• বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭
ads
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব : তরুণদের প্রস্তুত হতে হবে

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব : তরুণদের প্রস্তুত হতে হবে

  • প্রকাশিত ০৫ এপ্রিল ২০২০

আবদুল্লাহ মাহমুদ:

১৭ শতাব্দীতে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে নতুন দিগন্তের প্রথম বিপ্লব শুরু হয়। এ বিপ্লবের বিকাশ পৃথিবীর প্রাচীন উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে বাষ্পীয় ইঞ্জিন ব্যবহারের সাহায্যে নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছিল। দেশে দেশে বিপ্লবের জোয়ারে পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের কার্যক্ষমতা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল।

এরপর ১৯ শতকের প্রথমার্ধে জ্বালানির নতুন উৎস তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের আশীর্বাদ নিয়ে আগমন করে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব। মানুষের দৈনন্দিন কাজ ও জীবনের অগ্রগতিতে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের ভূমিকা বেশ প্রশংসনীয়। যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কলকারখানা স্থাপনে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের ভূমিকা মনে করে রেখেছে বিশ্ব। জ্বালানির অভিশাপ ও আশীর্বাদ হিসাবনিকাশ করার আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো অধ্যায় সূচিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি আধুনিক বিশ্বের নব্য সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।

কম্পিউটার প্রযুক্তি, মাইক্রোচিপস ও আণবিক শক্তির উদ্ভাবন তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সাথি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ শিল্প বিপ্লব আমাদেরকে ইন্টারনেট, মোবাইল প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সংক্ষিপ্ত ও সহজ করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসায় কম্পিউটার ব্যবহার ও বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে পরিবর্তন এনেছে দ্রুতগতিতে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মানুষের জীবনযাত্রার মান ও ব্যাপ্তিকে অনেক বড় পরিসরে পরিবর্তন এনেছে। মানুষের জীবনে এ বিপ্লব আনতে পারে আমূল পরিবর্তন।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির এই শিল্প বিপ্লবে বিশ্বের কয়েকটি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ ইতোমধ্যে নিজেদের উৎকর্ষ সাধন করেছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে অভিশাপ না ভেবে আশীর্বাদ ভেবে নিজেদের এগিয়ে যেতে হবে। বাস্তব জীবনে, উৎপাদন ক্ষেত্রে ও আধুনিক বিশ্বের বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে চলতে হলে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে সফল হতে হলে, দেশের তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, উৎপাদন ব্যবস্থা, বিশ্ববাজার ও ডিজিটাল বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর্মসময়ের সংক্ষিপ্ততা এ বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য। সংক্ষিপ্ত সময়ে বৃহৎ কাজ সম্পূর্ণ, ব্যক্তির আত্মোন্নয়নের পাশাপাশি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও উৎপাদন ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষ এ শিল্প বিপ্লবের আশাজাগানিয়া বিষয়। তাই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে বাংলাদেশকে শক্তিশালী অর্থনীতি ও উৎপাদনে সক্ষম করতে তরুণ প্রজন্মকে ভূমিকা রাখতেই হবে। আর তা করতে গেলে তরুণ প্রজন্মকে সেই ব্যবস্থায় গড়ে তোলার কাজটিও সারতে হবে দ্রুততার সঙ্গে।

প্রযুক্তি জ্ঞান ও কাজের দক্ষতা এ শিল্প বিপ্লবের প্রধান আকর্ষণ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্যমতে দেখা যায়, কাজে দক্ষতার অভাব ও প্রযুক্তি জ্ঞান স্বল্পতার কারণে সারা বিশ্বে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ তার নিজ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। আমাদের দেশে ও বিদেশে কর্মরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি মানুষও একই কাতারে আবদ্ধ হতে পারে। আধুনিক বিশ্বে সৃষ্ট নব্য কলকারখানা ও উৎপাদন ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশে আগের তুলনায় কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও কর্মসংস্থানের হ্রাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন অনিশ্চিয়তার কারণ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়, শিক্ষিত তরুণদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৮.৫% অর্থনীতিতে ক্রিয়াশীল, এদের মধ্যে ৫.৩% বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষিত রয়েছে। কিন্তু বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে মাত্র ০.৩% শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি। যেখানে আধুনিক ও ডিজিটাল বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্যদেশ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে আমরা প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এখনো বেশ পিছিয়ে। ডিজিটাল বিপ্লবের বিকাশ ঘটার কারণে নতুন করে আরো কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিপুল সংখ্যক দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা হওয়াটা স্বাভাবিক। এ দেশে মেধাবী, দক্ষ ও সম্ভাবনাময় তরুণ রয়েছে, কিন্তু তাদের কাজে লাগাতে হলে কারিগরি শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন রয়েছে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিকাশকে কাজে লাগিয়ে ইতোমধ্যে চীন, জাপান ও ভারত প্রত্যেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে বেশ প্রতিষ্ঠিত অবস্থান করে নিয়েছে। চীনা তরুণদের কারিগরি জ্ঞান, অর্থনীতিতে তাদের সম্পৃক্ততা সে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। যদি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা যায়, তবে আমাদের পক্ষেও পোশাক শিল্পখাতের রপ্তানিকেও অতিক্রম করে একটি বহুমাত্রিক রপ্তানিনির্ভর সবল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা সক্ষম হব। অবকাঠামো ও সংযোগের সমস্যা এ খাতকে সংকট করছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ ও স্মার্ট ডিভাইস উন্নয়ন বাধার মুখে পড়ে রয়েছে। তরুণদের কারিগরি শিক্ষাবিমুখতা ও অতিমাত্রায় অনলাইন আসক্তি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে চিন্তাশীলদের। অধিকাংশ তরুণ ইন্টারনেট ব্যবহার, অনলাইনে সম্পৃক্ত থাকলেও কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষা নিয়ে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। অনলাইনের ইতিবাচক দিকগুলোকে কাজে না লাগিয়ে নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতি বেশি প্রভাবিত হতে দেখা যায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ তরুণ এখনো এই ধারণায় বদ্ধমূল রয়েছে যে, অনলাইন বা প্রযুক্তি খাতে অবদান রাখাটা আমাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। কেননা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার অভাব সে সম্ভাবনাকে আরো সংক্ষিপ্ত করেছে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের বিমুখতার কারণ সম্পর্কে বিশ্লেষণের সময় এখনি। দেশের তরুণদের প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হলে সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। প্রধানত, প্রযুক্তি শিক্ষয়ই প্রবেশাধিকারকে আরো সহজতর করতে হবে। সাধারণত অল্প কিছু সংখ্যক ছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের বৃহৎ অংশ বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে না। ফলে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগ বেশ দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়ায় তাদের কাছে। পারিবারিক সুযোগ-সুবিধা ও অর্থ সংকটের কারণে অনেকে প্রযুক্তি বিষয়ে মোটেই আগ্রহী হয় না। কেননা এসব দ্রব্য বেশ দামি, যেটা সবার পক্ষে কেনা ও ব্যবহার সম্ভব হয়ে ওঠে না। এছাড়াও প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা আমাদের দেশে একেবারেই নগণ্য। ফলে সামান্য সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ছাড়া অন্য কারো পক্ষে এ শিক্ষা অর্জন সম্ভব হয় না।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই ডিজিটাল যুগে দেশকে এগিয়ে নিতে তরুণদের বিকল্প চিন্তা করার কোনো উপায়ই নেই। তরুণদের বিজ্ঞানবিমুখতা তাই এ শিল্প বিপ্লবে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই দেশকে এগিয়ে নিতে ও স্বনির্ভর অর্থনীতি সৃষ্টিতে তরুণদেরকে প্রস্তুত হতেই হবে। এ সমস্যা সমাধান ও তরুণদের কারিগরি জ্ঞান ও কাজের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্যে আমাদের তরুণদের হড়ে তোলার এখনই সময়।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads