• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

স্বাস্থ্য

ডায়াবেটিস সম্পর্কে জ্ঞাতব্য

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ১৪ নভেম্বর ২০১৯

ডায়াবেটিস কেন হয়

শরীর যখন রক্তের সব চিনিকে (গ্লুুকোজ) ভাঙতে ব্যর্থ হয় তখনই ডায়াবেটিস হয়। আমরা যখন কোনো খাবার খাই তখন আমাদের শরীর সেই খাদ্যের শর্করাকে ভেঙে চিনিতে (গ্লুুকোজ) রূপান্তরিত করে। অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের যে হরমোন নিঃসৃত হয়, সেটা আমাদের শরীরের কোষগুলোকে নির্দেশ দেয় চিনিকে গ্রহণ করার জন্য। এই চিনি কাজ করে শরীরের জ্বালানি বা শক্তি হিসেবে। শরীরে যখন ইনসুলিন তৈরি হতে না পারে অথবা এটা ঠিকমতো কাজ না করে তখনই ডায়াবেটিস হয়। এর ফলে রক্তের মধ্যে চিনি জমা হতে শুরু করে।

 

উপসর্গ

ক্লান্তি বোধ করা ছাড়াও সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে : খুব তৃষ্ণা পাওয়া, স্ব্বাভাবিকের চাইতেও ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতের বেলায়। কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, প্রদাহজনিত রোগে বারবার আক্রান্ত হওয়া। দৃষ্টি ঝাপসা  হয়ে যাওয়া, শরীরের কোথাও কেটে গেলে শুকাতে দেরি হওয়া।

 

প্রতিরোধে উপায়

চেক করুন : সবচেয়ে ভালো হয় মেডিকেল চেক আপ করলে। অথবা খেয়াল করুন আপনার ওজন বেড়ে যাচ্ছে কি না, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না। আপনার হার্ট সুস্থ আছে কি না।

পরিমিত খান : শুধু ডায়াবেটিস কেন যেকোনো রোগ প্রতিরোধ করা এবং সুস্থ থাকার জন্য পরিমিত খাওয়ার অভ্যাস করার বিকল্প নেই। পরিমিত আহার করার কৌশল হলো ছোট ছোট লোকমা বা গ্রাস গ্রহণ করা, আস্তে আস্তে ভালো করে চিবিয়ে খাবারের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করে খাবার গ্রহণ করা।

ওজন নিয়ন্ত্রণ : ওজন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভালো খাদ্যাভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই।

ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস ত্যাগ করুন : কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক ও বিয়ার-শ্যাম্পেন পান করা থেকে বিরত থাকা বাজারে যেসব পানীয় পাওয়া যায় তার সবগুলোই প্রায় প্রচুর ক্যালরিসমৃদ্ধ।

পরিশ্রম করুন : নিয়মিত ব্যায়াম বা শরীরচর্চা বা শারীরিক কাজ করা বা পরিশ্রম করা।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখুন : রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না সেজন্য রক্তচাপ মাঝে মাঝে পরীক্ষা করুন। উচ্চরক্তচাপের জন্য দায়ী খাবার ও কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করুন।

হার্ট সুস্থ রাখুন : হার্ট সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ করুন।

ধূমপান : ধূমপান উচ্চরক্তচাপ ও হার্ট ডিজিজের জন্য দায়ী। এছাড়াও এতে ফুসফুসের ক্যানসারসহ নানা রোগ তৈরি হয়। তাই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে ধূমপান অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে।

 

প্রতিরোধে খাবার

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে আপনার প্রথমেই জানা থাকা উচিত কোন কোন খাবার তা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিছু খাবার রয়েছে যা গ্রহণ করলে টাইপ-১ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, এ খাবারগুলো টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়।

বাদাম : বাদাম দেহের জন্য খুবই স্বাস্থ্যকর। বাদামে এক ধরনের ফ্যাট থাকে যা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক। অন্যান্য বাদামের তুলনায় কাজুবাদামের পুষ্টিগুণ সবচেয়ে বেশি।

মিষ্টি কুমড়ার বীজ : মিষ্টি কুমড়ার বীজে ওমেগা-৩ নামক এক প্রকার স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বিদ্যমান। এতে শর্করার পরিমাণ কম থাকে। তা ছাড়া এটি আয়রনেরও আদর্শ উৎস। ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে তা খুবই কার্যকরী। সূর্যমুখীর বীজও ডায়াবেটিসের জন্য উপকারী।

করলা : তেতো করলা সারিয়ে তুলবে ডায়াবেটিস। সকালে খালি পেটে করলার জুস পান করুন। এটি প্রতিদিন করে দুই মাস পান করুন। এ ছাড়া প্রতিদিনের খাবারে করলা সবজি হিসেবে রাখতে পারেন। এটি প্যানক্রিয়াটিক ইনসুলিন সিক্রেশন বৃদ্ধি করে। করলা দুই ধরণের ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।

হলুদের গুঁড়ো : আধা গ্লাস পানিতে আধা চা চামচ হলুদের গুঁড়ো, এক চা চামচ আমলকীর গুঁড়ো এবং আধা টেবিল চামচ মেথির গুঁড়োর মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে পান করুন।

মেথি : দুই টেবিল চামচ মেথি সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে খালি পেটে এই পানি পান করুন। এটি কয়েক মাস পান করুন। এছাড়া দুই টেবিল চামচ মেথি গুঁড়ো দুধের সাথে মিশিয়ে পান করুন। মেথি রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ঠিক রাখে। উচ্চ আঁশযুক্ত হওয়ায় এটি শরীরের কার্বোহাইড্রেইড এবং চিনি শরীরে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

অ্যালোভেরা জেল : আধা চা চামচ তেজপাতার গুঁড়ো, হলুদের গুঁড়ো এবং এক টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেল ভালো করে মিশিয়ে নিন। এটি দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার খাওয়ার আগে নিয়মিত খান। অ্যালোভেরা এবং হলুদের ওষধি গুণাবলি ডায়াবিটস নিয়ন্ত্রণ করে।

ঢ্যাঁড়শ : কিছু ঢ্যাঁড়শ কেটে সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। পরের দিন সকালে ঢ্যাঁড়শ ফেলে দিয়ে পানি পান করুন। এটি প্রতিদিন করুন। ২০১১ সালে এক জার্নালে দেখা গেছে যে, ঢ্যাঁড়শের অ্যান্টিডাবায়টিক এবং অ্যান্টিহাইপারলিপিডেমিক উপাদান রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

মাছ : মাছ আমিষের একটি আদর্শ উৎস। মাছেও মিষ্টি কুমড়ার বীজের মতো ওমেগা-৩ বিদ্যমান। মাছ ভেজে খাওয়ার চেয়ে গ্রিল করে খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

বেরি : বেরি খুবই স্বাস্থ্যকর একটি ফল। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বেরি দেহের ইনসুলিন তৈরিতে সহায়তা করে। টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে তা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে। ব্লুবেরিকে প্রকৃতির সুপার ফুডও বলা হয়।

শস্যদানা : তন্তু বা আঁশযুক্ত খাবার দেহের খাদ্য ভারসাম্যের জন্য খুবই দরকারি। বিভিন্ন ধরনের শস্যদানায় এ উপাদান বিদ্যমান। এসবের মধ্যে মটরশুঁটি আদর্শ। রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাপ্তাহিক নিয়মে তা গ্রহণ করা উচিত।

ব্রোকলি : ব্রোকলিকে বলা হয় ডায়াবেটিসের জন্য আদর্শ সবজি। এর কিছু বিশেষ পুষ্টি উপাদান ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়, ব্লাড সুগারও নিয়ন্ত্রণে রাখে। ব্রোকলি হূদযন্ত্রের কার্যক্রমও স্বাভাবিক রাখে। এটি ভিটামিন-সি’র আদর্শ উৎস।

বাঁধাকপি : পুষ্টিগুণের দিক থেকে বাঁধাকপির কোনো তুলনা নেই। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। টাইপ-১ এর ক্ষেত্রে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে। বাঁধাকপি ভালোমতো ধুয়ে কাঁচা বা অর্ধ-সিদ্ধ অবস্থায় খাওয়া ভালো।

অ্যাভোকাডো : গবেষণায় দেখা যায়, অ্যাভোকাডো নারীদের ক্ষেত্রে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রবণতা ২৫ শতাংশ কমায়। হূদযন্ত্রের জন্যও তা খুবই উপকারী। দৈনন্দিন খাবার গ্রহণের পর এ ফল খেলে তা ব্লাড সুগার পরিমিত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

চা : চা দেহের অবসাদ দূর করে। দেহের অভ্যন্তরের বিষাক্ত পদার্থ বিনাশেও তা কাজ করে। প্রতিদিন নিয়মিত গ্রিন-টি অথবা র-টি খাওয়ার পরামর্শ দেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তবে চায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করা একেবারেই উচিত নয়।

রসুন : গবেষণায় দেখা গেছে রসুন রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, এমনকি তা ক্যানসার প্রতিরোধেও সহায়ক।

শতমূলী : শতমূলী টাইপ-২ ডায়াবেটিস ছাড়াও আরো অনেক রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। তা ছাড়া দেহের ইনসুলিন উৎপাদন স্বাভাবিক রাখে এ সবজি।

দারুচিনি : মিষ্টিজাতীয় খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে দারুচিনি খুবই কার্যকরী। দারুচিনি ক্ষুধার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এটি দেহের ব্লাড সুগারের পরিমাণও কমাতে সহায়ক।

অলিভ অয়েল  : অলিভ ওয়েল বা জলপাই তেলে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বিদ্যমান। এটি দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য অর্জনে সহায়ক।

মিষ্টি আলু : সাধারণ আলু ডায়াবেটিসের জন্য ভালো নয়। তবে মিষ্টি আলু ব্যতিক্রম। এটি ইনসুলিন উৎপাদন স্বাভাবিক রাখে, রক্তের কোলেস্টেরল হ্রাস করে।

স্পিনাচ : ডায়াবেটিসের জন্য বিশেষজ্ঞরা স্পিনাচ খাওয়ার পরামর্শ দেন। বিভিন্ন প্রকার পুষ্টিগুণের পাশাপাশি ভিটামিনে ভরপুর এ সবজি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads