• বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২ বৈশাখ ১৪২৭
টেনশনে মূত্র ত্যাগ বেড়ে যায় কেন

প্রতীকী ছবি

স্বাস্থ্য

টেনশনে মূত্র ত্যাগ বেড়ে যায় কেন

  • প্রকাশিত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ডা. অপূর্ব চৌধুরী

দৈনন্দিন উদ্বিগ্নতা, কোনো কিছুতে নার্ভাস হয়ে যাওয়া, টেনশন বাড়া, কোথাও ইন্টারভিউয়ের জন্য বসে থাকার মুহূর্ত, পরীক্ষার হলে ঢোকার আগের সময়টি নিত্য এ রকম অসংখ্য সময়ে লোকের বাথরুম পায়। সহজ কথায় প্রস্রাব ধরে। এককথায় ভয় পেলে মূত্র ত্যাগের ইচ্ছা বেড়ে যায় কেন? শরীরে কি এমন ঘটে, যা বার বার ঠেলে দিতে চায় মূত্রালয়ের দিকে!

ওই মুহূর্তগুলোতে ইউরিনারি ব্লাডার বা মূত্রথলি মনে হয় যেন ভরে যায়। শরীর ভার ভার লাগে। আর তাতে শরীরের নিম্ন চাপ বেড়ে যায়। বার বার অহেতুক প্রস্রাব ধরে। শুধু প্রস্রাব ধরে না, ব্লাডার খালি না করলে অস্বস্তি বেড়ে যায়, আবার অস্বস্তি বেড়ে গেলে নার্ভাসনেস আরো বেড়ে যায়। এই বেড়ে যাওয়া নার্ভাসনেস আবার প্রস্রাবের প্রয়োজন বাড়িয়ে দেয়। একজন যেন আরেকজনের হাত ধরে বসে। একদিকে নার্ভাস, একদিকে প্রস্রাব।

মজার ব্যাপার হলো, অন্য মুহূর্তগুলোকে যখন আমরা রিলাক্স মুডে থাকি, স্বাভাবিক কাজে-কর্মে ব্যস্ত থাকি, তখন বার বার এমন প্রস্রাব ধরার কিংবা ব্লাডার খালি করার জন্য ওয়াশরুমে যেতে হয় না। তখন চাইলে আমরা কন্ট্রোল করতে পারি। প্রস্রাব চেপে রাখতে পারি।

ছোটবেলায় বাবা-মায়েরা এই পদ্ধতিটি বাচ্চাদের প্রথমে শেখায়। একে বলে ব্লাডার ট্রেনিং। এর আগ পর্যন্ত বাচ্চারা যখন-তখন প্রস্রাব করে দেয়। তাই তাদের ন্যাপি পরিয়ে রাখতে হয়। কারণ তখন পর্যন্ত তার ব্রেইন এবং ইউরিনারি ব্লাডারের মধ্যে নার্ভের ওই সংযোগ শক্তিশালী থাকে না, যা দিয়ে সে নিজে নিজে প্রস্রাব দমিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু ব্লাডার ট্রেনিংয়ের মধ্যে দিয়ে বাচ্চারা শেখে যে প্রস্রাব ধরলে যেখানে-সেখানে প্রস্রাব করা যাবে না, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে হবে। তার আগ পর্যন্ত প্রস্রাব চেপে রাখতে হবে।

ধীরে ধীরে ব্লাডার কন্ট্রোল করতে শেখে। মস্তিষ্ক এবং ব্লাডারের মধ্যে একটি স্নায়ুবিক সংযোগ তৈরি হয়। প্রস্রাব ধরলে উপযুক্ত জায়গা না পাওয়া পর্যন্ত ব্রেইন ওই ট্রেনিং এবং স্থায়ী সংযোগের কারণে চেপে রেখে উপযুক্ত সময় এবং পরিবেশে নিষ্ক্রান্ত করতে পারে। কিন্তু স্ট্রেস বেড়ে গেলে, টেনশন বেড়ে গেলে, উদ্বিগ্ন হলে, ভয় পেলে, শরীরের এই স্বাভাবিক ব্রেইন ব্লাডার স্নায়ু সংযোগ প্রক্রিয়াতে ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু কেন এমন হয় অথবা কীভাবে এটা হয়। স্ট্রেস বেড়ে গেলে মস্তিষ্ককে এক ধরনের স্ট্রেস রিলেটেড রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যায়। একে বলে পড়ৎঃরপড়ঃৎড়ঢ়রহ-ৎবষবধংরহম ভধপঃড়ৎ বা সংক্ষেপে ঈজঋ। এটি একটি নিউরোট্রান্সমিটার সাবস্টেন্স। নিউরোট্রান্সমিটার পদার্থ হল মস্তিষ্ক বা শরীরের নিউরন বা নার্ভ সেল বা স্নায়ু কোষের একটি থেকে আরেকটিতে স্নায়ু বার্তা যাওয়ার একটা কেমিক্যাল। কারেন্ট যেমন তারের ভেতর দিয়ে যায়, তেমনি এই রাসায়নিক উপাদানটি এক স্নায়ু থেকে আরেক স্নায়ু কোষে রাসায়নিক পদার্থের মধ্য দিয়ে সংকেত পৌঁছে দেয়।

মজার হলো, ভয় কিংবা উদ্বিগ্নতার কারণে মস্তিষ্কে নিঃসৃত হওয়া নিউরোট্রান্সমিটার রাসায়নিক উপাদান ঈজঋ-এর কিছু রিসেপ্টর থাকে ইউরিনারি ব্লাডার বা মূত্রথলিতে।

কোনো রাসায়নিক পদার্থ শরীরের কোথায় কাজ করবে তার কিছু চিহ্নিতকরণ উপাদান থাকে, সেই উপাদানগুলোকে বলে সেই রাসায়নিক উপাদানটির রিসেপ্টর। উপাদানগুলো প্রোটিন জাতীয় হয় এবং যেখানে যেখানে কেমিক্যালটি কাজ করে বা করবে, সে জায়গায় কেমিক্যালটি যেন রক্তের মধ্য দিয়ে ভেসে ভেসে আসতে আসতে সেখানে থামে। না হলে কেমিক্যালটি কী করে বুঝবে শরীরের কোথায় সে কাজ করবে! যার যার রিসেপ্টরগুলো রিসিভ করতে এবং সেবা দিতে সেবা সেন্টারের মতো কোষের গায়ে বসে থাকে।

এই ঈজঋ-এর একটি কাজ হলো মূত্র থলিকে সংকুচিত করা। ফলে ভয় বা টেনশন বেড়ে গেলে, মস্তিষ্কে ঈজঋ সিক্রেশন বেড়ে গিয়ে ব্লাডারকে কন্ট্রাকশন বা সংকুচিত করতে থাকে বেশি এবং তাতে মনে হয় প্রস্রাব ধরেছে এবং বাথরুমে দৌড়ে যেতে ইচ্ছে করে। যদিও দেখা যায় ব্লাডারে প্রস্রাব খুব অল্পই থাকে।

আরেকটি নিউরোট্রান্সমিটার উপাদান এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। সেটি হল সেরোটোনিন। শরীরে সেরোটোনিনের অনেক কাজ। এটাকে অনেকে মুড হরমোন বলে। আমাদের মন ভালো খারাপ থাকা, রিলাক্স, টেনশন, ভয়, ঘুম, আনন্দ, হতাশা, এমনকি প্রেম ভালোবাসাতেও সেরোটোনিন  প্রভাব রাখে।  দেখা গেছে, স্ট্রেস বেড়ে গেলে শরীরে সেরোটোনিন কমে যায়। সেরোটোনিন আমাদের রিলাক্স মুডে রেখে ব্লাডারকে কন্ট্রোল করতে শেখায় এবং সাহায্য করে। ফলে শরীরে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সেরোটোনিন থাকলে ইউরিনারি ব্লাডার স্বাভাবিক না পুরে  যাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক কন্ট্রোলে থাকে। কিন্তু স্ট্রেসের কারণে সেরোটোনিন কমে গেলে ব্লাডারের এই রিলাঙ্ থাকার অবস্থায় ব্যাঘাত ঘটে। উল্টো কমে যাওয়া সেরোটোনিনের কারণে ব্লাডার তখন মস্তিষ্কের ব্লাডার ট্রেনিং সংযোগের স্থায়ী পথটিতে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। উদ্বিগ্নতা বাড়তে থাকে, সেরোটোনিন কমতে থাকে, সেরোটোনিন কমতে থাকে, মূত্র থলি স্বাভাবিক রিলাঙ্ না থেকে সংকুচিত হতে থাকে বেশি। ফলে থলিতে চাপ বাড়ে, মনে হয় ব্লাডার খালি করলেই ভালো লাগবে। আদতে থলিতে তেমন কিছু নাও থাকতে পারে!  এমন করে মস্তিষ্কের কেন্দ্রে কিছু রাসায়নিক উপাদানের ঘাটতি-বাড়তি মূত্র থলিতে চাপ সৃষ্টি করে বলে ভয় পেলে অযথাই বার বার প্রস্রাব ধরে।

লেখক : প্রবাসী চিকিৎসক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads