• বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

মুক্তমত

রুপা হত্যার রায় কার্যকর করুন

  • প্রকাশিত ২৬ অক্টোবর ২০২০

হাদিউল হৃদয়

 

 

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২০ খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে আমাদের দাবি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এই মুজিববর্ষে আমরা তাড়াশবাসী  আমাদের আদরের সন্তান রূপা হত্যার খুনিদের অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড রায় কার্যকর দেখতে চাই।

রূপা। জাকিয়া সুলতানা রূপা। হ্যাঁ সেই রূপা। টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে রাত্রিকালে ধর্ষণের পর  যাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আমাদের তাড়াশের সন্তান, আমার বোন। আইন বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী। আমি মনে করি বিচারহীনতা বা দায়মুক্তির সংস্কৃতি সবচেয়ে বড় কারণ। মূল্যবোধের অবক্ষয় তো আছেই। দীর্ঘদিন বিচার প্রক্রিয়ার কারণে দোষী ব্যক্তির শাস্তি নিয়ে আস্থা নেই মানুষের। পাশাপাশি ধর্ষণের এই ব্যাপকতার পেছনে ধর্মীয় মূল্যবোধ মেনে না চলা এবং অপরাধীর শাস্তি না দেওয়া বড় কারণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততাও যথেষ্ট দায়ী। আইন যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ না করা হয়, যদি ধর্ষণের শিকার নারীরা বিচার না পায়, সে ক্ষেত্রে ধর্ষণ কমবে না। এ ছাড়া রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ও ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা। ধর্ষকের কোনো দলমত বা ধর্ম থাকতে পারে না। এটা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। ধর্ষক-খুনির দণ্ড যথাসময়ে  কার্যকর করার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধীদের সুস্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। রাষ্ট্র এবং সমাজ তাদের কখনোই ক্ষমা করবে না, সে আমাদের ভাই-বন্ধু কিংবা যত  ঘনিষ্ঠ আপনজন হোক না কেন। তারা মানব সমাজে পশু হিসেবে চিহ্নিত, ঘৃণিত, নিন্দিত এবং অভিশপ্ত। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলনে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের আলোচিত ধর্ষণের সাম্প্রতিককালের  ঘটনাগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইলের চলন্ত বাসে রূপা ধর্ষণ ও হত্যা একটি লোমহর্ষক দেশব্যাপী চাঞ্চল্যকর ঘটনা। জাকিয়া সুলতানা রূপা হত্যার ৩ বছরেও মামলার রায় কার্যকর হয়নি। বিচার পায়নি তার পরিবারসহ তাড়াশবাসী। এটা বড়ই দুঃখজনক ও হতাশাজনক। বিশেষত প্রয়াত স্বনামধন্য নেতা মোহাম্মদ নাসিম ও বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ রাষ্ট্রীয় নেতারা কথা দেওয়া সত্ত্বেও এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের বিচারের রায় আজো আলোর মুখ দেখেনি।

আহ কী করুণ স্মৃতি! আমার চোখে ভেসে আসে- এই তো সেদিন আমি রূপার মুঠোফোনে ঢাকা আইন কলেজ থেকে আসা মেসেজ দেখে আপ্লুত হয়েছিলাম। ফাইনাল পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করতে হবে। পরীক্ষার পর সেও একজন আইনজীবী হতো। বেঁচে থাকলে এই সমাজের ধর্ষণের মামলায় দাঁড়িয়ে রূপাও কোর্টে বলত, মহামান্য আদালত ওই নরপশুদের সর্বোচ্চ শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছি। তার মায়ের মুখে শোনা ‘রূপা তার ভাই-বোনদের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করত। স্বপ্ন দেখত উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একদিন বড় কর্মকর্তা হবে। আজকাল অসুস্থ শরীর নিয়ে সারাক্ষণ শুয়ে থাকেন রূপার মা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও মেয়ের জন্য প্রার্থনা করে কাটে অনেকটা সময়। প্রার্থনা করেন, কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত মেয়ের বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য।

মামলার বাদী রূপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি খালাস চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেন। এরপর গত ১৯ মাসেও চাঞ্চল্যকর এ মামলায় শুনানি শুরু হয়নি। নিম্ন আদালতে দ্রুততম সময়ে মামলার রায় ঘোষণায় আমরা সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। কিন্তু উচ্চ আদালতে আসামিদের আপিলের পর মামলাটি গত ৩ বছর ধরে ঝুলে থাকায় আমরা হতাশ হয়ে পড়েছি।

তিনি আরো বলেন, ক্ষতিপূরণ হিসেবে ছোঁয়া পরিবহনের বাসটি পরিবারকে দেওয়ার যে আদেশ আদালত দিয়েছেন, তাও কার্যকর করা হয়নি। বিচারের সর্বশেষ পর্যায়ে যেতে কতদিন সময় লাগবে তা আমাদের জানা নেই। ততদিনে হয়তো বাসটি ভাঙাড়ি হিসেবে বিক্রি করতে হবে। এতে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশাও ক্ষীণ। ৩ বছর হলো অপেক্ষায় আছি, কবে দেখব আমার বোনের হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। 

উল্লেখ, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে রাত্রিকালে রূপাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে দেয়। পরে মধুপুর থানা পুলিশ রূপার লাশ উদ্ধার করে। এ নিয়ে তখন সারা দেশে চাঞ্চল্যকর ঘটনা হিসেবে আলোড়ন জাগে। পরিচয় না পেয়ে ২৬ আগস্ট ময়নাতদন্ত শেষে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। এরপর ২৭ আগস্ট নিহতের বড় ভাই হাফিজুর রহমান মধুপুর থানায় রক্তাক্ত লাশের ছবি শনাক্ত করেন যে অজ্ঞাত যুবতী তার ছোট বোন ও ঢাকা আইডিয়াল ল’ কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপার। ৩১ আগস্ট রূপার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঐদিন রাতেই সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামের কবরস্থানে রূপার লাশ দাফন করা হয়। নিহত রূপা ওই গ্রামের মৃত জেলহাজ প্রামাণিকের মেয়ে।

ঘটনার জেরে টাঈাইল জেলা আদালতে রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ৪ পরিবহন শ্রমিক দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত তাদের ফাঁসি ও রূপার পরিবারকে বাসটি দিয়ে দেবার রায় প্রদান করেন। এরপর মামলার আসামিরা এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলে সেই থেকে এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন তারিখ ধার্য না হওয়ায় মামলাটি অদ্যাবধি হাইকোর্টে ঝুলে আছে। এখন আমাদের একটাই দাবি, দ্রুত বিচার সম্পন্ন হোক, রায় বাস্তবায়ন হোক, আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করা হোক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী ঐতিহাসিক মৃত্যুদণ্ড বিধান রূপা ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের ক্ষেত্রেও অবিলম্বে প্রয়োগ করে তাড়াশবাসী তথা দেশবাসীকে এই অমানবিক দায়বদ্ধতা থেকে কলঙ্কমুক্ত করা হবে- সেটাই  আমাদের একান্ত কাম্য। 

 

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads