• বুধবার, ৩ জুন ২০২০, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
করোনাভাইরাস কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি

স্বাস্থ্য

করোনাভাইরাস কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারি ২০২০

চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। উল্লেখ্য বিষয় হলো, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাড়ে ছয় কোটি মানুষ উজাড় হয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার অন্তত তিন মাস আগেই এ ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা ভবিষ্যদ্বাণী করে জানিয়েছিলেন, নতুন এক ধরনের করোনাভাইরাসে লাখ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের মধ্যে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে ডেইলি মেইল।

এই ভাইরাসটি কতটা ভয়ংকর এবং কীভাবে ছড়ায়, তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো। চীনজুড়ে ছড়িয়ে পড়া রহস্যময় করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ডিসেম্বরে প্রথম শনাক্ত হয়। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে গত ডিসেম্বরে ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয়, এরপর তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা ধরণা করছেন, বিষধর চাইনিজ ক্রেইট বা চাইনিজ কোবরা করোনাভাইরাসের মূল উৎস হতে পারে। ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে উহানের বাস, পাতাল রেল ও ফেরি পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উহান থেকে বিদেশগামী বিমান ও ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে। এতকিছুর পরও করোনাভাইরাস চীনের পাশাপাশি জাপান, থাইল্যান্ড, হংকং, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ছড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যেও আক্রান্ত সন্দেহে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে বৈশ্বিক বাজারে ভ্রমণ ও বাণিজ্যিকভাবে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বলছে, করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল উহানের সিফুড বাজারের সঙ্গে যুক্ত। ভাইরাসটি কোনো প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে স্থানান্তর হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১ জানুয়ারি থেকে উহান বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও এ ভাইরাসকে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ মানুষ থেকে মানুষে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে। জানা গেছে, উহানের অসুস্থ রোগীদের যত্ন নেওয়ার কাজে যুক্ত ১৫ জন স্বাস্থ্যকর্মীও এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি যদি হাঁচি-কাশির মাধ্যমেই ছড়িয়ে থাকে, তবে মুখের মাস্ক অবশ্যই কিছুটা সুরক্ষা দেবে। যদিও মাস্কের ধরনের বিষয়টিও এখানে যুক্ত। শ্বাসকষ্টের ভাইলযুক্ত ফেসমাস্কগুলো কাগজের সার্জিক্যাল মাস্কগুলোর চেয়ে বেশি কার্যকর। যেহেতু হাঁচি-কাশির ফোঁটাগুলো বাতাসে ভেসে অন্য মানুষকে স্পর্শ করে, তাই ঘনঘন হাত ধোয়াও কার্যকর হতে পারে।

করোনাভাইরাস সম্পর্কে যা জানা জরুরি

এই ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমেই এটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। সাধারণ ফ্লু বা ঠান্ডা লাগার মতো করেই এ ভাইরাস ছড়া হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। তবে এর পরিণামে অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া, নিউমোনিয়া এবং মৃত্যু ঘটারও আশঙ্কা রয়েছে। এ ভাইরাসের সবচেয়ে বেশি ভয়াবহতা হচ্ছে ছড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। বলা হচ্ছে, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে তো বটেই, হাঁচি-কাশি থেকে বাতাসের মাধ্যমেও এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। করোনাভাইরাস ভাইরাসেরই একটি পরিবারের সদস্য, যা শ্বাসযন্ত্রের প্রক্রিয়ায় সংক্রমণ ঘটায়। নতুনটিসহ সাতটি করোনা ভাইরাস রয়েছে। ডব্লিউএইচও অস্থায়ীভাবে নতুন এ ভাইরাসের নাম দিয়েছে ‘২০১৯-এনসিওভি’। ২০০২ ও ২০০৩ সালে মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের পেছনে সার্স (সেভার অ্যাকিউট রিসপাইরেটরি সিনড্রোম) করোনাভাইরাস ছিল। সার্সে প্রায় নয় হাজার মানুষ আক্রান্ত হয় এবং এর মধ্যে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়। সার্স প্রাদুর্ভাবের এক দশক পর ২০১২ সালে মার্স (মিডল ইস্ট রিসপাইরেটরি সিনড্রোম) প্রাদুর্ভাব শুরু হয়, যা এখনো চলমান। উহানের নতুন করোনাভাইরাস এ ভাইরাসগুলো থেকে আলাদা, তবে আগে কখনো এর প্রাদুর্ভাব মানুষের মধ্যে দেখা যায়নি।

ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণগুলো কেমন

করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর এবং কাশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং তখনই কোনো কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

প্রতিষেধক  নেই : প্রতিরোধ কাম্য

আপাতত প্রতিকার হিসেবে এ ভাইরাস বহনকারীদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলছেন বিজ্ঞানীরা। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হু বলছে, কিছু সাধারণ নিয়ম মানলেই এড়ানো যাবে এই সংক্রমণ- রোগীর কাছ থেকে আসার পর ভালো করে হাত ধুতে হবে। হাঁচি ও কাশি দেওয়ার সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখুন। ডিম, গোশত ভালো করে রান্না করুন। রোগীর থেকে দূরে থাকুন। ডাক্তারদের পরামর্শ, বারবার হাত ধোয়া, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা ও ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরা। ভাইরাসটি নতুন হওয়াতে এখনই এর কোনো টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এমনকি এমন কোনো চিকিৎসাও নেই, যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে মানুষকে নিয়মিত হাত ভালোভাবে ধোয়া নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং ঠান্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকারও পরামর্শ দিয়েছে তারা। এশিয়ার বহু অংশের মানুষ সার্জিক্যাল মুখোশ পরা শুরু করেছে।

যেভাবে ছড়াতে পারে ভাইরাস

সহজেই একজনের থেকে আরেক জনের মধ্যে ছড়ায় এই ভাইরাস-

-শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এমনকি করমর্দন থেকেও এই রোগ ছড়াতে পারে।

-রোগী বা তার জিনিস ধরার পর ভালো করে হাত না ধুয়ে চোখ, মুখ, চোখ, নাকে হাত দিলে এই রোগ ছড়াতে পারে।

-হাঁচি-কাশি থেকেও এই রোগ ছড়াতে পারে।

প্রতিরোধে সতর্কাবস্থা ও প্রচেষ্টা বিশ্বজুড়ে

হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথা বলা হলেও ভাইরাসটি কীভাবে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে স্থানান্তর হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। আশার খবর হচ্ছে কীভাবে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে এবং কীভাবে ছড়িয়ে পড়া রোধ করা যায়, তা বের করার জন্য বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এ স্ট্রেনের বিরুদ্ধে একটি ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছেন। যেভাবে করোনাভাইরাস রুখতে ভ্যাকসিন তৈরির প্রচেষ্টা চলছে, তাতে কয়েক মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলক কিছু ভ্যাকসিন প্রস্তুত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও ব্যাপক ব্যবহারের অনুমোদনের জন্য আরো সময় লাগবে। ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত ভাইরাসটির বিস্তার সীমাবদ্ধ করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো এরই মধ্যে ভ্রমণকারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। এছাড়া বাংলাদেশসহ অনেক দেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিহ্নিত ও আলাদা করতে কিছু স্বাস্থ্য সংস্থা ও হাসপাতালে রোগীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।

মাস্ক ব্যবহার করে ভাইরাস সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া কি সম্ভব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে মাস্ক ব্যবহার সহায়ক হতে পারে, যদি সঠিক আবহাওয়া ও সঠিক উপায়ে এটি ব্যবহার করা হয়। এখনই মাস্ক ব্যবহারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি জানিয়ে জনগণকে সচেতন থাকতে বলেছে মার্কিন জনস্বাস্থ্য বিভাগ। তবে চীনের জন্য বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। ফলে দেশটিতে বেড়েছে মাস্কের চাহিদা। যার ফলে এর যোগান দিতে উৎপাদন বাড়িয়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। জর্জিয়ার আটলান্টার ইমোরি ইউনির্ভাসিটি স্কুল অব মেডিসিনের সহকারী প্রভাষক মেরিবেথ সেক্সটন জানান, সর্বাধিক পরিহিত, সস্তা এবং ডিসপোজেবল মাস্ক, যা সার্জিক্যাল মাস্ক হিসেবে পরিচিত, এটি করোনাভাইরাসকে আটকাতে পারে, তবে নির্মূল করতে পারে না। এমনকি নিখুঁতভাবে ব্যবহারের পরও, এই মুখোশগুলো থেকে কোনো ভাইরাস বা রোগ সংক্রামক জীবাণু পাশ দিয়ে পিছলে যেতে পারে বা চোখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বাংলাদেশও প্রস্তুত

চীন থেকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রস্তুত বাংলাদেশ- এটা একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন সর্বজনে। কারণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে যে কোনো  সময় এ ভাইরাস বাংলাদেশে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগাম সতর্কতামূলক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন এবং আইএইচআর স্বাস্থ্য ডেস্কগুলোতে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জোরদার করা হয়েছে রোগের ওপর নজরদারি কার্যক্রম।

পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ভাইরাস ঠেকাতে প্রস্তুতি নিয়েছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন প্রবেশপথে করোনাভাইরাস স্ক্রিনিং (শনাক্ত) কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। নতুন এ ভাইরাস সম্পর্কে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে এবং ভাইরাসটি প্রতিরোধের জন্য এ সংক্রান্ত প্রচার কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে। শাহজালাল বিমানবন্দরসহ দেশের সাতটি প্রবেশপথে ডিজিটাল থার্মাল স্ক্যানারের মাধ্যমে আক্রান্ত দেশ থেকে আগত রোগীদের স্পর্শ না করে অসুস্থতা পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। সেজন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিমানবন্দরের আক্রান্তকে আলাদাকরণ ওয়ার্ড। পাশাপাশি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালকে রেফারেল হাসপাতাল হিসেবে নির্দিষ্ট রেখে সেখানে ওয়ার্ডও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসা কাজে স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ রোগ প্রতিরোধী পোশাক মজুদ রাখা হয়েছে। প্লেনে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণের জন্য ক্রুদের মাধ্যমে যাত্রীদের মধ্যে হেলথ ডিক্লারেশন ফরম ও প্যাসেঞ্জার লোকেটর ফরম বিতরণ করা হচ্ছে। ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা ও জনসচেতনতা তৈরির জন্য ভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত গাইডলাইনও প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে সিডিসি ও আইইডিসিআরের (রোগতত্ত্ব, রোগয়িন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠান) চারটি হটলাইন।

সূত্র : সিএনএন ও ফোর্বস

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads