• মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮

কোমর ব্যথা : চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

ছবি : সংগৃহীত

স্বাস্থ্য

কোমর ব্যথা : চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম

  • প্রকাশিত ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

মিসেস মাহেরা, বয়স ৪১ বছর। এসেছিলেন আমার কাছে তার কোমর ব্যথার চিকিৎসার জন্য। তিনি ২০১৪ সালের মার্চ  থেকে কোমর ব্যথায় ভুগছেন। ব্যথা হলে মাঝে মাঝে বিভিন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। কখনো একটু ভালো থাকেন আবার কখনো ব্যথা বেড়ে যায়। এভাবে পার হয়েছে জীবনের বেশ কিছুদিন। এখন আর বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না কিন্তু বেশিক্ষণ হাঁটতে পারেন। আমি যখন তাকে রোগের ইতিহাসের কথা জিজ্ঞেস করছিলাম, একপর্যায়ে তিনি কেঁদেই ফেললেন। কারণ বেশিক্ষণ বসে আমার সঙ্গে রোগের বর্ণনা করতে পারছেন না। এমআরআই এবং এক্স-রে রিপোর্টে বলা হয়েছে কোনো অসুস্থতা নেই। কিন্তু তার ফিজিক্যাল পরীক্ষা করে দেখা গেল চিৎ হয়ে শুয়ে দুই হাঁটু বুকের দিকে টানলে ব্যথা পায়। কোমরের নিচের দিকে এল৪-৫এস-১ লেভেল-এ চাপ দিলে ব্যথা অনুভূত হয়। তার কোমরের লংগিসিমাস, স্পাইনালিস মাসেল-লাম্বার রিজিয়নে ব্যথা এবং টেনডার। পেটের নিচের মাসেল দুর্বল ও চাপ দিলে ব্যথা পায়। এই মাংসগুলো আমাদের শরীরের পেছনের দিকে মাজায় বা কোমরে, পেট, লোয়ার লাম্বার ও ফিমারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। রোগীর ওই মাংসগুলোর শক্তি কমে গেছে এবং লাম্বার রিজিয়নের এল৪-৫ এস১ লেভেল-এ লিগামেন্ট ইনজুরি আছে। সে কারণে বসা অবস্থায় অনেক ব্যথা হয়।

উপরোক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বলতে পারি যে চিকিৎসা শুরুর আগেই সঠিক অ্যাসেসমেন্ট অত্যন্ত জরুরি, যা কিনা সঠিক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন। কোমরের অসুস্থতা বের করার জন্য এক ধরনের অ্যাসেসমেন্ট আছে, যা কোমর ব্যথার বিভিন্ন কষ্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নির্ণয় করা যায়। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরা মনে করেন, এই অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী উপরোক্ত রোগীর জন্য সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা করালে তার রোগের উপশম হবে। তারপর মিসেস মাহেরাকে ফিজিওথেরাপির চিকিৎসার অন্যতম মোডালিটিস, লো-লেভেল লেজার এবং আলট্রা সাউন্ড দিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। সেই সঙ্গে ওয়াক্সপ্যাক দিয়ে সুন্দর করে ব্যাক রিজিয়নে বা কোমরের অংশে স্ট্রোকিং করতে হবে। তারপর মনোযোগ সহকারে সময় নিয়ে সফট টিস্যু মোবালাইজেশন করতে হবে। এরপর উপুড় করে শুইয়ে বুকের নিচে একটি বালিশ দিয়ে কোমরের ডিপ-কোর মাসেলের অন্যতম মাসেল মাল্টিফিডাস এবং চিৎ হয়ে শুয়ে টেনেসভার্সাস অ্যাবডোমিনিসের চিকিৎসা করতে হবে। সাধারণত তিনটি ধাপে মাল্টিফিডাস ও টেনেসভার্সাস অ্যাবডোমিনিসকে শক্তিশালী ও স্ট্যাবিলাইজ করতে হবে। ঠিক সে নিয়মেই বিভিন্ন ভঙ্গিতে ওই মাংসগুলোর শক্তি বাড়ানোর চিকিৎসা করতে হবে। তারপর কোমরের সুপার ফিসিয়াল গ্রুপের তিনটি মাংসের শক্তি বাড়াতে হবে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, যে লিগামেন্ট এবং মাসেল অসুস্থ হয়েছে, যে মাসেলগুলোর লেংথ (লম্বা হওয়া) কমে গেছে এবং শক্তি কমে গেছে, ওই মাসেলগুলোর লেংথ বাড়ানোর এবং শক্তি বাড়ানোর ফার্মাকোলজিক্যাল বা প্রেসক্রিপশন মেডিকেশন নাই বললেই চলে। সুতরাং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার মাধ্যমেই শুধু লম্বা বাড়ানো যেতে পারে এবং দুর্বল মাংসকে শক্তিশালী করতে পারে। তারপর লাম্বার রিজিয়নের মায়োফেসিয়াল রিলিজ করতে হবে। ওই টিস্যুগুলোর এভাবে চিকিৎসা করলে তার কোমরের কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে। এ চিকিৎসার জন্য তাকে অনেক সময় দিতে হবে। অল্প সময় চিকিৎসা করে, চিকিৎসা বন্ধ করলে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সেক্ষেত্রে কোমর ব্যথা পুনরায় হতে পারে।

খাদ্যতালিকায় একটু পরিবর্তন আনতে হবে, যেমন- প্রচুর পানি বা জুস, চেরি ফল দিনে ৬টি, দুধ বা দুগ্ধ জাতীয় খাবার, ১/৪ চা চামচের আদার রস নিয়মিত, সালমন মাছ, হেরিং মাছ ও সার্ডিন মাছ এবং এক চিমটি কালজিরা কাঁচা পেঁপের সঙ্গে খেতে হবে। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক কাপ গরম পানি খাবেন, সেই সঙ্গে প্রতিদিন গড়ে একটানা ৮ ঘণ্টা ঘুমালে এই রোগ থেকে আরো দ্রুত আরোগ্য হওয়া যায়। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, আমরা যারা উপরোক্ত কষ্টে (কোমর ব্যথায়) ভুগছি তারা যেন অতি শিগগির সঠিক চিকিৎসা নেন। কেননা দেরিতে চিকিৎসা নিলে কষ্ট আরো বেড়ে যেতে পারে, কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেক বেশি সময় লাগতে পারে, অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা হতে পারে, জীবনের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং অনেক আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

কোমর ব্যথার চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করা অবশ্যই ভালো। সেজন্য সামনে ঝুঁকে ও ডানে-বাঁয়ে বাঁকা হয়ে কাজ করার সময় বেশি সতর্ক থাকবেন এবং পেটের মাংস শক্ত করে কাজ করবেন। দৈনিন্দন জীবনে কাজ-কর্ম এবং চলাফেরায় সঠিক ভঙ্গি মেনে চলবেন। একই অবস্থায় বেশিক্ষণ কাজ করবেন না। মাংসের ট্রিগার পয়েন্ট রিলিফ করতে হবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলবেন। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক বিছানায় সঠিক নিয়মে ঘুমাবেন। ধকল বা কঠিন চাপমুক্ত থাকুন- বি রিলাক্স। কোমরের মাংসের নিয়মিত স্ট্রেসিং ও স্ট্রেন্দেনিং করুন। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী এক্সারসাইজ করুন। ধূমপান বর্জন করুন।

ফিজিওথেরাপি বিজ্ঞানী এবং নন-সার্জিকেল সলিউশন ফর দ্যা স্পাইনের বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো এমন ওষুধ তৈরি হয়নি যে ওষুধ খেলে আপনার মাংসপেশি লম্বা হবে, শক্তিশালী হবে এবং আপনার জয়েন্ট মবিলিটি বেড়ে যাবে। তবে ফিজিওথেরাপি বা এক্সারসাইজ- ইজ এ মেডিসিন যা আপনাকে ওই কষ্টগুলো থেকে মুক্তি দেবে। সুতরাং সম্পূর্ণ চিকিৎসা পেতে হলে আপনাকে সঠিক মোবালাইজেশন, মেনুপুলেশন, স্ট্রেসিং এবং স্ট্রেন্দেনিংয়ের মতো চিকিৎসা করতেই হবে।

 

প্রফেসর আলতাফ হোসেন সরকার

ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ, লেজার ফিজিওথেরাপি সেন্টার

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads