• সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬
ads
স্থবিরতা শিল্প কারখানায়

ছবি : সংগৃহীত

শিল্প

স্থবিরতা শিল্প কারখানায়

নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না # মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে # কমে গেছে বেসরকারি খাতে ঋণ

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২৫ জুলাই ২০১৯

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে বেসরকারি বিনিয়াগ গতি পাবে- এমন ধারণা তৈরি হলেও কার্যত বিপরীত চিত্র পাওয়া গেছে। ঝিমিয়ে পড়েছে শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ। শিল্প-কারখানা করতে উদ্যোক্তারা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। অপরদিকে, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে চললে নতুন কর্মসংস্থান হবে না। বাড়বে বেকারত্ব। 

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নানা পদক্ষেপের মধ্যেও মূলধনী যন্ত্রপাতির ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য ৪৩২ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৩০ শতাংশ কম। অর্থাৎ নির্বাচনী বছরেও যন্ত্রপাতি বেশি আমদানি করে শিল্প-কারখানা করেছেন ব্যবসায়ীরা।

তবে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির সঙ্গে চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, ওষুধসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের এলসি কমেছে। অবশ্য ধানের ব্যাপক ফলনের কারণে সম্প্রতি চাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়, যাতে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পান। অবশ্য তাতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এলসি খোলার এ প্রবণতার কারণে অদূর ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে আলাপকালে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, প্রবাসী আয় বেড়ে যাওয়ায় এবং এলসির চাপ কম থাকায় এখন বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্বস্তি কমে গেছে। কিছুদিন ধরে ডলারের দরও স্থিতিশীল রয়েছে। এ অবস্থা আরো কিছুদিন বজায় থাকবে বলে আশা করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, আগ্রাসী ধারা থেকে ফিরে নিয়মের মধ্যে আসার চেষ্টায় ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কমেই চলেছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ গত কয়েক বছরের মধ্যে নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতির অনেক নিচে রয়েছে ঋণের প্রবৃদ্ধি। সর্বশেষ হিসাবমতে, এর হার দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৫ সালের নভেম্বরে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ হওয়ার ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তা ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ হয়। এরপর গত বছরের আগস্টের আগে কখনোই ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের নিচে নামেনি। গত বছরে আগস্টে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ হয়। এরপর থেকেই এই ধারা কমে আসছে।

ঋণ কমানোর বিষয়ে কয়েকদিন আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) প্রেসিডেন্ট ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে টেলিফোনে বলেন, মূলত তিনটি কারণে ঋণ বিতরণ কম হয়েছে। প্রথমত ঋণের সুদহার কমানোর চেষ্টা চলছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো কিছুটা সতর্ক। তৃতীয়ত, এডিআর সীমা লঙ্ঘিত হওয়ায় তা নিয়মের মধ্যে আসার প্রচেষ্টা।

সংশ্নিষ্টরা জানান, আমদানি বৃদ্ধিসহ কিছু কারণে গত  ২০১৭ সালের মাঝামাঝি থেকে ঋণচাহিদা ব্যাপক বাড়তে থাকায় তারল্যের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এক অঙ্কের নিচে নেমে আসা ঋণের সুদহার বেড়ে দুই অঙ্কে উঠে যায়। অনেক ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত নিতে শুরু করে। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি ব্যাংক খাতের এডিআর কমিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি এক বৈঠক থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ এবং ৬ শতাংশ সুদে আমানত নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে আশানুরূপ হারে আমানত পাচ্ছে না অধিকাংশ ব্যাংক। বর্তমানে যেসব ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার উপরে রয়েছে, নানা উপায়ে তারা তা সমন্বয়ের চেষ্টার ফলে নতুন করে ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। এডিআর যেন বেড়ে না যায় সেজন্য লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোও সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে। সব মিলিয়ে ব্যাপক চাপে পড়ে ব্যাংকগুলো আগের মতো আর ঋণ বাড়াতে পারছে না।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মোট এলসি খোলা হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৯৬ কোটি ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৫৪০ কোটি ডলার। এ হিসাবে ১১ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক হাজার ১৪৪ কোটি ডলারের কম এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ১৭ শতাংশ কম। এর মধ্যে শুধু অন্যান্য খাতের এলসি কমেছে এক হাজার ১০১ কোটি ডলার। মূলত গত অর্থবছরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বড় অঙ্কের এলসি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, প্রক্রিয়াগত কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সরঞ্জাম আমদানির জন্য গত বছরের ২০ নভেম্বর সোনালী ব্যাংকে এক হাজার ১৩৮ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়। তবে চুক্তি মোতাবেক ওই এলসির পুরো দায় পরিশোধ করবে রাশিয়া। এ ছাড়া বন্যায় গত বছর প্রচুর ফসলহানি হয়। এবার ফসল উৎপাদন স্বাভাবিক থাকায় গত বছরের মতো চাল ও গম আমদানির চাহিদা নেই।

গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত চাল আমদানির জন্য মাত্র ছয় কোটি ৮২ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে খোলা হয় ১৯৮ কোটি ডলারের। চালের এলসি কমেছে ৯৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। গমের এলসি ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ১২৫ কোটি ডলারে নেমেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চিনির এলসি আগের অর্থবছরের ৭৭ কোটি ডলার থেকে ৫৬ কোটি ডলারে নেমেছে। পেঁয়াজের এলসি ৩৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে ২০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। ওষুধ, টেক্সটাইল ফেব্রিকস এক্সেসরিজ, কেমিক্যাল পণ্য, টিন প্লেট, পেপার ও পেপার বোর্ডের এলসি কমেছে। অনেক পণ্যের এলসি কমলেও ব্যাপকভাবে বেড়েছে সিমেন্টের কাঁচামালের। সিমেন্টের কাঁচামালের ২২৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ৭ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। তেলবীজের এলসি বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এ ছাড়া ডাল, দুগ্ধপণ্য, সুতা তৈরির সরঞ্জাম, সুতা, ওষুধের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্যের এলসি বেড়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads