• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫
ads
নিজের অজান্তেই ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস

সংগৃহীত ছবি

স্বাস্থ্য

২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস

নিজের অজান্তেই ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২৫ জুলাই ২০১৯

২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। আমেরিকান চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্যামুয়েল ব্লুমবার্গ ১৯৭৬ সালে সর্বপ্রথম অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের শরীরে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করেন এবং একই সঙ্গে এই রোগের প্রতিষেধক উদ্ভাবন করে নোবেল পুরস্কার পান। তার জন্মদিন ২৮ জুলাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর এই দিনকে ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস সংক্রমণকে এক নীরব ঘাতক হিসেবে  দেখা হচ্ছে। সাধারণত লিভার বা যকৃতে রহভষধসসধঃরড়হ বা প্রদাহ হলে তাকে হেপাটাইটিস বলা হয়। হেপাটাইটিস দুই ধরনের হয়- ধপঁঃব বা তাৎক্ষণিক এবং পযৎড়হরপ বা দীর্ঘমেয়াদি । ক্রনিক হেপাটাইটিসে লিভারের স্থায়ী পরিবর্তন হয়ে যায়। এটা থেকে পরবর্তীতে ক্যান্সার কিংবা লিভার সিরোসিস-এর মতো জটিল রোগ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে প্রায় এক কাটি মানুষ আক্রান্ত। বেসরকারি হিসেবে হেপাটাইটিসে প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। হেপাটাইটিস নিয়ে উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে সারা বিশ্বে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে সংক্রমিত দশজনের মধ্যে নয় জনই জানেন না যে শরীরে এই ভাইরাস তারা বহন করছে। হেপাটাইটিস সংক্রমণ বাংলাদেশে জনসাধারণের মধ্যে জন্ডিস রোগ হিসেবে পরিচিত। জন্ডিসকে আমরা অনেকেই রোগ মনে করি। কিন্তু আসলে জন্ডিস কোনো রোগ নয়। বরং এটি রোগের লক্ষণ। জন্ডিস হলে ত্বক, চোখ অথবা মিউকাস মেমব্রেন হলুদাভ হয়ে যায়। জন্ডিসের অন্যতম প্রধান একটি কারণ হচ্ছে ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস বা লিভারের প্রদাহ।

প্রকৃত অর্থে হেপাটাইটিস হলো ভাইরাসজনিত লিভারের  রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ৫ ধরনের হেপাটাইটিস রয়েছে।  হেপাটাইটিস এ এবং ই স্বল্পমেয়াদি লিভার  রোগ। এটি বিশ্রাম নিলে একপর্যায়ে সেরে ওঠে। তবে প্রাণঘাতী হচ্ছে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের সংক্রমণ। হেপাটাইটিস বি-এর উপসর্গ হলো জ্বর, দুর্বলতা, অবসাদ, বমি ভাব বা বমি হওয়া।  ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিশ্বে যত মানুষের লিভার ক্যানসার হয় তার ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী হচ্ছে এই হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস। পৃথিবীতে গড়ে প্রতিদিন ৪ হাজার মানুষ লিভার রোগে মারা যায়।’

চিকিৎসকদের মতে, হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে আক্রান্তদের তিন শতাংশ মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়। আর হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস ছড়ায় মূলত রক্ত এবং মানবদেহের তরল পদার্থের মাধ্যমে। আমাদের দেশে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে রক্তে হেপাটাইটিস পরীক্ষায় এইচভিসি ভাইরাল মার্কার বা এইচভিসি টোটাল- এই টেস্টগুলো করার ব্যবস্থা নেই। এগুলো ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যায় না যে রক্তে ভাইরাস আছে কি নেই। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী  বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টার্গেট অনুযায়ী লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ কাজ করছে। হেপাটাইটিস রোগ নিয়ে সরকার অত্যন্ত সচেতন। এ রোগের ক্ষেত্রে সরকারের কর্মপরিকল্পনা আছে। শিশুসহ সবাইকে বিনা পয়সায় হেপাটাইটিসের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এ  রোগে আক্রান্তরা অনেক ক্ষেত্রেই সুচিকিৎসা পান না। জানা গেছে, বাংলাদেশে হেপাটাইটিসে আক্রান্তদের একটা বড় অংশ ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া, ডাব পড়া নেওয়ার মতো কবিরাজি চিকিৎসার দ্বারস্থ হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম এই ভাইরাস সম্পর্কে বলেছেন, এই রোগ প্রাণঘাতী রোগ যা নির্মূল করতে চাইলে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের কোনো বিকল্প কোনো কিছু নেই। বি ও সি ভাইরাস রক্তে সংক্রমণের পর ২  থেকে ৬ মাস একটা উইন্ডো পিরিয়ড থাকে। এ সময়ে সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় এ ভাইরাস ধরা পড়ে না। এ সময় কেউ যদি রক্ত আদান-প্রদান করেন তাহলে অগোচরেই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। এটি নিরূপণে ডিএনএ ভাইরাল মার্কার বা এইচভিসি টোটাল  টেস্ট প্রয়োজন হয়।

ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মীরজাদী  সেব্রিনা ফ্লোরা এক বিবৃতিতে বলেছেন, হেপাটাইটিসের যে ৫ রকম ভাইরাস আছে তার সবগুলোর সংক্রমণই বাংলাদেশে আছে।  তবে ই ভাইরাসেই সবচেয়ে বেশি মানুষ ভোগে। তার মতে, আমাদের দেশে যদি কোনো প্রাদুর্ভাব  দেখা দেয় সেটা মূলত ই ভাইরাসের আউট  ব্রেক হয়। কারণ এটা ছড়ায় বেশি। হেপাটাইটিস ই ভাইরাস মূলত পানির মাধ্যমে ছড়ায়।

হেপাটাইটিস বাংলাদেশে নীরব ঘাতকের ভূমিকায়। হেপাটাইটিস বি এবং সি অনেকটা এইডসের মতো। এটা নীরবে একজন থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াচ্ছে, যা আমরা সহসা টের পাচ্ছি না। এই ভাইরাস যেসব মাধ্যমে ছড়াচ্ছে- সেলুনে শেভ করার ক্ষুর থেকে, সিরিঞ্জের মাধ্যমে ড্রাগস গ্রহণের ফলে, ট্যাটু করার মাধ্যমে, নাক-কান ফুটানোর মাধ্যমে, রক্ত পরিসঞ্চালন, যৌন মিলনের মাধ্যমে।  হেপাটাইটিস বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ-

-নবজাতক শিশুকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে বার্থ ডোজ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এ টিকা দিতে বাংলাদেশে শিশু জন্মের ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে এটাই চিন্তার বিষয় । 

-যেহেতু রক্তের মাধ্যমে এটি সবচেয়ে বেশি ছড়ায় তাই নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা জরুরি। হতাশার বিষয় হলো বাংলাদেশে রক্তদানের আগে যে পরীক্ষা করা হয় সেখানে সবসময় হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস ধরা পড়ে না।

বাংলাদেশে ২০০৩ সাল থেকে ইপিআই (ঊচও) শিডিউল অনুযায়ী নবজাতকের ৬ থেকে ১৪ সপ্তাহ বয়সের মধ্যে  হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিন সরকারিভাবে বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আর যাদের জন্ম এর আগে হয়েছে তারা যদি  হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন তাহলে  টিকাদান কেন্দ্র থেকে ভ্যাক্সিনটি দিয়ে নিতে পারেন।

জীবাণুবাহিত হেপাটাইটিস

হেপাটাইটিস যখন কোনো জীবাণু বা ভাইরাসের সংক্রমণে হয়, তখন একে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলা হয়। এ  রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুস্থ হলেও অনেক ক্ষেত্রে এর চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না। সাধারণত হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই এই পাঁচটি জীবাণুর মাধ্যমে এই রোগ হয়ে থাকে। তবে আরো কিছু অজানা জীবাণু রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমেও এই ভাইরাল হেপাটাইটিস হতে পারে। হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস সবচেয়ে বেশি গুরুতর। কারণ এই ভাইরাসের মাধ্যমে আক্রান্ত রোগীর খারাপ দিকে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। 

হেপাটাইটিস ভ্যাকসিন

হেপাটাইটিস হলো লিভারের ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ। এটি যেমন ভাইরাস দিয়ে হতে পারে, তেমনি অন্যান্য সংক্রামক জীবাণু, অ্যালকোহল এমনকি রাসায়নিক পদার্থ থেকেও হতে পারে। হেপাটাইটিস সৃষ্টিকারী ভাইরাস প্রধানত পাঁচ ধরনের- এ, বি, সি, ডি ও ই। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো এ ও বি ভাইরাস। নাম দুটো কাছাকাছি হলেও এদের সংক্রমণের ধরন, ছড়ানোর ধরন এবং  রোগের তীব্রতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দুই প্রকারের ভাইরাসের বিরুদ্ধেই ভ্যাক্সিন রয়েছে।

হেপাটাইটিস-এ ভ্যাকসিন : এই ভাইরাসটি মূলত খাবার বা পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। হেপাটাইটিস এ আক্রান্ত ব্যক্তির বর্জ্য খাদ্য ও পানীয় জলকে কোনোভাবে দূষিত করলে এটি হতে পারে। এছাড়াও কখনো কখনো জীবাণুযুক্ত সুঁই বা রক্তের মাধ্যমেও ছড়ায়। এই রোগের ভ্যাক্সিনটি ইনজেকশনের মাধ্যমে হাতের ওপরের অংশে ডেলটয়েড মাংসপেশিতে দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ শিশুদের ১২-২৩ মাস বয়সের মধ্যে দেওয়া উচিত। এর ৬ থেকে ১৮ মাস পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে।

হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন : এই রোগটি সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে রক্ত নেওয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস বি  রোগীর সঙ্গে অরক্ষিত শারীরিক সম্পর্ক এবং আক্রান্ত মায়ের  থেকে শিশুতেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহূত সুঁই, রেজর বা টুথব্রাশ এমনকি ডায়ালাইসিস যন্ত্রের মাধ্যমেও ছড়ানো সম্ভব।

এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশ কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। হেপাটাইটিস নিয়ে কাজ করছেন এমন বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০-এর লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধে এখনো কোনো জাতীয় নীতিমালা করা হয়নি।

যেসব কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে

হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হচ্ছে জীবাণু (যেমন : ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি)-এর সংক্রমণ। এছাড়া অ্যালকোহল, ড্রাগস বা ওষুধ ও মেটাবলিক কারণেও হেপাটাইটিস হতে পারে। ভাইরাল হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে ভাইরাস শুধু লিভারের কোষকে আক্রমণ করে। হেপাটাইটিস ‘এ’, ‘বি’ ও ‘ই’ ভাইরাস একিউট এবং হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ দিয়ে ক্রনিক  হেপাটাইটিস হয়ে থাকে। সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে  হেপাটাইটিস-সি।

 হেপাটাইটিস কীভাবে হয়

- হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ পানিবাহিত ভাইরাস। রাস্তার পাশের পানি, আখের রস কিংবা অন্য কিছু খেলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।

- হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস দুটি রক্ত এবং দেহরস (যেমন সিরাম, বীর্য ইত্যাদি)-এর সংস্পর্শে এলে হয়ে থাকে।

- হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস মা থেকে শিশুর দেহে সংক্রমিত হতে পারে। মায়ের শরীরে যদি হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস থাকে, তবে বাচ্চার হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। এই সংক্রমণ সাধারণত জন্মের সময় হয়ে থাকে।

- রক্ত পরিসঞ্চালন করলে অথবা রক্তের অন্যান্য উপাদান ( যেমন সিরাম) গ্রহণের 

- অনিরাপদ যৌনমিলন, মাদক ব্যবহার, সংক্রমিত সুচ এবং সিরিঞ্জ ব্যবহার কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির রেজার ও ব্রাশ ব্যবহার করলে হতে পারে।

- অনভিজ্ঞ ও হাতুড়ে দন্ত চিকিৎসক দ্বারা দাঁতের চিকিৎসা করা বা দাঁত উঠানো।

- অসতর্কভাবে নাক ও কান ফোঁড়ানো এবং শরীরে ট্যাটু আঁকা।

যাদের হেপাটাইটিস পরীক্ষা করা উচিত

-যদি পরিবারের কারো হেপাটাইটিস বা যকৃতের রোগ হয়ে থাকে

-যাদের জীবনে কোনো সময় জন্ডিস হয়েছিল

- মায়ের হেপাটাইটিস থাকলে সন্তানের

- মাদকাসক্ত ব্যক্তি

- যাদের রক্ত পরিসঞ্চালনের পূর্বে যথাযথ পরীক্ষা করা হয় নাই

- চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোক

-অস্বাভাবিক শারীরিক দুর্বলতা এবং ওজন হ্রাসের অন্য কোনো ডাক্তারি কারণ পাওয়া না গেলে

- অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads