• বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২ ফাল্গুন ১৪২৭
হোয়াইট হাউজে উষ্ণ অভিনন্দন জো বাইডেনকে

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

তারুণ্য ভাবনা

হোয়াইট হাউজে উষ্ণ অভিনন্দন জো বাইডেনকে

  • প্রকাশিত ২৫ নভেম্বর ২০২০

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রবীণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করার মাধ্যমে মার্কিন সিংহাসনের চালিকাশক্তিতে অধিষ্ঠিত হবেন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চার বছরের রিপাবলিকান দলের শাসনকার্য অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আগামী দিনে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শত শত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে জো বাইডেনকে। আস্থার প্রতিদান দিতে হবে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে। অপরদিকে, রিপাবলিকান দলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান ও পতনের গল্প ব্যর্থতা-সাফল্য মিলেই উল্লেখ থাকবে মার্কিন ইতিহাসের পাতায়।

প্রথমে উষ্ণ অভিনন্দন হোয়াইট হাউজের নবনির্বাচিত বাসিন্দা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রতীক্ষিত ও ঘটনাবহুল গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে মার্কিন ইতিহাসে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিজ্ঞ ও রাজনীতিতে সমৃদ্ধ জো বাইডেনকে নির্বাচিত করে শক্তিশালী দেশটির জনগণ। মোট ৫৩৮টি ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন পেয়েছেন সর্বশেষ তথ্যমতে ৩০৬টি। অপরদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন সর্বশেষ তথ্যমতে ২৩২টি। কার্যত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য কমপক্ষে ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় জয়লাভ করেছে ডেমোক্র্যাট শিবির। উল্লেখ্য, মার্কিন ইতিহাসে ১৯৬৪ সালে প্রথম ইলেকটোরাল কলেজ ভোট প্রবর্তন হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০টি অঙ্গরাজ্যে জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসসহ বহুবিধ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির কারণে এবারের মার্কিন নির্বাচন ছিল যে কোনো বারের তুলনায় দেশটির জনগণের কাছে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রকে নিজ কক্ষপথে ফেরার নির্বাচন। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজয় বরণ করলেন? অপরদিকে, হোয়াইট হাউজে প্রবেশের চাবিকাঠি নিশ্চিত করার পেছনে প্রবীণ রাজনীতিবিদ জো বাইডেনের মূলমন্ত্র কী? এসবের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য একটু পেছনের দিকে লক্ষ্য করা যাক। প্রথমত, বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস অর্থাৎ কোভিড-১৯ প্রতিরোধে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণহানির সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজারের অধিক। এমনকি নির্বাচনি প্রচারণার সময় তিনি নিজেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হোন। এত ব্যাপক সংখ্যক মার্কিনির প্রাণহানি খুব সহজভাবে মেনে নেয়নি দেশটির জনগণ, যা নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন মার্কিন বিশ্লেষকরা। তিনি বরাবরই করোনাভাইরাস নিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তমূলক তথ্য প্রচার করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একে চীনা ভাইরাস হিসেবে উল্লেখ করে চীনকে একঘরে করে রেখে দেশটির জনগণের সমর্থন আদায়ের কৌশলে ব্যর্থ হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয়ত, ঘরোয়া অর্থাৎ নিজ দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতায় থাকাকালে বিভিন্ন ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি মার্কিন ইতিহাসে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসনের মুখোমুখির স্বীকার হন। এ নির্বাচনের ফলে মার্কিনিরা প্রমাণ করলেন যে, ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন হওয়া কোনো প্রেসিডেন্টকে তারা নিজ দেশ তথা বিশ্বের ক্ষমতাশীল নেতা হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি নয়। তৃতীয়ত, ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক সামাজিকভিত্তিক গবেষণায় দেখা যায়, তার শাসনকালে সামাজিক, জাতিগত ও রাজনীতিতে বিভেদ বেড়েছে কয়েকগুণ। এমনকি ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান শিবিরে রাজনীতি বিদ্বেষ, আস্থা ও পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসের অভাব পরিলক্ষিত হয়, যা এর আগে এত বেশি আস্থার সংকট দেখা যায় নি। ফলে নিজ দেশে অভ্যন্তরে বেড়েছে সহিংসতার হার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। যার সর্বশেষ জ্বলন্ত উদাহরণ-নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে সহিংসতায় বহু সমর্থক আহত ও চারজনের অধিক প্রাণহানি। কার্যত, বিশ্বের গণতন্ত্রের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি যুক্তরাষ্ট্রে এমন সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ আগামীতে বিশ্বনেতৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের পুরনো সমস্যা নতুন করে উগড়ে পড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদে। গত ২৫ মে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডে উত্তাল দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বকে। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নিজ দেশে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ উভয় বর্ণের মানুষ কঠোর প্রতিবাদ করে। যেখানে তিনি বর্ণবাদ নিরসনে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। এমনকি কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারটিকে কোনো সান্ত্বনার ভাষা জানাননি। নির্বাচনে তার ফল সুস্পষ্ট বিদ্যমান।

জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জো বাইডেনকে ৮৭% কৃষ্ণাঙ্গ সমর্থন দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। পঞ্চমত, শুরু থেকেই মুসলিম বিদ্বেষের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গোটা মুসলিম সমাজ থেকে সমর্থনবঞ্চিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মহাদেশে মুসলিম বিদ্বেষ চরম আকারে বাড়তে থাকে ২০০১ সালে তথাকথিত ওসামা বিন লাদেনের সংগঠন আল-কায়দা কর্তৃক টুইন-টাওয়ারে হামলায় ২ হাজারের অধিক সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির পর থেকে। এতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় টুইন টাওয়ার। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জঙ্গিবাদ নিধনের নামে মুসলিম দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। যে দুঃখ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে মুসলমানরা। উল্লেখ্য, মার্কিন ইতিহাসে টুইন টাওয়ারে হামলা আজো রহস্যজনক। ষষ্ঠত, এবারের নির্বাচনি প্রচারণায় রিপাবলিকান শিবির ছিল বেশ আক্রমণাত্মক ও দৃষ্টিকটু। এমনকি নির্বাচনের আগেই ট্রাম্প উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা দেন, ফল বিপক্ষে গেলে আদালতের  শরণাপন্ন হবেন। এমন ঘোষণা মার্কিন নির্বাচনি প্রচারণার ইতিহাসে বিরল নেতিবাচক ঘটনা। যদিও তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে সুবিধা করতে পারেননি।

মার্কিন নির্বাচনি বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে নির্বাচনি জালিয়াতি, কারচুপি ও প্রতারণার অভিযোগ জনমনে একধরনের অবিশ্বাস ও সন্দেহের সৃষ্টি করবে-যা আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। যদিও তার সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে দাবি করেন নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফরেন পলিসির ক্ষেত্রে সাফল্য ছিল ঈর্ষান্বিত। যদিও তিনি প্যারিস জলবায়ু ও ইরানের বহুল প্রতীক্ষিত পরমাণু চুক্তির মতো অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বাতিল করে বিতর্কের জন্ম দেন। এর ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনকালে নতুন করে কোনো মানবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েননি; বরং দীর্ঘ দুই দশকের আফগান যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে তালেবানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা কমিয়ে আলোচনার টেবিলে বসেন। উল্লেখ্য, চীন ও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব বেড়েছে কয়েকগুণ। সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি মধ্যপ্রাচ্য থেকে পর্যায়ক্রমে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ছিল ওই এলাকার জনগণের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস। বিশ্ব থেকে আইএসের মতো জঙ্গি সংগঠনের সন্ত্রাসবাদ দমনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফলতা ছিল অভূতপূর্ব। মূলত নিজ দেশে অভ্যন্তরীণ ইস্যু ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার দরুন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে মার্কিন বুদ্ধিজীবী সমাজ। অপরদিকে, বিশ্ব মহামারী কোভিড-১৯ প্রতিরোধ, বর্ণবাদের অবসান, জাতিগত বিদ্বেষ রোধ, অসাম্প্রদায়িক ও ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র গড়ার পক্ষে রায় দিল দেশটির জনগণ।

বলতে সংকোচ নেই, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রিপাবলিকান শিবিরে অনভিজ্ঞ রাজনীতি ও ধনকুবের ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান ছিল চমকপ্রদ ঘটনা। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট দলের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একজন অভিজ্ঞ ও ঝানু রাজনীতিবিদ। তিনি নির্বাচনি প্রচারণায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ব্যর্থতা, বেকারত্বের লাঘব টানা, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দুর্বল ও বর্ণবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর ব্যর্থতার দিকগুলো জনগণের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। ১৯৪২ সালে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করা জো বাইডেন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পথচলায় নানান ধরনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ তিনি বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। ১৯৭৩ সালে থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৫ বছর সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামার শাসনকালে ৪৭তম ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। এবারের মার্কিন নির্বাচনে বেশকিছু রেকর্ড হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আগাম ভোটের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৭ কোটি ৩০ লাখের অধিক পপুলার ভোট পেয়েছেন জো বাইডেন। সেন্টার ফর রেসপনসিভ পলিটিকসের তথ্যমতে, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের নির্বাচনি ব্যয় হয়েছে ৬৬০ কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক মহামারী করোনার সংকটকালে খুবই ব্যয়বহুল। ইতোমধ্যে জো বাইডেন আনুষ্ঠানিক জয় নিশ্চিত হওয়ার পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। বর্ণনা করেন এ জয় মার্কিন জনগণের জয়, গণতন্ত্রকে সুসংহত করার জয়। রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার করেন। ২০২১ সালে ২০ জানুয়ারি নিয়ম অনুযায়ী ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।

লেখক: মো. রাশেদ  আহমেদ

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads