• রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
উত্তাল হয়ে উঠতে পারে কাশ্মীর

ছবি : সংগৃহীত

ভারত

শ্রীনগরে ফের কারফিউ, সংঘর্ষে নিহত ১

উত্তাল হয়ে উঠতে পারে কাশ্মীর

  • মোমেনা আক্তার পপি
  • প্রকাশিত ১৯ আগস্ট ২০১৯

দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে নিজ গৃহে অবরুদ্ধ। বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত। মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। ফুরিয়ে এসেছে খাদ্য। ঘরের দরজায় অস্ত্র হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাই প্রয়োজন সত্ত্বেও ঘর থেকে বের হতে পারছে না মানুষ। এখানে বলা হচ্ছে ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতির কথা। কিন্তু আর কতদিন তাদের এভাবে থাকতে হবে, সেটা এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবর বিবিসি, আলজাজিরা, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি ও ডনের।

গত ৫ আগস্ট সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বাতিল করে দেয় নরেন্দ্র্র মোদি সরকার। এ ঘটনাকে কেন্দ্র যাতে সেখানকার জনগণ রাস্তায় নামতে না পারে সেজন্য সেখানে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। কোথাও কোথাও কারফিউ জারি করা হয়। মোতায়েন করা হয় লাখ লাখ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, কয়েকটি জায়গায় টেলিফোন সেবা চালু করা হয়েছে। আজ (সোমবার) থেকে খুলবে স্কুল-কলেজ। শিথিল করা হয়েছে কারফিউ। ক্রমান্বয়ে অন্যান্য এলাকা থেকে ১৪৪ ধারা ও কারফিউ প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু এত কিছু করে মোদি সরকার যে কাশ্মীরের জনগণকে দমাতে পারবে না ইতোমধ্যে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

গত শনিবার শ্রীনগরে কারফিউ শিথিল করার পর বিশেষ মর্যাদা বাতিলের প্রতিবাদে রাস্তায় নামে জনগণ। তাদের সঙ্গে রাতভর পুলিশের সংঘর্ষের পর গতকাল রোববার সকালে শ্রীনগরের অনেক এলাকায় ফের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সংঘর্ষে একজন নিহত ও ২৪  জন আহত হয়েছে বলে দুজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন।

রোববার সকালেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফের রোড ব্লক স্থাপন করে নিরাপত্তা বাহিনী। এছাড়া অধিবাসীদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে নির্দেশ দেয়। নিরাপত্তারক্ষীরা জনতাকে জানায়, তারা যেন ঘরে ফিরে যান, কারণ কারফিউ বলবৎ করা হয়েছে। তবে সংঘর্ষ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কাশ্মীর রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে শ্রীনগরের পুরাতন শহরের রাইনাওয়ারি, নওহেত্তা ও গোজওয়ারা এলাকায়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর প্যালেট, টিয়ার গ্যাস এবং মরিচের গুঁড়ার গ্রেনেড ছোড়ে। চিকিৎসকরা জানান, ১৭ জন প্যালেট দ্বারা আহত হয়েছেন। পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। হাসপাতালের কর্মকর্তা ও পুলিশের দুই কর্মকর্তা জানান, একজন ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধও হাসপাতালে ভর্তি হন। উপর্যুপরি মরিচ গ্রেনেড আর টিয়ার শেল বিস্ফোরণে মোহাম্মদ আইয়ুব নামের এই ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি শ্বাস নিতে পারছিলেন না। শনিবার রাতেই হাসপাতালে তিনি মারা যান।

রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে, কারফিউ জারি করে কাশ্মীরের জনগণকে কতদিন থামিয়ে রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ভারতের চির বৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তান শুরু থেকে মোদি সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে। আরেক প্রতিবেশী চীনও বিরোধিতায় কম যায়নি। চীনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গত শুক্রবার কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক হয়। বৈঠকটি অনানুষ্ঠানিক হলেও ৫ দশকেরও বেশি সময় পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা হয়েছে-এটা ভারতের জন্য সুখকর নয়। এছাড়া এই ইস্যুতে রাশিয়ার মন্তব্য ভারতের জন্য গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতোই অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোদি সরকার কীভাবে এত দিক সামাল দেবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।

কাশ্মীর নিয়ে মোদি সরকারের সিদ্ধান্ত ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর জন্যও সমস্যা সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এত দিন সবাই জানত মোদি নিজেকে ফেডারেলিজমের একজন উৎসাহদাতা হিসেবে চিত্রিত করতে পছন্দ করেন। তিনি রাজ্যগুলোকে আরো স্বাধীনতা দেওয়ায় বিশ্বাস করেন। কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও রাজ্যকে ভেঙে দুই ভাগ করা এবং যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করায় অনেকেই মনে করছেন এর ফলে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ এখন সরাসরি দিল্লির শাসনে থাকবে। এগুলো অন্য রাজ্যের তুলনায় কমই স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পাবে।

এ বিষয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের প্রফেসর সুমান্ত্রা বোস এটাকে বর্ণনা করেছেন-দিল্লির গৌরবময় মিউনিসিপালিটি হিসেবে। তার মতে, ৩৭০ ধারা ছিল একটি সাংবিধানিক গ্যারান্টি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এটা আসলে প্রতীকী। কারণ প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রির মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের অনেক কিছু আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো অনেকেই বলে থাকেন যে এটা একটা চেতনা, যা ভারতীয় সংবিধানে যে মূল ধারা থেকে আলাদা যারা আছে বলে মনে করেন তাদের জন্য একটু জায়গা করে দেয়। এছাড়া আর কিছুই নয়। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সত্যিকার অর্থে অনেক কষ্টে অর্জিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার মতো উন্নত দেশে যত সহজে ক্ষমতার ভাগাভাগিকে সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মাধ্যমে করা হয়েছে, ভারতের মতো একটি গরিব দেশে সেটা তত সহজ নয়।

দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের প্রধান নির্বাহী ইয়ামিনি আইয়ার বলেন, সংবিধান একক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে একটি ভারসাম্য নিশ্চিত করেছে। যদিও অনেক বিশ্লেষক ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন  তোলেন। সাংবিধানিক পদ্ধতি যেখানে কাজ করে না সেখানে ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তরাই রাজ্য গভর্নর হিসেবে কাজ করেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এ ধরনের সরাসরি শাসন ১৯৫১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত অন্তত ৮৮ বার হয়েছে। অনেকের মতে, কেন্দ্রের শাসনে থাকা অবস্থায় স্থানীয় জনগণ ও রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই যেভাবে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা হয়েছে, সেটি ভারতের ফেডারেল রেকর্ডে আরেকটি দাগ।

‘ডিমিস্টিফাইং কাশ্মীর’ গ্রন্থের লেখক নভনিতা চাদা বেহেরা বলেন, এ পদক্ষেপের বড় তাৎপর্য হলো আমরা একক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি এবং গণতান্ত্রিক নীতির বিলুপ্তি, যা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করছে। এখানে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এটি হতে পারে অন্য রাজ্যের ক্ষেত্রেও। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে বাতিল করে দিতে পারে। রাজ্যকে ভাগ করতে ও মর্যাদাহানি ঘটাতে পারে। আরো উদ্বেগের হলো সিভিল সোসাইটি, মিডিয়া ও আঞ্চলিক দলগুলোর চুপ থাকার মাধ্যমে প্রতিবাদকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads