• বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
ভারতজুড়ে গেরুয়া উৎসব

ছবি : সংগৃহীত

ভারত

ভারতজুড়ে গেরুয়া উৎসব

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • প্রকাশিত ২৪ মে ২০১৯

গতকাল ২৩ মে ছিল ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ভোটগণনা ও ফল প্রকাশের দিন। এদিন ভারত মেতেছিল গেরুয়া উৎসবে। কারণ অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে আবারো দিল্লির মসনদ দখল করেছেন নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। এবার বিজেপি জোটের মূল স্লোগান ছিল ‘ফির একবার, মোদি সরকার’। বলতে গেলে এটিই ছিল দলটির অঙ্গীকার। হয়েছেও তা-ই, আবারো ক্ষমতায় এলো মোদি সরকার। পাঁচ বছর আগে যেভাবে ভারতের মানুষ নরেন্দ্র মোদির হাতে ভারতের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন, পাঁচ বছর পরেও তারা সেই একই কাজ করলেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো নরেন্দ্র মোদিতেই বেশি আস্থা মানুষের।

এর আগে সাত দফায় অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এরপর ১৪টি বুথফেরত জরিপের মধ্যে ১২টিই জানিয়েছিল আবারো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। জরিপগুলোতে ওই জোটের ২৮২ থেকে ৩৬৫টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। ‌তবে বুথফেরত জরিপকে পাত্তা দেয়নি বিরোধীরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুথফেরত জরিপের সম্ভাবনাই সত্যি হলো। বিপুলসংখ্যক আসন নিয়ে আবারো কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করছেন নরেন্দ্র মোদি।  

এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এককভাবে বিজেপি এগিয়ে ছিল ২৮৭টি আসনে। জোটগতভাবে তারা এগিয়ে রয়েছে ৩৪১টি আসনে। কংগ্রেস এককভাবে এগিয়ে ছিল ৫৪টি আসনে। আর জোটগতভাবে তারা এগিয়ে ছিল ৯৩টি আসনে। অন্য দলগুলো ১০৮টি আসনে এগিয়ে ছিল।

এদিকে উত্তরপ্রদেশেও বিজেপির কাছে পাত্তা পায়নি সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখানকার ৮০টি আসনের মধ্যে ৫৮টিতে এগিয়ে ছিল বিজেপি। বাকি ৮টিতে এসপি এবং ১১টিতে বিএসপি এগিয়ে ছিল। আর কংগ্রেস এগিয়ে ছিল মাত্র একটি আসনে। এমনকি কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছিল বিজেপির স্মৃতি ইরানীর সঙ্গে আমেথিতে। তবে কেরালার ওয়ানাদে জয় পেয়েছেন তিনি।

লোকসভা নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন এ রাজ্যে। দেশের রাজনীতিতে তাই বরাবরের চালু কথা উত্তরপ্রদেশ যার, দেশ তার। এমনও বলা হয়, উত্তরপ্রদেশের দখল নিতে পারলেই মসৃণ হয় প্রধানমন্ত্রিত্বের পথ। ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সব থেকে বেশিসংখ্যক প্রধানমন্ত্রী উপহার দিয়েছে এই রাজ্যই। নেহরু থেকে চন্দ্রশেখর, ইন্দিরা থেকে রাজীব সবাই এ রাজ্য থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০১৪ সালের লোকসভাতেও উত্তরপ্রদেশ দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করেছিল মোদি-শাহ জুটিকে। উত্তরপ্রদেশের দায়িত্ব হাতে নিয়ে এই রাজ্যে যে গেরুয়া ঝড় তুলেছিলেন অমিত শাহ, তাতেই সহজ হয়ে গিয়েছিল মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াই। ৮০টি আসনের মধ্যে ৭৩টি আসনে সেবার জিতেছিল বিজেপি জোট। এবারো তাই সবার বিশেষ নজর ছিল উত্তরপ্রদেশের দিকেই। এনডিএ, কংগ্রেস ও মায়া-মুলায়ম সবারই লক্ষ্য ছিল উত্তরপ্রদেশের দখল নেওয়া। সে লক্ষ্যেই কাজ করছিলেন অখিলেশ যাদব। উত্তরপ্রদেশের দুই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী আর মুলায়মের চিরশত্রুতার প্রাচীর ভেঙে সমাজবাদী পার্টি আর বহুজন সমাজ পার্টিকে এক জায়গায় এনেছিলেন তিনি। অন্যদিকে থেমে ছিল না কংগ্রেসও।

তবে সব আশঙ্কাকে দূরে ঠেলে উত্তরপ্রদেশে আবার গেরুয়া ঝড় বয়ে গেল। যে ঝড়ের দাপটে কংগ্রেসের পাশাপাশি বেসামাল অবস্থা মায়া-অখিলেশের মহাজোটেও। আবারো বিরোধীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা কতটা। গত পাঁচ বছরে তার সরকারের সাফল্য এবং তার প্রচার যা জাতীয় নিরাপত্তা এবং জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে বেড়ে উঠেছে। কংগ্রেসের সঙ্গে বার বার দোষারোপ পাল্টা দোষারোপের পালা চলেছে। তবে মোদির রাজত্ব শুধু হিন্দিবলয় ও গুজরাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তা এ নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। এবার পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকেও ছিল মোদির দাপট। তবে কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা এখনো মোদির ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

মোদির জয়ের খবরে উচ্ছ্বসিত তার মা হীরাবেন। উল্লাসে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়েন তিনি। ইন্ডিয়া টুডের খবরে বলা হয়েছে, বড় ব্যবধানে ছেলে মোদির ক্ষমতায় আসার খবরে সকালেই গুজরাটের গান্ধীনগরে ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে আসেন হীরাবেন। এ সময় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ছেলের জয়ের জন্য সংবাদমাধ্যমকেও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

এর আগে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ৯৮ বছর বয়সী মায়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ওইদিন হীরাবেনের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিয়ে আহমেদাবাদের ভোটকেন্দ্রে যান ভারতের এই প্রধানমন্ত্রী। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ব্যাপক জয়ের এই জয়কে ‘আবারো জিতল ভারত’ বলে অভিহিত করেছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ‘একসঙ্গে আমরা বাড়ছি। আমাদের একসঙ্গে শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে। আমরা একসঙ্গে মজবুত ভারত তৈরি করব। আবারো ভারতের জয়।’ বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেন, ‘এই জয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উন্নয়ন এবং তার প্রতি মানুষের আস্থার জয়।’ বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি টুইটে বলেছেন, ‘বিজয়ীদের অভিনন্দন। কিন্তু সব পরাজিতই হারেনি। আমাদের সবকিছু পর্যালোচনা করতে হবে। এরপর সবার সঙ্গে আমাদের মতামত শেয়ার করব। এখন গণনা পর্ব পুরোপুরি শেষ হোক। ইভিএমের সঙ্গে ভিভিপ্যাট মিলুক।’

মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে এ অভিনন্দন জানান তিনি। টুইটে মোদিকে উদ্দেশ করে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘শাবাশ বন্ধু! নির্বাচনের এ ফলের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র তোমার নেতৃত্বে আরো শক্তিশালী হলো। ভারত ও ইসরাইলের মধ্যকার মহান বন্ধুত্বকে আরো মজবুত করে তুলতে আমরা একযোগে কাজ করে যাব।’

এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, ভারতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থার সততা ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে আমেরিকার আত্মবিশ্বাস রয়েছে। ফলে যারাই জিতুক তাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ওয়াশিংটন।

পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র মর্গ্যান অর্টাগুস বলেছেন, অবশ্যই বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করব আমরা। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী ও স্বাধীন হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। মর্গ্যান অর্টাগুস আরো বলেছেন, আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। বহু ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বহুবার বলেছেন, আমরা একটি সত্যিকারের কৌশলগত সঙ্গী হিসেবে ভারতকে পেয়েছি।

এদিকে জয়ের আভাস স্পষ্ট হওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানী নয়াদিল্লিতে দলের সদর দফতরে ডাকা হয় ২০ হাজার কর্মীকে। প্রধানমন্ত্রী মোদিকে জমকালো সংবর্ধনা দিতেই ওই আয়োজন করা হয়। এছাড়া বিজয়ী নেতাদের ২৫ মে’র মধ্যে দিল্লিতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে দলটি।

প্রসঙ্গত, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট পাঁচ বছর আগে ৩৩৬ আসনে জিতেছিল। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ ৫৯টি আসন জিতেছিল। কংগ্রেস এককভাবে পেয়েছিল মাত্র ৪৪টি আসন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads