• সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
হূদরোগের বিকল্প চিকিৎসা

হূদরোগের বিকল্প চিকিৎসা

প্রতীকী ছবি

স্বাস্থ্য

হূদরোগের বিকল্প চিকিৎসা

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

একসময় ডায়রিয়া বা কলেরার মতো সংক্রামক রোগে বেশি মানুষ মারা যেত। এখন হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। জানা গেছে, বর্তমান বিশ্বে প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে হূদরোগ। প্রতি বছর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ মানুষ মারা যায়।

বর্তমান বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৪৫ ভাগ ঘটছে এই রোগের কারণে। যখনই কেউ হূদরোগে আক্রান্ত হয়, ডাক্তার তাকে দ্রুত রিং পরানোর পরামর্শ দেন বা বাইপাস করার কথা বলেন। রিং পরে বা বাইপাস করে কেউ কেউ সুস্থতা ফিরে পায়। এ ছাড়া দেখা যাচ্ছে কেউ রিং বা বাইপাস করলেও কিছুদিন পর তার আবার ব্লক হচ্ছে বা হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছে। তাহলে এর থেকে মুক্তির কি কোনো উপায় নেই? এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস ছাড়া কি হূদরোগ নিরাময় সম্ভব? এমন হীনমন্যতায় ভুগে থাকেন অনেক হূদরোগী।

এনজিওপ্লাস্টি, বাইপাস বা কাটাছেঁড়া ছাড়াও বর্তমানে হূদরোগের মতো প্রাণঘাতী রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। প্রতিদিন কোনো না কোনো মানুষ হূদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। করোনারি আর্টারি ব্লক হয়ে মানুষ ছুটে যান ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার রিং বা বাইপাস করে সুস্থ করতে চান। রোগী এর মাধ্যমে সুস্থ হচ্ছেন আবার অনেক ক্ষেত্রে কিছুদিন পরই আবার অসুস্থ হচ্ছেন বা নতুন ব্লক নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতায় অস্ত্রোপচার ছাড়া হূদরোগের বিকল্প চিকিৎসার প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে।

 

ডা. অরনিশের ওষুধ ও অস্ত্রোপচার ছাড়া চিকিৎসা 

ওষুধ ও অস্ত্রোপচার ছাড়াই হূদরোগের নিরাময় লাভ করার পদ্ধতির প্রবর্তক ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানী ডা. ডিন অরনিশ। ১৯৮৭ সালে এই পদ্ধতি প্রবর্তনের পর থেকে এর সফলতা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। জীবনযাপন পরিবর্তনই হচ্ছে এ পদ্ধতির মূল ভিত্তি। ওষুধ ছাড়াই হূদরোগ চিকিৎসা ডা. অরনিশের সাফল্যের কথা বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে ১৯৮৮ সালে। জানা যায়, করোনারি আর্টারি রোগী অথচ বাইপাস সার্জারি করতে রাজি ছিলেন না এমন রোগীকে তিনি দু’ভাগে ভাগ করে চিকিৎসা শুরু করলেন। প্রথম গ্রুপের রোগীদের কম ফ্যাট ও বেশি আঁশযুক্ত খাবার, স্ট্রেসমুক্ত থাকার পদ্ধতি, প্রাণায়াম যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন করার উপদেশ দেওয়া হলো। দ্বিতীয় দলের রোগীদের হূদরোগের সচরাচর ওষুধ দেওয়া হলো। দু’গ্রুপের লোকজনকেই বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হলো। রোগের অবস্থা আবার আগাগোড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলো কিছুদিন পরপর। পাওয়া গেল অদ্ভুত ফল। ডা. অরনিশের কার্যসূচি যারা অনুসরণ করেছিলেন, তাদের ধমনীতে জমে থাকা চর্বি বা কোলেস্টেরল পরিষ্কার হয়ে রক্ত চলাচল বেড়ে যাওয়ায় তারা ভীতিকর বুকব্যথা থেকে মুক্তি পান এবং তাদের হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমে আসে। অন্যদিকে দ্বিতীয় দলের রোগীরা আগের অবস্থায়ই থেকে গেল অর্থাৎ তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না। বরং কারো কারো ক্ষেত্রে আগের তুলনায় আরো খারাপ হলো।

 

আমেরিকার গবেষণা

মেডিকেল কলেজ অব জর্জিয়ার ফিজিওলজিস্ট ডা. বার্নেস ১১১ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এক গবেষণা চালান। এদের মধ্যে ৫৭ জনকে মেডিটেশন করানো হয়, বাকিদের শুধু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যাদি শেখানো হয়। আট মাস পর দেখা যায় প্রথম গ্রুপের সদস্যদের রক্তবাহী নালির সংকোচন-সম্প্রসারণ ক্ষমতা বেড়েছে ২১ শতাংশ যা হূৎপিণ্ডের সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কারণ এনডোথিলিয়াম নামের রক্তনালির আবরণের এই অসুবিধা থেকেই অল্পবয়সে একজন মানুষের শরীরে শুরু হয় হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। অন্যদিকে দ্বিতীয় গ্রুপের এ ক্ষমতা কমেছে ৪ শতাংশ। বয়স বাড়লে হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও প্রথম গ্রুপের ক্ষেত্রে কমেছে। ডা. বার্নেস বলেন, লিপিড কমানোর ওষুধ ব্যবহার করে যে ফল আগে পাওয়া যেত, তা-ই পাওয়া যাচ্ছে মেডিটেশনে। ২০০৭ সালে আমেরিকান সাইকোসোমাটিক সোসাইটির বার্ষিক কনফারেন্সে এ রিপোর্টটি পেশ করা হয়।

 

ভারতের গবেষণা 

ভারতের রাজস্থানের মাউন্ট আবুতে অবস্থিত গ্লোবান হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে ডা. সতীশ গোপ্তার নেতৃত্বে করোনারি আর্টারি ডিজিস রিগ্রেশনের এক গবেষণা করা হয়। এতে ভারতের অন্যতম হূদরোগ বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন। তারা ১ হাজার ২০০ রোগীর ওপর গবেষণা চালিয়ে যান। ৭ দিন পর থেকেই রোগীরা অনেকটা সুস্থবোধ করতে থাকেন এবং তাদের ওষুধ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। স্ট্রেস হরমোন লেভেল কমে যায়, সেই সঙ্গে কমে ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা ও কোলেস্টেরল। বেড়েছে ইটিটি, ইজেকশন ফোর্স ও ট্রেডমিল টেস্টের ক্ষমতা। তারা ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে এই গবেষণার রিপোর্ট পেশ করেন। তাতে দেখা যায়, প্রায় সব রোগীরই উন্নতি হয়েছে এবং সুস্থতা ফিরে পেয়েছে। যারা এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন— প্রফেসর অনিল কুমার, ভাইস প্রেসিডেন্ট, এশিয়া প্যাসিফিক সোসাইটি অব কার্ডিওলজি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট, ইন্ডিয়ান কার্ডিওলজি সোসাইটি, ডা. এইচ কে চোপড়া (দিল্লি), সেক্রেটারি, কার্ডিওলোজি সোসাইটি অব ইন্ডিয়া, ডা. নরেশ তেহবান, এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, এসকট হার্ট ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারসহ অনেক কার্ডিওলজিস্ট ও অন্য বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন।

 

মেডিটেশনে হূদরোগ নিরাময়

আমরা মেডিটেশনের মাধ্যমে হূদরোগ নিরাময় এবং প্রতিরোধ করে থাকি। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে হূদরোগ পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব। আমাদের এখানে দু’ধরনের লোক আসেন। যাদের এখনো হূদরোগ হয়নি, তারা আসেন প্রতিরোধের জন্য। আর যারা হূদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন তারা আসেন আরোগ্যের জন্য। এখানে এসে এ পর্যন্ত অসংখ্য লোক ট্রিটমেন্ট নিয়ে সুস্থ আছেন। আমরা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে মেডিটেশন ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের  মাধ্যমে এই চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আমাদের এখানে একজন রোগীর শতভাগ ব্লক হওয়ার পরও গত ২৪ বছরে তাকে কোনো ডাক্তার বা অপারেশনে যেতে হয়নি। এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। যার ফলে প্রতিনিয়ত আমাদের এখানে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা হূদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বা হূদরোগ প্রতিরোধ করতে চান, তাদের জন্য প্রতি মাসে ‘হূদরোগ নিরাময় ও প্রতিরোধ কার্যক্রম’ নামে দুদিনের একটি ওরিয়েন্টেশন কোর্স আছে। এই কোর্সের মাধ্যমে একজন রোগীকে হার্ট সম্পর্কে, জীবনাচার সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞান দেওয়া হয়। খাদ্যাভ্যাসের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর সপ্তাহের প্রতি সোমবার বিকাল ৫টা থেকে ৭টায় সবাইকে নিয়ে নিরাময় প্রোগ্রাম হয়।

রিং বা বাইপাস ছাড়া হূদরোগ নিরাময় সম্ভব। বর্তমানে অসংখ্য রোগী আমাদের কাছে আসছেন এবং অনেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছেন রিং বা বাইপাস ছাড়া। হূদরোগ কেন হচ্ছে এটা আগে আমাদের জানা দরকার। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫৩ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যে এখন মৃত্যুর একমাত্র কারণ হূদরোগ। আমেরিকার মতো দেশে প্রতি বছর ছয় লাখ মানুষ হূদরোগে মারা যাচ্ছে। হূদরোগের মূল কারণ হলো ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টি ও অবৈজ্ঞানিক জীবনাচার। অতৃপ্তি, অশান্তি, অস্থিরতা এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, তৈলাক্ত, চর্বিযুক্ত খাবার, ফাস্ট ফুড, ফল বা শাকসবজি কম খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা, মেদ, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল ইত্যাদি হচ্ছে হূদরোগের প্রধান কারণ।  

— ডা. মনিরুজ্জামান, কো-অর্ডিনেটর, কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাব, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন

 

দশ বছরে ৩০ হাজারের অধিক হূদরোগীকে সুস্থ করেছি

চিকিৎসা পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমরা সেই চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হয়েছি। ৩০ হাজারের বেশি হার্টের রোগীকে আমরা সাওল পদ্ধতিতে গত ১০ বছরে সুস্থ রেখেছি। বিনা তেলে খাবারের ‘অয়েল ফ্রি কিচেন ও ক্যাফে’ প্রতিষ্ঠা করে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু খাবারের হোম ডেলিভারি এবং ক্যাটারিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া হার্ট, ইয়োগা, ডায়েটের ফ্রি সেমিনার আয়োজন করে এবং  খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে সুস্থ রাখার সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। হূদরোগ চিকিৎসায় প্রচলিত পদ্ধতির রিং পরানো কিংবা বাইপাস সার্জারি কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নয়। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণ পরিবর্তনই হূদরোগের স্থায়ী চিকিৎসা। জীবনঘাতী হূদরোগ ও তার সহযোগী ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে জীবনাচরণ পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।

— কবি মোহন রায়হান, সাওল বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা

 

হূদরোগে অস্ত্রোপচারমুক্ত সাওল চিকিৎসার পটভূমি

বিনা অপারেশনে এবং রিং ছাড়া হূদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ সাওল হার্ট সেন্টার বাংলাদেশ সম্প্রতি সফলতার ১০ বছর উদযাপন করেছে। বাংলাদেশে বিনা অপারেশনে হূদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ সাওল হার্ট সেন্টার (বিডি) লিমিটেড, উপমহাদেশের বিশিষ্ট হূদরোগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বিমল ছাজেড়-এমডি প্রতিষ্ঠিত ভারতের সাওল হার্ট সেন্টারের ১৯তম শাখা। ২০০৯-এর ১০ ডিসেম্বর ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেন রোডে প্রতিষ্ঠিত হয় সাওল হার্ট সেন্টার। যেখানে রয়েছে বিনা অপারেশনে হার্টের বাইপাসের অত্যাধুনিক মেশিন, হার্ট ব্লকেজ ক্লিনিং পদ্ধতি, রোগ নির্ণয়ের ডিজিটাল মেশিন সমন্বিত ল্যাবরেটরি, স্বাস্থ্যবান্ধব অয়েল ফ্রি ক্যাফেটরিয়া, সুস্বাস্থ্যের জন্য ইয়োগা ও মেডিটেশনসহ আধুনিক ফিটনেস সেন্টার, খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগ, দূরের রোগীদের জন্য পরিচ্ছন্ন গেস্ট হাউস। এ প্রসঙ্গে সাওল চিকিৎসায় সুস্থতা অর্জনকারী হূদরোগী সাংবাদিক আবদুস সাত্তারের অভিজ্ঞতা হূদরোগীদের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমি সাওল হার্ট সেন্টার থেকে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে সুস্থ আছি। হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমি মৃত্যুপথযাত্রী ছিলাম। সেখান থেকে আমাকে সাওল হার্ট সেন্টারের চিকিৎসায় সুস্থ করে তোলা হয়। বর্তমানে আমি সাওল চিকিৎসা গ্রহণ করছি। বিনা তেলের রান্না করা খাবার খাই। জীবন-যাপনে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে ভালো থাকার চেষ্টা করছি। আমি মনে করি, হূদরোগীরা রিং বা বাইপাসের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া ছাড়াই নিয়ম মেনে সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন করতে পারেন।

দুই হাজার আট সালের গোড়ার ঘটনা। কবি মোহন রায়হান ভারতে যান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। এক অবসরে শরীরের রুটিন চেকআপ করেন কলকাতার বাইপাস অ্যাপোলোতে। হাই কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড পাওয়া গেল আর ট্রেডমিল টেস্টে পজিটিভ ধরা পড়ল। সেখানকার হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রবিন চক্রবর্তী এনজিওগ্রাম করতে বললেন। তার ধারণা, হার্টে ব্লকেজ আছে। খরচ বাংলাদেশের টাকায় বেশ। তবু রাজি হলেন মোহন রায়হান। হার্ট বলে কথা! পরদিন সকালে এনজিওগ্রাম করার কাগজপত্র নিয়ে ডাক্তারকে দেখিয়ে চেম্বার থেকে বের হয়েছেন। মনটা খারাপ। হাসপাতালের করিডোর ধরে হাঁটছেন। হঠাৎ চোখ পড়ে পাশের বুকস্টলে। তিনি এগিয়ে যান। অনেক বইয়ের ভেতর থেকে তুলে নেন একটি বই- ‘হূদরোগ থেকে মুক্তি, পাঁচটি সহজ পদক্ষেপ’। লেখক উপমহাদেশের প্রখ্যাত হার্টকেয়ার ও লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞ ডা. বিমল ছাজেড়-এমডি। ভারতে হার্টের নন-ইনভেসিভ চিকিৎসাপদ্ধতির অন্যতম অগ্রদূত। মোহন বইটি কিনে নিয়ে সারা রাতে পড়ে শেষ করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন অ্যাপোলোতে যাবেন না। এনজিওগ্রাম, রিং কিংবা বাইপাস করাবেন না। কারণ মোহনের মুক্তিযোদ্ধা বড়ভাই উপমহাদেশের বিখ্যাত বাইপাস সার্জন দেবী শেঠীর কাছে অপারেশন করার দুই বছরের মধ্যে মারা গেছেন। দেশে ফিরে এলেন তিনি। তিন মাস পর আবার গিয়ে ডা. বিমল ছাজেড়ের সঙ্গে দেখা করলেন। তার পরামর্শে যোগ দিলেন কলকাতায় সাওল হার্ট ক্যাম্পে। আর সেখানেই তিনি খোঁজ পান বিনা অপারেশনে বিনা রিংয়ে হার্টের ব্লকেজ নিরাময়ের ফলপ্রসূ চিকিৎসাপদ্ধতি ঝঅঅঙখ- ঝপরবহপব অহফ অৎঃ ড়ভ খরারহম। আর পেছনে না তাকিয়ে নিজে সাওল চিকিৎসাপদ্ধতিতে সুস্থ হয়েছেন। পরে সেই চিকিৎসাপদ্ধতি লাখ লাখ হূদরোগীর কল্যাণে বাংলাদেশে শুরু করেছেন। শুরুতে কেবল হূদরোগ মুক্তির জনসচেতনতা বৃদ্ধির সেমিনার ও কর্মশালা। পরবর্তী সময়ে হার্টের ব্লকেজ চিকিৎসাসেবা দিতে সাওল হার্ট সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়।

সাওলের তেলবিহীন রান্না : ভালো খাবার মানেই আমরা বুঝি তেল-মশলার দারুণ ভারী খাবার। এসব খাবার খাওয়ার সময় মুখে দারুণ স্বাদ লাগলেও পরে শুরু হয় শরীরের নানান সমস্যা। শুধু তা-ই নয়, এসব তেল-মশলার খাবারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও পড়ে মানুষের শরীরে। অস্বাস্থ্যকর তেল-মশলার খাবারের কারণে বেড়ে যায়  ওজন, আক্রান্ত হয় কিডনি, লিভার ও হার্ট। এ ধরনের সমস্যা থেকে মানুষকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখতে রাজধানীর ইস্কাটনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাওল হার্ট সেন্টার। সেখানকার ওয়েল ফ্রি কিচেনে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তৈরি হয় হার্ট, লিভার, কিডনি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অতি ওজন, গ্যাস্ট্রিক, ক্যানসার, থাইরয়েড, হেপাটাইটিস, বাত, ডেঙ্গু, টিবি আক্রান্ত রোগীদের জন্য। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি তাদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার হোম ডেলিভারিও দিচ্ছে।

 

নন-ইনভেসিভ কার্ডিওলজির প্রবর্তক

উপমহাদেশে নন-ইনভেসিভ কার্ডিওলজির প্রবর্তক ডা. বিমল ছাজেড়। প্রতিকারমূলক কার্ডিওলজির একজন শিক্ষকও তিনি। অপারেশন বা কাটাছেঁড়া হূদরোগ চিকিৎসাপদ্ধতির বিপরীতে জীবনপদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘাতক হূদরোগ থেকে মুক্তির রক্তপাতহীন সহজ পথের দিশারী। তিনি ২৫ বছর বয়সে নয়াদিল্লির ডা. রাম মনোহর লেহিয়া হাসপাতালের হূদরোগ বিভাগে (ঈধৎফরড়ষড়মু উবঢ়ধৎঃসবহঃ) কাজ শুরু করেন। সেখানে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা তার জীবনটা পরিবর্তন করে দেয় এবং হূদরোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারে তার ধ্যান-ধারণা নতুন মোড় নেয়। পরবর্তীকালে লাখনৌ কিং জর্জ মেডিকেল কলেজ থেকে হূদরোগের চিকিৎসার ওপর এমডি ডিগ্রি সম্পূর্ণ করেন এবং সেখানে অপারেশন ছাড়া হূদরোগীদের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করেন। এমডি করার পর বিখ্যাত নিখিল ভারত চিকিৎসাবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে সিনিয়র রেসিডেন্ট ও সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ৬ বছর কাজ করেন।  যোগব্যায়াম চিকিৎসাপদ্ধতির ওপরও প্রশিক্ষণ নেন। অওওগঝ-এ তার গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, হূদরোগীরা করোনারি হার্ট ডিজিজকে শুধু প্রতিরোধই করে না; বরং হূদরোগ সারিয়ে তোলে অথবা তা থেকে নীরোগ অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। আমেরিকার ঘড়হ-ওহাধংরাব ঈধৎফরড়ষড়মু-এর অগ্রদূত ডা. ডিন অরনিশের কাছে প্রশিক্ষণকালেও ডা. ছাজেড় প্রমাণ করেন, জীবনযাপন পদ্ধতির মাধ্যমে হূদরোগ থেকে আগের নীরোগ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ডা. বিমল ছাজেড় লাখো রোগীর চিকিৎসা করেছেন এবং হার্ট অ্যাটাক, বাইপাস সার্জারি ও এনজিওপ্লাস্টি থেকে মুক্ত থাকার জন্য রোগীদের সাহায্য করেছেন। প্রতিকারমূলক কার্ডিওলজিকে আরো সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে এবং ইনভেসিভ কার্ডিওলজির ব্যাপক ব্যবহারের বিরুদ্ধে ডা. ছাজেড় দুটি নন-ইনভেসিভ চিকিৎসা চালু করেছেন। এগুলো হলো ন্যাচারাল বাইপাস এবং বায়োকেমিক্যাল এনজিওপ্লাস্টি। উভয়ই খুব কার্যকর, যুগোপযোগী, স্বল্পব্যয়ী, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত। যার সঙ্গে রয়েছে লাইফস্টাইল প্রোগ্রাম বা জীবন-যাপন কর্মসূচি। তাই ঝঅঅঙখ করোনারি হূদরোগ বা হার্টের ব্লকেজের একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পদ্ধতি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads