• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৯ আশ্বিন ১৪২৭
ads
মানবিক বিপর্যয়ে সঙ্গীত হতে পারে মুক্তির হাতিয়ার

ফাইল ছবি

মুক্তমত

মানবিক বিপর্যয়ে সঙ্গীত হতে পারে মুক্তির হাতিয়ার

  • প্রকাশিত ০৭ জুন ২০২০

পৃথিবীতে মানুষ বসবাসের শুরু থেকে আজকের বিশ্ব সভ্যতা পর্যন্ত আসতে মানুষকে অগণিত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে সেগুলো যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে হয়েছে।  প্রাকৃতিক কিংবা মানুষ সৃষ্ট উভয় ধরনের সমস্যার সঙ্গে মানুষ ও পৃথিবীর সম্পর্ক প্রাচীন।  আজ করোনা নামক অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে বিশ্ববাসী যুদ্ধে নেমেছে। এ যুদ্ধ মোকাবেলা  করার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা মানুষের নেই । এর ফলে এ যুদ্ধে লাশের মিছিল যেমন দৃশ্যমান তেমনি দীর্ঘ সময়ের ব্যাপ্তিতে মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে অনেক নারী শিশু যুব ও বৃদ্ধ। ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া মহামারী ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে তেমনটাই ভাবছে বিশ্লেষকেরা এবং সেই সাথে এই প্রভাবকে নূন্যতম পর্যায়ে রাখতে নানা রকম করনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন স্নায়ুবিজ্ঞানের স্কলাররা। মেডিকেশানের পাশাপাশি  এক্ষেত্রে সংগীত হতে পারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ন হাতিয়ার।

স্নায়ুবিজ্ঞানী রবার্ট জ্যাটোর মতে,  ‘গান শুনে আপনার মস্তিষ্ক ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা আপনার গান শোনার অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত। অর্থাৎ আপনার গান শোনার অভিজ্ঞতা যত বেশি হবে, আপনার মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের কার্যকলাপ তত বেশি সংঘটিত হবে। সেই সাথে আপনিও তত বেশি মজা পাবেন গান শুনে।’

অপরদিকে নেদারল্যান্ডসের মস্তিষ্ক গবেষক এরিক স্কের্ডার তার  ‘সিঙ্গিং ইন দ্য ব্রেন' নামের গ্রন্থে  বলেছেন, ‘‘সাহিত্যে সংগীত সম্পর্কে বর্ণনায় একটি বিষয় উঠে এসেছে, যা হলো প্রত্যাশা৷ যে মুহূর্তে আপনি ভাবছেন, এটা তো খুব চেনা সুর, ঠিক সেই মুহূর্তে মস্তিষ্কের মধ্যে নিজেকে পুরস্কৃত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়৷ সেই প্রণালী আপনাকে ভাবতে শেখায় – সত্যি, এটাই তো চাই!''  ৱ

সুখে-দুঃখে সঙ্গীত আমাদের মনোরঞ্জন করে৷ সঙ্গীত তৃষিত মানবের পিপাসা মিটায় ও ব্যাধিগ্রস্থ মানুষকে সুস্থ করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।  এছাড়াও শৈশব থেকেই শরীর ও মনের অনেক ক্রিয়ার উপরেও সঙ্গীতের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছে বিজ্ঞানীরা।

চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রেও সঙ্গীতের সফল প্রয়োগ চলছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

করোনা নামক অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে বিশ্ববাসীর যুদ্ধে জয় ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।  যুদ্ধে আহত হয়ে ঘরে বন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে; মারা যাচ্ছে অনেকই। এর পাশাপাশি মানুষ ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরে থাকতে থাকতে বিকারগ্রস্থ বা মানষিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেকেই, এক্ষেত্রে সুস্থ থাকার জন্য সঙ্গীত ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সঙ্গীত রচনা করে বেশি বেশি প্রচার করা জরুরী।

আবার মানুষকে সচেতন করতে সঙ্গীত অসাধারণ ভুমিকা রাখতে পারে। নীতিনির্ধারক, জনপ্রতিনিধি, সমাজ সেবক, সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে দিনরাত মাইকে গলাফাটিয়ে যে কাজ সম্ভব হবে না বরং সেই কথাগুলো একজন শিল্পী সুর দিয়ে গাইলে মানুষ  অনেক বেশি গ্রহণ করে। কারণ মানুষ স্বভাবতই সঙ্গী প্রিয়। আমাদের উচিত হবে করোনার ভয়াবহতা, মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা, আভ্যন্তরীন ইমিউন বৃদ্ধিতে কার্যকরি খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির উপর সঙ্গীত রচনা করে গ্রামে-গঞ্জে, হাটে বাজারে প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি বয়স বিবেচনায় কিছু পুরনো লোকজ ও আধুনিক গান নজরুল গীতি রবীন্দ্র সংগীত যা শুনে জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ বড় হয়ে আজ পৌর বা প্রবীনের কাতারে অবস্থান করছেন কার্যত তারাই এ বেচে থাকার লড়াইয়ে বেশি দূর্বল তাদেরকে স্বাভাবিক সুস্থ রাখতে এ সঙ্গীত খুব বেশি প্রচারিত হওয়া দরকার।

মানুষের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার সাথে সঙ্গীতের সম্পর্ক খুব নিবিড়।  প্রয়োজনে গণমাধ্যমের সহযোগিতা নেওয়া আবশ্যক। আর নিতান্তই পিছিয়ে পড়া গ্রামে গ্রামে মানুষের সচেতনতা ফিরেয়ে আনতে তাদের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে পাড়ায় মহল্লায় রেকর্ড বাজাতে হবে তাহলে ভালো সুফল পাওয়া যেতে পারে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের দেশে কাজ যে হচ্ছে না তা ঠিক নয়, তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা নগন্য।  অনেক গুণী শিল্পীরা কিছু কিছু কাজ করছেন তবে আরও বেশি করা প্রয়োজন কেননা  অতীতেও যুদ্ধে আহত বা মানুষিক ভারসাম্যহীন, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া  মানুষকে স্বাভাবিক করতে বা তাদের স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনতে স্বভাষায় সংগীত রচনা করে তাদের উদ্দেশ্যে পরিবেশন করায় এ সকল মানুষিক বিকারগ্রস্থ মানুষকে স্বাভাবিকতায় ফিরিয়ে আনতে সংগীত বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।  

আবার যুদ্ধে আহত বা বিকারগ্রস্থ কিংবা মানুষিক রোগিকে সুস্থ করতে সংগীতের ভূমিকা নিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণা গ্রন্থে বলা হয়েছে "সংগীতকে  চিকিৎসা সাস্ত্রে কাজে লাগিয়ে  বর্তমানে বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি, মানসিকভাবে বাধাগ্রস্ত শিশু বা কিশোরের চিকিৎসা, বিষ নিরাময়, শরীরের  পেশীসমূহ শিথিল হওয়া, মানসিক দুঃচিন্তা তথা অবসাদের মত চিকিৎসায় বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ  করা হয়, যদিও স্নায়ুবিক চিকিৎসায় ব্যবহার হওয়া স্নায়ুবিক সংগীত চিকিৎসা বা Neurologic Music Theraphy  (NMT) বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানত অধিক জনপ্রিয় হৈ উঠিছে।"

আবার ভারতীয় গবেষণাপত্রে বলা হচ্ছে "ভারতীয় সংগীত চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্ৰধান রাগসমূহ ব্যবহার করা হয়। স্নায়ু পদ্ধতির সৈতে জড়িত বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন রাগ তথা লয় প্ৰয়োগ করা হয়"। 

সঙ্গীত সুদূর অতীতকাল থেকেই যুদ্ধের অনুষঙ্গ হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। বলা বাহুল্য যুদ্ধেরও সংগীত আছে। যে যুদ্ধ কারো কাছে নিছক ‘পেশাদারী দেশ্রপ্রেম’ তারও সংগীত আছে; আবার যে যুদ্ধ ন্যায় প্রতিষ্ঠার, পরিচয় বিনির্মাণের, শোষণ-বঞ্চনার শিকল ভাঙার কিংবা মুক্তির সুপ্তবাসনা বাস্তবায়নের দীর্ঘসাধনার সে যুদ্ধেরও সংগীত আছে। তাই  আমরা Irish Activist James Connolly-কে বলতে শুনি "No revolutionary movement is complete without its poetical expression....” বাঙালির মুক্তির সংগ্রামও সেই অনবদ্য কাব্যিক উপাখ্যান যেখানে সংগীত কেবল প্রেরণার অনুসঙ্গ নয় বরং ন্যায়ের যুদ্ধে এক প্রতিবাদী অস্ত্রের ঝংকার।

মার্ক্সীয় সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোন সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা সে সমাজের মৌলকাঠামো নির্মাণ করে । আর মৌলকাঠামোকে কেন্দ্র করেই বিনির্মিত হয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক ধারা। সমাজ জীবনের বাস্তবতা মানুষের চেতনাকে নির্ধারন করে আর চেতনায় উদ্ভাসিত হয় মানুষের মুক্তির প্রত্যাশা এবং সংগীতে প্রতিধ্বনীত হতে দেখি সমাজের সার্বজনীন ইচ্ছার কথা।  সেখানেও সঙ্গীতের শক্তি চুড়ান্ত সত্যের পক্ষে, মানবতার পক্ষে সমবেদনা ও সহমর্মিতা দেখাতে সক্ষয় হয়।  করোনা যুদ্ধেও সংগীতের ব্যবহারকে আলোচ্য ধারায় ভাবনার এখনই উপযুক্ত সময় আর মনে রাখা প্রয়োজন নিঃসন্দেহে সংগীত বড় হাতিয়ার হতে পারে চলমান মানবিক বিপর্যয়ে মানুষকে স্বাভাবিক সুস্থ ও সুন্দর মননে টিকিয়ে রাখতে।

অতীতে  অসাম্প্রদায়িক চেতনার  বাঙালি বিভিন্ন দুর্যোগকালে গান গেয়ে সফল হয়েছেন।  বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে আলী মহসীন রেজা'র কথায় ও খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়ার সুরে কন্ঠযোদ্ধা রথীন্দ্রনাথের গাওয়া “ছোটদের বড়দের সকলের,গরীবের নিঃস্বের ফকিরের... আমার এই দেশ সব মানুষের... “হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রীষ্টান,দেশ মাতা এক সকলের...” গানটি বিশেষ ব্যাঞ্জনা নিয়ে প্রতিভাত হয়। একইভাবে শোনা যায় গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের ‘বাংলার হিন্দু,বাংলার বৌদ্ধ’ কিংবা কার্তিক কর্মকারের‘ভাইরে ভাইরে ভাই হিন্দু  মুসলমান পরাধীনতার শৃঙ্খল আজি হয়ে যাক খান খান।

“বাঙালি মুসলামানের মানসপট ও বাঙালি সংষ্কৃতির দ্বন্দ্ব’ বিষয়ক আলোচনায় কেউ কেউ ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করলেও এটি প্রতিষ্ঠিত যে বাঙালির মূলধারার চেতনা সর্বদাই অসাম্প্রদায়িক,উদার ও ধর্মীয় গোঁড়ামী মুক্ত,যার মধ্যে বাঙালির সহজাত বাউল-ভাটিয়ালী, জারি-সারি,পল্লী গান আর বৈরাগী চেতনার পাশাপাশি গন-সংগীতের মত সংগ্রামী রূপও দেখা যায়, এ কারনেই আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আমার সোনার বাংলা” কিংবা ডিএল রায়ের “ধন ধান্য পুষ্প ভরা” গানগুনো যেমন প্রেরণাদায়ী তেমনি একইভাবে সমব্যঞ্জনায় ঝড় তুলেছে ইন্দ্রমোহন রাজবাংশী’র রচনা ও সুরে বাধা গান ‘‘কে কে যাবি আয় রে......আয় বাঙালি মুক্তিসেনা বাংলার মান বাঁচাইতে অথবা আপেল মাহমুদের কথা, সুর ও কন্ঠে গাওয়া “তীর হারা এই ঢেওয়ের সাগর পাড়ি দেবরে/আমারা ক’জন নবীন মাঝি হাল ধরেছি শক্ত করে রে। প্রতিবাদী ও যুদ্ধ জয়ের অন্যান্য গানের মধ্যে মাগো ভাবনা কেন...।

বিশ্বসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় যাঁরা জড়িয়ে আছেন করোনা যুদ্ধে  তাদেরও দায়িত্ব অনেক। চলমান ও পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে মানুষ যেন শান্তি ও সুন্দরের চর্চায় নিজেদেরকে নিবেদিত করে সে লক্ষ্যে আপনার কলম চালানো দরকার।  অর্থবোধক গান শিল্প সাহিত্য  উপন্যাস বিশুদ্ধ রম্য রচনা করে বিশ্ববাসির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। গৃহবন্দী মানুষেরা যেন বিনোদন পায় সময়টাকে শিক্ষা শিল্প সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে কাটাতে পারে ভয় আতংক যেন জয় করতে পারে নিজেকে সচেতন করতে পারে আর বিবেক কে সুন্দরের চর্চায় কাজ করাতে পারে এবং সর্বপরি একটি সুন্দর মনোজগত তৈরী করার ক্ষেত্র রচনায়  আপনারাই সবচে বেশি অবদান রাখতে পারেন এখন।  মানুষ যেন শুধুমাত্র ভয় আর আতঙ্কের  বেড়াজালে ট্রমাটাইজড না হয় সেদিকটা সতর্কতার সাথে সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা যথাযথ পালন করার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার পিপিএম

পুলিশ সুপার, গীতিকবি, প্রাবন্ধিক ও কন্ঠশিল্পী।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads