• বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ৪ মাঘ ১৪২৪
হেলা নয়, প্রয়োজন সূর্যকিরণ

ছবি : সংগৃহীত

স্বাস্থ্য

হেলা নয়, প্রয়োজন সূর্যকিরণ

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জনই ভিটামিন ডি’র ঘাটতিতে আছেন। শরীরে ভিটামিন ডি শোষণের জন্য দৈনিক অন্তত কিছুক্ষণ রোদে থাকা দরকার। সূর্যের আলো আমাদের দেহের ছোটখাটো অনেক জীবাণু ধ্বংস করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে আধাঘণ্টা এবং ২টার পর আধাঘণ্টা শরীরে রোদ লাগানো অত্যাবশ্যক। কমপক্ষে ২০ মিনিট ত্বকে রোদ লাগানো জরুরি।

শীত মৌসুম ছাড়া শরীরের রোদ তাপানো অভ্যাস আমাদের খুব একটা নেই। বরং অনেকে মনে করেন রোদে না পোড়াই ভালো। প্রশ্ন হলো রোদ কি শুধুই পোড়ায়! সূর্যের আলো, বাতাস, পানি এবং খেলাধুলা হলো মানবজাতির সুস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। রোদ আমাদের শরীরের জন্য কতটা উপকারী, আসুন সে সম্পর্কে জেনে নিই। ভিটামিন ডি ঘাটতির কারণ হলো শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাব। বাইরে সূর্যোলোকে বের না হওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোদে তাপ নেই। তারা রোদের উত্তাপ নিতে ছুটে যান এক দেশ থেকে আরেক দেশে। চীন ও জাপানে ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনই ভুগছেন ভিটামিন ডি’র অভাবজনিত নানা রোগে। অথচ আমাদের দেশে সূর্যের উত্তাপ থাকা সত্ত্বেও আমরা এ নিয়ে উদাসীন। বিদেশিরা এজন্য সমুদ্র বা নদীর তীরে সূর্যস্নান করে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রায় ১৫টি দেশ থেকে শীতকালীন সময়ে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সূর্যের আলোর ওপর গবেষণার মাধ্যমে ১৭৭টি দেশের মানুষের রক্তরসে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ নির্ণয় করার চেষ্টা চালায়। গবেষণার মাধ্যমে তারা প্রমাণ পায়, নিম্ন মাত্রার ভিটামিন ডি’র সঙ্গে স্তন ক্যান্সার ও কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক আছে। তাদের মতে, যদি রক্তরসে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তাহলে ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। ডায়েট, বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, শরীর চর্চার পাশাপাশি দিনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকলে দেহ যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরির সুযোগ পায়, যা মানবদেহের জন্য অনেক উপকারী।

আমাদের দেশে গাঁয়ের মানুষ হাটে-মাঠে-ঘাটে কাজ করে। তাই তারা খুব কমই ভিটামিন ডি অভাবজনিত রোগে ভোগে। প্রাকৃতিকভাবে সূর্যের আলো আমাদের শরীরের জন্য কতভাবে প্রয়োজনীয় আসুন জেনে নেই। সকালের রোদ মিষ্টি। সকাল ৮টার আগে রোদ শরীরের ক্ষতি করে না। কারণ এই সময় রোদে আলট্রাভায়োলেট রে বা অতিবেগুনি রশ্মি থাকে না। তাই এ সময় আপনি উপভোগ করতে পারেন উপকারী রোদের আলো। সূর্যের আলোতে যে ভিটামিন ডি আছে যা আমরা প্রাকৃতিকভাবে পেতে পারি। ভিটামিন ডি নানারকম হাড়ের রোগ, অস্টি অপোরোসিস এবং সাধারণ ফ্লু এর ঝুঁকি কমায়।  চীনের বিখ্যাত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হোং চাও কুয়াং বলেছেন, সূর্যালোক শরীরে ক্যানসার প্রতিরোধ করে। কারণ আমাদের ত্বক শুধু সূর্যালোকের উষ্ণতা থেকে ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে। ভিটামিন ডি রক্তনালীতে ক্যানসারের উপাদান নির্মূল করে বলেই, নানা ধরনের ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে। গবেষণা থেকে জানা যায়, ক্যানসার প্রতিরোধে অন্য কোনো পুষ্টিকর উপাদান ভিটামিন ডি’র চেয়ে বেশি কার্যকর নয়

সূর্যের আলো আমাদের শরীরের সার্কডিয়ান রিদম ঠিক রাখে। সহজ ও তৃপ্তিকর ঘুমের জন্য রোদ অনেক উপকারি। সূর্যের আলোর কারণে আমাদের শরীরে বেটা-এন্ড্রফিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। যার কারণে আমাদের মন-মেজাজ থাকে ফুরফুরে ও প্রফুল্ল। আপনি জেনে অবাক হবেন, সূর্যের আলো ব্রণ তৈরির জন্য দায়ী ব্যাক্টেরিয়া ধ্বংস করে। সূর্যের আলো আমাদের দেহের ছোটখাটো অনেক জীবাণুকে ধ্বংস করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সূর্যের আলো মানবদেহের উচ্চ রক্তচাপ কমায়। এর কো.কিউ-১০ মানব দেহের সেলুলোজ ও হার্ট শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। নবজাত শিশুদের সকালে রোদে রাখতে দেখা যায়। এর কারণ সূর্যের আলোতে যে ভিটামিন ডি আছে, তা শিশুর হাড়ে ক্যালসিয়াম পরিপূর্ণ করে হাড়ের গঠন ও উচ্চতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

সকালের হালকা মিষ্টি রোদ শরীরে সুখময় উত্তাপ আনে। মন চাঙ্গা হয়, শরীরের অবসাদ দূর হয়। আমরা রোদ পাই সূর্যকিরণ থেকে। শরীরের ত্বক সূর্যালোক থেকে এ ভিটামিন সংগ্রহ করে। আর কিছু ভিটামিন ডি আসে খাদ্য থেকে। আমাদের শহুরে ব্যস্ত জীবনে অফিসে বা ঘরে বসে কাজ করা অথবা শুয়ে-বসে থাকার কারণে ভিটামিন ডি এর অভাব দেখা দেয়। যদিও নারীরাই ভিটামিন ডি ঘাটতির বেশি শিকার।  কারণ তারা বেশিরভাগ সময় বদ্ধঘরে সময় কাটায়। তবে আমাদের কর্মজীবনে পুরুষদেরও এখন একই অবস্থা। অফিসে কিংবা বাড়িতে অনেকটা বদ্ধ ঘরেই জীবন কাটে আমাদের।  বলা হয়ে থাকে দৈনিক একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য ৩০ থেকে ১০০ ইউনিট ভিটামিন ডি প্রয়োজন। এক জরিপে দেখা যায়, আমাদের দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ভিটামিন ডি-এর অভাবজনিত কারণে ভুগছে। ১৫ শতাংশ ব্যক্তি অপর্যাপ্ত ভিটামিন ডি’র ঘাটতিতে ভুগছে। বাংলাদেশে প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে ৭ জনই ভিটামিন ডি’র ঘাটতিতে আছেন। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বেশি থাকেন, গাড়িতে চড়েন, রোদে যান না, সানস্ক্রিম মাখেন তাদেরই ভিটামিন ডি’র ঘাটতি বেশি দেখা যায়।

যারা সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকেন, তাদের অস্থি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি বেশি। জেনে রাখুন, সূর্যের আলো মাত্র ২০ মিনিটে রক্তের কনিকা থেকে নাইট্রিক এসিড নিঃসৃত করতে পারে যা স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং রক্ত জমাট বাঁধা দূর করে। ভিটামিন ডি’র উচ্চতর মাত্রা লিভার ডি-টোক্সিফিকেশন সিস্টেমকে ত্বরান্বিত করে। সূর্যের আলো স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করে। চিকিৎসকের মতে, দ্রুত চিকিৎসা না নিলে শিশুদের রিকেট রোগ হয়ে পা ধনুকের মতো বেঁকে যাবে। মাথার খুলি হবে বড়। বড়দের অস্টিও ম্যালেসিয়া রোগ হয়। ধীরে ধীরে পা দুর্বল হয়ে পড়ে ভেঙ্গে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডও বেঁকে যায়। তাই ভিটামিন ডি’র স্বল্পতা ও ঘাটতি থেকে রক্ষা পেতে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত থাকা রোদে কমপক্ষে আধাঘণ্টা থাকার পরামর্শ চিকিৎসকের।

ভিটামিন ডি-কে বলা হয় সূর্যকিরণ থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন। শারীরিক সঠিক কর্মকাণ্ডের জন্য ভিটামিন ডি অপরিহার্য। শরীরে ভিটামিন ডি শোষণের জন্য দৈনিক অন্তত কিছুক্ষণ রোদে থাকা দরকার। সারা শরীরের ত্বকে রোদ লাগানো দরকার। এজন্য প্রাতঃভ্রমণ উপকারী। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে আধাঘণ্টা এবং ২টার পর আধাঘণ্টা শরীরে রোদ লাগানো অত্যাবশ্যক। কমপক্ষে ২০ মিনিট ত্বকে রোদ লাগানো জরুরি। বিনা ব্যয়ে এ সময় আমরা ভিটামিন ডি পেতে পারি। মহিলারা মনে করেন, সূর্যালোক ত্বকের জন্য ক্ষতিকারক। এ ধারণা ভিটামিন ডি ঘাটতি বাড়ায়। সাধারণত ভিটামিন ডি প্রাণিজ খাদ্যেই বেশি পাওয়া যায়। তৈলাক্ত মাছ, যেমন কড বা হাঙর মাছের যকৃতের তেল এবং অন্যান্য প্রাণীর যকৃতেও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। এ ছাড়া দুধ, ডিমের কুসুম, মাখন ও চর্বিযুক্ত খাদ্যে ভিটামিন ডি থাকে। যেসব প্রাণী মাঠে চরে বেড়ায় এবং প্রচুর সূর্যালোক পায়, ওইসব প্রাণীর দুধ, ডিম ও যকৃতে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ বেশি থাকে। তার তুলনায় মায়ের বুকের দুধে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ কম থাকে।

এমনিতে ভিটামিন ডি’র অভাবের লক্ষণ খুব সহজে প্রকাশ পায় না। তবে ক্লান্তি-বিষণ্নতা-কপালে ঘাম, হাড়ে ব্যথা, হাড় নরম, ভেঙে যাওয়া, রোগ প্রতিরোধে অক্ষমতা, উচ্চ রক্তচাপ, ত্বক লালচে, বুড়িয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যাসহ ঘন ঘন ইনফেকশন ভিটামিন ডি’র অভাবেও হয়ে থাকে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হোং চাও কুয়াংয়ের মতে, ভিন্ন ভিন্ন বয়সের মানুষের রোদ পোহানোর পদ্ধতি ভিন্ন। ছোট বাচ্চারা প্রতিদিন সকালে বা সন্ধ্যায় একবার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট রোদ পোহাতে পারে। ভিন্ন ঋতুতে রোদ স্নানের সময়ও ভিন্ন  হবে- যেমন বসন্তকালে ও শরৎ্কালে সকাল ৯টার থেকে ১১টার মধ্যে, গ্রীষ্মকালে সকাল ৯টার আগে ভালো। তরূণ বা যুবকরা ১ বা ২ ঘন্টা সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এবং বিকেলে ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত গায়ে রেরাদ মাখলে ভালো। বৃদ্ধ বা বয়স্করা প্রতিদিন ৩০ মিনিট সকাল ১০টার আগে এবং বিকেল ৪টা পর দুবার করে রোদ পোহালে ভালো।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads