• বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭
ads
করোনা ভাইরাস ও একজন সাংবাদিক

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

করোনা ভাইরাস ও একজন সাংবাদিক

  • প্রকাশিত ১৯ এপ্রিল ২০২০

শ্যামা সরকার:

বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। যা কোভিড-১৯, নামে পরিচিত। এ ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯- এনসিওভি বা নভেল করোনা ভাইরাস। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) রোগটির কোভিড-১৯ নামে নামকরণ করে, যা 'করোনা ভাইরাস ডিজিজ ২০১৯'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এছাড়া এটিকে বিশ্ব মহামারী বলেও ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসেম্বর ২০১৯ ইং তারিখে চীনের উহান থেকে এই ভাইরাসের বিস্তার শুরু এবং এখানকার মানুষই বেশি আক্রান্ত হয়। এ কারণে উহান শহরের সঙ্গে অন্য শহরগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ ছাড়া ওই সময়ে উহান থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে হুয়াংগাং শহরও অবরুদ্ধ করা হয়। পরে চীন ১১ জানুয়ারি ২০২০ ইং তারিখে করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস।

এরপর একের পর এক দেশে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইরান, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসসহ বিশ্বের পরাক্রমশালী দেশগুলো আজ এ ভাইরাসের কাছে পরাভূত। এসব দেশে কমছে না মৃতের সংখ্যা।

করোনা ভাইরাসের জন্য উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও করোনা আতঙ্ক আর উদ্বেগ ভর করেছে।

দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণা ইনস্টিটিউট- আইইডিসিআর। এর ১০ দিন পর দেশে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় একজনের। দেশের বিভিন্ন জেলায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে মৃতের সংখ্যা। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে মানুষকে ঘরে অবস্থান করার বিষয়টি নিশ্চিতকরণে রাজপথে, পাড়া-মহল্লায় টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ।

চিকিৎসকের পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন প্রিন্টিং ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও এর সংক্রমণরোধে সমান্তরালভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। টেলিফোনে আলাপকালে জানতে পারি বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কর্মরত অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। শোনার পর থেকেই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায় এবং বিষয়টি উদ্বেগেরও। কারণ যাদের কথা শুনেছি তারা এক সময় আমার সহকর্মী ছিলেন। বিশেষতই মনটা বেশ খারাপ হলো এবং সিদ্ধান্ত নিলাম এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যারা নিয়োজিত তাদের নিয়ে দু-এক কলম লিখবো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ের জন্য প্রতিদিনই বিকেল ২টা ৩০ মিনিটে টেলিভিশন চ্যানেলে চোখ রাখি। এ যেন দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে। কারণ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছাড়া আর কিছু তো এ অধিদপ্তর দিতে পারবে না। আর এর মাঝে মাঝে নিউজ চ্যানেলগুলোতে আপডেট দেখা। সত্যি কথা বলতে কী- পত্রিকা রাখা আপাতত বাদ দিয়েছি। তাই পত্রিকায় এখন আর মুখ লুকাতে পারি না। তবে খুব মিস করি।

যাই হোক, একজন সাংবাদিককে নিয়ে আমার আজকের লেখা। করোনা ভাইরাসের কারণে ঘরে থাকা, নিউজ আপডেট দেখা ও টকশো দেখা নিত্যনৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন টকশো দেখা হয় না। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এটিএন নিউজে মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় “নিউজ আওয়ার এক্সট্রা” দেখার সুযোগ হয়েছে। মোটামুটি আমি তার প্রতিটি “নিউজ আওয়ার এক্সট্রা” দেখেছি। তার সাহসিকতা, নির্ভীক ও সাবলীল সঞ্চালনা সব সময়ই আকৃষ্ট করে। বাড়িওয়ালারা চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাংবাদিকদের যখন বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন সেখানেও তিনি সাহসিকতার ভূমিকা রেখেছেন এবং আমার যতটুকু মনে পড়ে তিনি ছোট্ট একটি বার্তাও বাড়িওয়ালাদের জন্য দিয়েছিলেন যে, ‘এই বৈশ্বিক মহামারী থাকবে না আমরা একদিন কাটিয়ে উঠবো এবং সেদিন এরকম যেন না হয় যে আমার বাড়ির বিদ্যুৎ লাইনটা নেই, একটা ফোন দিন’। এছাড়া দেখেছি তিনি হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে সরাসরি কানেক্ট হয়েছেন। সেখানে বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও সাংবাদিকরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন। শনিবার-এপ্রিল ১৮, ২০২০ ইং দেখলাম অন্যরকম চিত্র। পিপিই নিয়ে চিকিৎসকদের টেলিফোনে মতামত (যদিও তাদের নাম, পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে), স্টুডিওতে আমন্ত্রিত যে চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন তিনি পিপিইসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়গুলোর সন্তোষজনক কোনো উত্তর বা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। আমরা দর্শকরাও স্বস্তিতে ছিলাম না। আমি হয়তো প্রত্যেকটি “নিউজ আওয়ার এক্সট্রা” দেখবো। আমার লেখার কারণ হলো আমি হয়তো সবকিছু মিলিয়ে লিখতে পারবো না। আমার কাছে এ সময়টিই সঙ্গত মনে হয়েছে। আমি এটিএন নিউজের “থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর” দেখছি নিয়মিত। এক অসাধারণ উদ্যোগ। চিন্তা-চেতনার এক অনন্য উচ্চতায় সাংবাদিক মুন্নী সাহা। স্যালুউট জানাই মুন্নী সাহাকে।

মুন্নী সাহা শুধু একটি নাম নয়- একটি প্রতিষ্ঠান। সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও কাছে যাওয়ার এক সহজ মাধ্যম সাংবাদিকতা। চিকিৎসা পেশার চাইতে কোন অংশে কম নয়। খুব কাছে থেকে মানুষের সেবা করার উত্তম মাধ্যম। এটি আমার ব্যক্তিগত ধারণা। তবে মুন্নী সাহা মানেই চ্যালেঞ্জ। এ কথাটি আমি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের মুখে শুনেছি। তিনি আরো বলেছেন, একটি মেয়ে হয়ে হেলিকপ্টার নিয়ে যেভাবে সংবাদ সংগ্রহের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন তা একমাত্র মুন্নী সাহার পক্ষেই সম্ভব। আজো তিনি করোনাকে ভয় না পেয়ে একই পথে হেঁটে চলেছেন সম্পূর্ণ নিজের বিশ্বাসে। নিজে ঝুঁকির মুখে থেকে সবাইকে অভয় দিয়ে যাচ্ছেন। ‘সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা’র জন্য আরো একবার স্যালুউট জানাই তাকে।  

সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। ঝুঁকিপূর্ণও বটে। আর এই ঝুঁকিকেই তিনি আশীর্বাদ হিসেবে নিয়েছেন। সফলতাও পেয়েছেন এ পেশায়। একজন সাংবাদিক তার দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমেই সমাজকে সচেতন করে, সরকারকে সচেতন করে, দেশকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিতে, কর্মসংস্থানে তথা সকল পর্যায়ে একজন সাংবাদিকের অবদান অনস্বীকার্য। এই প্রত্যেকটি সেক্টরেই তার পদচারণা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই এক নামে যাকে চেনে তিনিই মুন্নী সাহা।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আমার কাজ করার পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলেন- মুন্নী সাহা (চিফ এক্সিকিউটিভ এডিটর, এটিএন নিউজ) ও প্রভাষ আমিন (হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ)। একদম ফ্রেশার। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কাজ করার কোন অভিজ্ঞতা নেই। তার পরেও ওনারা দুজনেই আমাকে সিলেক্ট করলেন। এটি অবশ্যই আমার জন্য একটি আনন্দের খবর। আমাকে মুন্নীদি বললেন, আমরা সিলেক্ট করলাম আপনি শ্যামলদাকে জানান। উনি ছেড়ে দিলের আমাদের অসুবিধে নেই। আমি জানি না ঈশ্বর আমাকে এতোবড় সুযোগ দিলেন ওনাদের মতো নামকরা সাংবাদিকের সঙ্গে কাজ করার। তবে এসবের নেপথ্যে যিনি কাজ করেছেন তার কথা না বললেই নয়। তিনি হলেন, শান্তনু চৌধুরী। বর্তমানে ডিবিসি চ্যানেলে কর্মরত। ওনার একটা ফোনেই প্রভাষদা আর মুন্নীদি আমাকে সুযোগটি করে দেন। আমি সারাক্ষণ শুভকামনা করি ওনারা ভালো থাকুন। দেশ ও জাতি ওনাদের কাজ থেকে ভালো কিছু আশা করে। কৃতজ্ঞতা জানাই। এ পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই শ্যামলদাকে (শ্যামল দত্ত, সম্পাদক, ভোরের কাগজ)। যিনি আমাকে দৈনিক ভোরের কাগজে কাজ করার সুযোগ দেন। আমার জীবনে যারা বিভিন্ন উইনডো খুলে দিয়েছেন তারা সবাই স্ব স্ব পদে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাদের সংস্পর্শে যেতে পেরে আমি ধন্য।

অনেক আগে থেকেই মুন্নী সাহাকে নিয়ে লেখার ইচ্ছে ছিল। বাংলাদেশের নারীদের সাহসিকতা ও অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি। তাই বলা যায়, সকল ক্ষেত্রে নারীর বৈষম্য দূর করে একজন নারীকে সাংবাদিক হয়ে ওঠার পেছনে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। নারীর প্রসঙ্গ টেনে আনলাম এ কারণে আমার কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তিনি কীভাবে তার প্রতিষ্ঠানে নারীদের স্বাধীনতা দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। খুব সঙ্গত কারণেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাই তার উদ্দেশ্যে বলতে চাই,

আমি চিত্রাঙ্গদা, রাজেন্দ্রনন্দিনী।

নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।

পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে

সে নহি নহি,

হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে

 সে নহি নহি।

সবশেষে বলতে চাই, নারীরা প্রধান প্রতিবেদক ও বার্তা সম্পাদক পদে কাজ করছেন হাতেগোনা কয়েকজন। বেসরকারি টেলিভিশনের গত দেড় যুগের ইতিহাসে নারীদের প্রাধান্য দেখা গেছে, মূলত সংবাদ উপস্থাপনায়, সাংবাদিকতা করতে করতে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় পদে আসীন হতে দেখা গেছে মুন্নী সাহার মতো দু-একজনকে। একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সাংবাদিক হিসেবে আগামীর সাংবাদিককে অনুপ্রাণিত করবে- এই প্রত্যাশা। করোনা ভাইরাসের এ মহামারী থেকে জাতি দ্রুতই মুক্তি পাবে, জনগণের মাঝে ফিরে আসবে কর্মচাঞ্চল্য, ঘুরে দাঁড়াবে অর্থনীতির চাকা। জয় হোক বিশ্ববাসীর।

 

 

লেখক : ম্যানেজার (কমিউনিকেশন, পাবলিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ)

প্রধান কার্যালয়, উদ্দীপন।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads