• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
স্ট্রিট ফুড স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

ছবি : সংগৃহীত

স্বাস্থ্য

স্ট্রিট ফুড স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

  • প্রকাশিত ২০ ডিসেম্বর ২০১৮

পথ চলতে ক্ষুধা নিবৃত্ত করা এবং দাম কম অথচ মুখরোচক— এসব মিলে রাস্তার খাবার বা স্ট্রিট ফুড সবার কাছেই আকর্ষণীয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব মানুষ খেলেও সবার স্বাস্থ্যের জন্যই নানা ঝুঁকি তৈরি করে এসব রাস্তার খাবার। এক পর্যবেক্ষণ বলছে, রাস্তায় বিক্রি করা খাবার খেয়ে প্রতি বছর দেশে প্রায় ৩ কোটি মানুষ নানান রোগে আক্রান্ত হয়। চিকেন ফ্রাই, নুডলস, বার্গার, ফ্রাইড রাইসের মতো বিলাসবহুল দোকানের লোভনীয় খাবারের পসরা সাজিয়ে রাস্তায় সাজিয়ে বসেন অনেক বিক্রেতা। আর দৃষ্টিনন্দন এসব খাবারে আকৃষ্ট হয়ে খাচ্ছেন ভোক্তারাও। তবে কোথায়, কীভাবে তৈরি হয় এসব খাবার, তার খোঁজ কেউ রাখে না। আবার অনেকে নিরুপায় হয়ে এসব খায়। তৈরির উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে নোংরা পরিবেশে বানানো হচ্ছে, রাস্তায় বিক্র করা এসব খাবার। কোনো সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা রাখা তো দূরের কথা ভাবনায়ই নেই এসব বিষয়।

বিশ্বব্যাপী মানুষ অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে মোটা ও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো দেশের সরকার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য অস্বাস্থ্যকর খাবার ও জাঙ্কফুড নিষিদ্ধ করতে বলেছে। আবার কোনো কোনো দেশের সরকার শিশু-কিশোরদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নীতিমালা তৈরি করেছে। দেখা যাচ্ছে, স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের ওজন বাড়ার প্রবণতা বাড়ছে। ছাত্রছাত্রীরা স্কুল ক্যাফেটেরিয়া থেকে অস্বাস্থ্যকর খাবার কিনে খাচ্ছে এবং এতে তারা মুটিয়ে যাচ্ছে, যা পিতামাতা ও অভিভাবকদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ পিতামাতা ও স্কুল ক্যাফেটেরিয়াগুলোর কাছে পানি, দুধ, ফলের রসের মতো পানীয় এবং পুষ্টিকর স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তৈরি, পরিবেশন ও বিক্রির জন্য বিস্তৃত নির্দেশনাবলি পাঠাচ্ছে।

রাস্তায় তৈরি ও পরিবেশিত খাবারকে স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার বলা হয়। এসব খাবার বিদেশেও স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার হিসেবে পরিচিত। উন্নত দেশের স্ট্রিট ফুড স্বাস্থ্যসম্মত, উপাদেয় ও আকর্ষণীয় হয়। বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে রাস্তায় যেসব খাবার তৈরি ও বিক্রি হয় তা বিশুদ্ধ, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। খেতে উপাদেয় বা মুখরোচক হলেও এসব স্ট্রিট ফুড অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত ও পরিবেশিত হয় বলে বিভিন্ন জটিল-মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। খোলা আকাশের নিচে তথা উন্মুক্ত অবস্থায় তৈরি ও বিক্রি করা খাবার পোকামাকড় ও মাছি দ্বারা দূষিত হয়। বাতাসে ভাসমান ধুলা-ময়লাও এতে পড়ে। সাধারণত সস্তা, তৈলাক্ত ও ঝাল হওয়ার কারণে রাস্তার খাবারের বেশ কদর রয়েছে। এ ধরনের খাবার খেলে মানুষ যেসব রোগে আক্রান্ত হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ, আলসার, হূদরোগ ইত্যাদি। সস্তা, সহজলভ্যতা, মানসম্পন্ন ও মুখরোচক খাবার হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্ট্রিট ফুড (রাস্তার খাবার) বেশ জনপ্রিয়। পরিচ্ছন্ন ও ভেজালমুক্ত এ খাবারের প্রতি পর্যটকদের রয়েছে ভিন্ন ধরনের আকর্ষণ। কিন্তু বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুডের কোনো মান নেই বললেই চলে। একে তো ভেজাল তার ওপর অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি এসব খাবারে আড়াইশ’র বেশি ব্যাকটেরিয়া, প্যারাসাইড, টক্সিন, মেটাল থাকে। যার ফলে থেমে থেমে জ্বর, পেট খারাপ, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানান ধরনের রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। এছাড়া হূদরোগ, কিডনি সমস্যাসহ ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগেও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা জানান।  বিশেষজ্ঞদের মতে, রাস্তায় তৈরি এসব খাবার স্বাস্থ্যকর করতে দোকানি ও সাধারণ মানুষকে যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি এসব খাবারের মান নিশ্চিতে নজরদাড়ি থাকার আয়োজনও লাগবে।

দেশে প্রায় ১৩০ পদের রাস্তার খাবার পাওয়া যায়। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে শিঙ্গাড়া, সমুচা, ছোলা ভাজি, বেগুনি, আলুর চপ, ডালপুরি, ফুচকা, চটপটি, বেলপুরি, পাকুড়া, হালিম, ঝালমুড়ি, জিলাপি, লেবুর শরবত, আখের রস ইত্যাদি। এছাড়াও বাড়তি খাবার হিসেবে থাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলু সেদ্ধ, সুপ, পোড়া পেঁয়াজ ও মরিচ, সালাদ, নুডলস ও হরেকরকম মিষ্টান্ন। রাস্তার খাবারের পুষ্টিগুণ থাকে অতি সামান্য এবং শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব থাকে অতি বেশি। এসব খাবারের মূল খরিদ্দার হলো রিকশাচালক, টোকাই, ছিন্নমূল মানুষ, হকার, ছোট ব্যবসায়ী, শিশু, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শ্রমিক, গরিব ও অশিক্ষিত নিন্ম আয়ের মানুষ, যাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা নেই। শিশুরাও এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খায় এবং প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক সময় মা-বাবারাও তাদের সন্তানদের এসব খাবার কিনে দেন। বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর আচার ও অজানা-অচেনা ব্র্যান্ডের আইসক্রিম শিশুদের অতি প্রিয়। এসব খাবার শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। মা-বাবাদের প্রতি অনুরোধ, ঘরের বাইরে তৈরি অস্বাস্থ্যকর খাবার খাইয়ে আপনাদের শিশুদের জীবন বিপন্ন করবেন না। শিশুরা অবুঝ বলে হয়তো অস্বাস্থ্যকর খাবার পছন্দ করে ও খায়। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে নিশ্চিন্তে-নির্দ্বিধায় এসব খাবার প্রতিনিয়ত খেয়ে চলেছে, তা আমার বুঝতে কষ্ট হয়। অনেক ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, সস্তা ও উপাদেয় বলে তারা এসব রেডিমেড খাবার খায়। সস্তায় নাস্তার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার কারণেও তাদের রাস্তার খাবার খেতে হয়। কথা হল, সস্তায় খাবার খেতে গিয়ে স্বাস্থ্যহানি হলে তখন বিপদ সামলাবে কে? প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, একটু চিন্তা করো আর একটু স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াও। তাহলে জীবন হবে সুন্দর, বিপদমুক্ত।

রাস্তায় খাবার তৈরি হয় মূলত আটা, ময়দা, বেসন, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি ও তেল দিয়ে। দিনের পর দিন একই তেল ব্যবহার করা হয় বলে তা পুড়ে যায় এবং এই তেল হূদরোগ সৃষ্টি করে। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন কাপড়-চোপড় পরে ময়লা ও জীবাণুযুক্ত হাতে রাস্তার খাবার তৈরি করা হয় বলে এসব খাবার খাওয়া ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তার খাবার তৈরিতে প্রায়ই ব্যবহার করা হয় দূষিত পানি। খাওয়ার পানিও বিশুদ্ধ থাকে না। ফিল্টার করা পানি ব্যবহার করা হয় না বলে পানিতে ই. কোলাই ও প্রোটিয়াস বেসিলাসজাতীয় জীবাণু থাকে। যেসব থালা-বাসন বা পাত্রে খাবার পরিবেশিত হয়, সেগুলোতে প্রায়ই ক্ষতিকর জীবাণু থাকে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস, স্ট্যাফাইলোকক্কাস অ্যাপেডারমিডিস ও সালমোনেলা প্রজাতির জীবাণু। রাস্তায় তৈরি বিভিন্ন ফলের রসে থাকে অসংখ্য জীবাণু। যেসব যন্ত্রপাতি বা আনুষঙ্গিক সামগ্রী দিয়ে ফলের রস তৈরি করা হয় এবং যেসব গ্লাস বা পাত্রে তা পরিবেশিত হয়, সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ময়লা ও জীবাণুতে ভর্তি থাকে। ময়লা-দুর্গন্ধময় পানি দিয়ে বারবার একই গ­াস ধোয়া হয়। তবে কোনো কোনো খাবার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি ও বিক্রি হয়, যার সংখ্যা অতি নগণ্য। রাস্তায় তৈরি খাবারে অনেক সময় নিষিদ্ধ উপকরণ ও রঙ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন শহরে তৈরি খাবারে মেটানিল ইয়েলো, কমলা রঙ ২, রোডামিন বি, অরোমিন অরেঞ্জ জি-জাতীয় নিষিদ্ধ রঙের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। খাবারকে আকর্ষণীয় করার জন্য অনেক বিক্রেতা বস্ত্রশিল্পে ব্যবহূত ক্ষতিকর রঙ পর্যন্ত ব্যবহার করে থাকে। রাস্তায় তৈরি কোমল পানীয়তে অনেক সময় আলকাতরার রঙও ব্যবহূত হয়। এসব খাবারে আরো থাকে তামা, লৌহ ও সিসার মতো ভারী ধাতু যা শরীরের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

শীতকাল এলে রাস্তায় তৈরি খাবারের ধরন পাল্টে যায়। শীতকালে উপরে উল্লেখিত খাবার ছাড়াও তৈরি ও বিক্রি হয় হরেকরকম পিঠা। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ভাপা পিঠা, পোয়া পিঠা এবং চিতল পিঠা। চিতই পিঠার সঙ্গে থাকে নানারকম ঝাল চাটনি, গাঢ় আখের রস বা গুড়। খেতে সুস্বাদু হলেও এসব খাবার তৈরি হয় নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। যারা পিঠা তৈরি ও পরিবেশন করে, তাদের পরিধেয় কাপড়-চোপড় এবং হাত থাকে অপরিচ্ছন্ন। যে হাতে তারা টাকা লেনদেন করে, সেই একই হাত দিয়ে তারা পিঠা তৈরি ও পরিবেশন করে। এতে পিঠা জীবাণু দ্বারা দূষিত হয়ে পড়ে। অনেক দরিদ্র মহিলা ফুটপাতে বসে আটার রুটি তৈরি করে সাধারণ তরিতরকারি বা গুড়সহ তা স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে। অনেকে আবার বাসাবাড়ি থেকে ভাত রান্না করে এনে সাধারণ তরিতরকারিসহ বিক্রি করে টুপাইস উপার্জন করে। এসব খাবারের মূল খরিদ্দার হলো রিকশাচালক, ছিন্নমূল ও স্বল্প আয়ের মানুষ।

মানুষ, বিশেষ করে শিশু-কিশোররা নানা কারণে জাঙ্কফুডের প্রতি অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। জাঙ্কফুড খেতে বেশ সুস্বাদু। অল্পবয়সী তরুণ-তরুণীরা রেডিমেড খাবারেই বেশি অভ্যস্ত। পশ্চিমা বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাফেটেরিয়াগুলোতে জাঙ্কফুডের কোনো স্থান নেই। ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন করা হয়। ফাস্টফুডের জনপ্রিয়তার পেছনে বিজ্ঞাপনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মুটিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসমস্যা মোকাবেলায় ২০০৩ সালে ১১৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়। প্রতি বছর অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসারে মারা যায় ৫ লাখ মানুষ। অতিমাত্রায় চর্বিসমৃদ্ধ খাবার খেয়ে প্রতি বছর মারা যায় ৫ লাখ মানুষ।

সুষম স্বাস্থ্যকর খাবার আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে বিশেষ অবদান রাখে। পরিমিত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা, আমিষ, লিপিড, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, বিশুদ্ধ পানীয়, আঁঁশজাতীয় খাবার স্বাস্থ্যকর খাবারের অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখিত খাবারের মধ্যে শাকসবজি-ফলমূলের আধিক্য থাকা বাঞ্ছনীয়। শাকসবজি-ফলমূল হলো ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, খনিজ পদার্থ এবং আঁঁশজাতীয় দ্রব্যের অফুরন্ত ভান্ডার। আমাদের দেশের শিশু-কিশোররা শুধু মাংস এবং তেল-চর্বিজাতীয় খাবার খেতে চায়। ফলমূল, শাকসবজির প্রতি তাদের প্রচণ্ড অনীহা। এ প্রবণতা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। শাকসবজি-ফলমূল, আঁশসমৃদ্ধ সুষম খাবার শরীরের ওজন, হূদরোগ, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টরেল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাই শিশুকাল থেকেই ছেলেমেয়েদের শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে। না হলে পরবর্তী জীবনে তাদের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে হতে পারে।

 

মুনীরউদ্দিন আহমদ

অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

drmuniruddin@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads