে রাজধানী আঙ্কারার দখল হারায়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) প্রার্থী মানসুর ইয়াভাস আঙ্কারায় পরিষ্কারভাবে বিজয়ী হওয়ায় তার দলের জনপ্রিয়তায় কিছুটা হলেও ধস নামে। বিশেষজ্ঞরা ১৬ বছরের ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ের মধ্যে এটিকে তার বড় বিপর্যয় মনে করেছিল। দল এবং নিজ জনপ্রিয়তাকে তুঙ্গে তুলতে এবং ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য এরদোগান একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বেছে নেয়। যেটাতে তিনি সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। তুরস্কের শরণার্থী সমস্যা লাঘব করা সবকটি রাজনৈতিক দলেরই ইচ্ছা। সব তুর্কীিই চায় তুরস্কের কাঁধ থেকে শরণার্থীর বোঝা হালকা হোক। ৪০ লাখ শরণার্থীর বোঝা হালকা করার জন্য গত বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সিরিয়ায় ‘সেইফ জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ২০১৯ সালের অক্টোবরের শুরুর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার পরই তুরস্ক কুর্দি এলাকায় কয়েক দিনব্যাপী জোরালো হামলা চালায়। এর আগে এরদোয়ান ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। কুর্দি মিলিশিয়াদের হটিয়ে ‘সেইফ জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তুরস্কের সেনাবাহিনী ৯ অক্টোবর উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় অভিযান শুরু করে। অক্টোবরজুড়েই কুর্দি বনাম তুরস্কের সেনারা তীব্র যুদ্ধ করে। নিরাপদ অঞ্চল গঠন করে ২০ হাজার শরণার্থীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও তা নিশ্চিত করতে পারেনি এরদোয়ান। তবে প্রথম দিকে ৩ লাখ ১৫ হাজার ও শেষের দিকে আরো কিছু শরণার্থীকে ফেরত পাঠায়, যাতে কিছুটা হলেও নিজ দেশে তার দলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

বর্তমানে সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রই ভাবছে। এর মধ্যে রাশিয়া ও তুরস্ক খুব বেশিই মাথা ঘামাচ্ছে। কারণ, রাশিয়া ও ইরান সমর্থিত আসাদ সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে যতই হামলা ও পাল্টা হামলা চালানো হচ্ছে ততই শরণার্থীর বোঝা তুরস্কের ঘারে চাপছে। সম্প্রতি সিরিয়া ইস্যুতে ইদলিব সংকট দুদেশরই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সিরিয়ার ইদলিবে রুশ সমর্থিত আসাদ বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৩৪ তুর্কি সেনা নিহত হওয়ার পর পহেলা মার্চ তুরস্কও পাল্টা ড্রোন হামলা (অপারেশন স্প্রিং শিল্ড) চালায়। এতে সিরিয়ার ১৯ জন সেনা নিহত হয়েছে। কিন্তু আঙ্কারার দাবি তারা ১২০ জনকে নিঃশেষ করেছে। এই টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন এরদোয়ান। সেখানে সিরিয়ার ইদলিবে শান্তি ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এরদোয়ানের লক্ষ্য পুতিনের সঙ্গে আঁতাত করে ইদলিব পরিস্থিতি শান্ত করা। যাতে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে সবাই নিস্তার পায় এবং তার দেশ শরণার্থী সমস্যা লাঘব করতে পারে। ওই বৈঠকে এরদোয়ান ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারণ আঙ্কারার হামলা চালনোর পর রুশ বাহিনী পাল্টা হামলা চালায়নি এবং ক্রেমলিনের পক্ষ থেকেও তেমন কোনো প্রতিশোধমূলক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে মস্কো আঙ্কারার সম্পর্ককে ভালো চোখে দেখছে না ওয়াশিংটন। শুধু সিরিয়াই নয়, বিশ্বের আলোচিত-সমালোচিত প্রায় বিষয় নিয়েই মুখ খুলতে দেখা যায় এরদোয়ানকে। তার নেতৃত্বে তুরস্ক ড্রোন প্রযুক্তিতে বেশ উন্নতি লাভ করেছে। ইতোমধ্যে কাতার ও ইউক্রেনের কাছে নিজেদের তৈরি ড্রোন বিক্রিও করেছে তুরস্ক। সামরিক শক্তিতেও পিছিয়ে নেই দেশটি। জার্মানি, ফ্রান্স, আমেরিকার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অস্ত্র কিনে থাকে তুরস্ক। ওয়াশিংটনের হুমকি উপেক্ষা করে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ কিনেছে তুরস্ক। নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে এরদোয়ান। ‘দ্য চেইঞ্জ মেকার’ খ্যাত রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তার মেধা আর নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়ে দীর্ঘ নয় বছর ধরে চলে আসা সিরীয় পরিস্থিতিকে শান্ত করবেন নাকি আরো উত্তপ্ত করে তুলবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সাইফুল ইসলাম হাফিজ

লেখক : শিক্ষার্থী

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads