• শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
৬ মাসের প্রস্তুতিতে হামলা

গুলশানের হলি আর্টিজান মামলার অভিযোগপত্র দাখিল

সংরক্ষিত ছবি

আইন-আদালত

৬ মাসের প্রস্তুতিতে হামলা

# চিহ্নিত ২১, অভিযোগপত্র ৮ জনের বিরুদ্ধে # গ্রেফতার ৬ আসামি, পলাতক ২ # বাদ পড়েছেন হাসনাত করিম # দেশকে অস্থিতিশীল করতেই হামলা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৪ জুলাই ২০১৮

রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার আগে ৬ মাস ধরে প্রস্তুতি নেয় হামলাকারীরা। গতকাল সোমবার পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে আলোচিত এই মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের পর এ কথা জানান পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম। জড়িত ২১ জনকে চিহ্নিত করে ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।

অভিযুক্তদের মধ্যে ৬ জন জেলে ও ২ জন পলাতক। বাকি ১৩ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে নিহত হওয়ায় অভিযোগপত্র থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ পড়েছেন হলি আর্টিজান থেকে জীবিত বের হওয়া বেসরকারি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক গ্রেফতার হাসনাত করিমও। তার বিরুদ্ধে হামলায় সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় অভিযোগ থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আদালতের জিআর শাখায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির এসি হুমায়ুন কবীর। এদিন নগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা ওই অভিযোগপত্র আদালতে পাঠিয়েছেন। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে চিহ্নিত ২১ জনের মধ্যে ৫ জন গুলশান হামলায় সরাসরি অংশ নেয়। বাকিরা হামলার পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র-বোমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিল।

হলি আর্টিজানের হামলার ঘটনায় মোট সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে ২১১ জনের। এর মধ্যে ১৪৯ জন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। এর বাইরে বিভিন্ন সংস্থার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অফিসার, ফরেনসিক টেস্ট যারা করেছেন তাদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এ ছাড়া ওই ঘটনায় ৭৫টি আলামত পাওয়া গেছে, যা আদালতে পাঠানো হয়েছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজানে জঙ্গিরা হামলা চালায়। তারা অস্ত্রের মুখে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। ওই রাতে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। ২ জুলাই সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হয়। পরে পুলিশ ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এক রেস্তোরাঁকর্মী।

কয়েক মাস আগে থেকে প্রস্তুতি : পুলিশ জানায়, হামলার অন্তত ৫-৬ মাস আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে হামলাকারীরা। হলি আর্টিজানকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে সিটিটিসি কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গিরা বিভিন্ন জায়গায় রেকি করেছিল। ছয় মাস আগে থেকে তাদের পরিকল্পনা ছিল। হলি আর্টিজানে প্রচুর বিদেশি নাগরিক খাওয়া-দাওয়া করতে আসতেন। এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায় ছিলই না। তাই এই রেস্টুরেন্টকে তারা বেছে নেয়। এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া যায় সহজে। এ ছাড়া ওইদিন ছিল শুক্রবার, ২৭ রমজান। বেশি সওয়াব পেতে তারা ওইদিন হামলা চালায়।’

তিনি বলেন, ‘সে অনুযায়ী তাদের নেতারা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা টার্গেট করেছিল, শহুরে ব্যাকগ্রাউন্ডের কিছু ছেলে লাগবে। সেই কারণে তারা চারজনকে বাছাই করে। একজনকে শোলাকিয়াতে কাজে লাগায়, বাকি তিনজন রোহান ইমতিয়াজ, মোবাশ্বির ও নিবরাস ইসলামকে হলি আর্টিজানে কাজে লাগায়। তাদের যেহেতু পূর্ব অভিজ্ঞতা কম, তাই গাইবান্ধায় একটি ক্যাম্পে কথিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ দেয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক অপারেশনে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পাঠায়। পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাকগ্রাউন্ডের যে দুজন রয়েছে- উজ্জ্বল ও পায়েল। তারা অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ। তাদেরকে এই তিনজনের সঙ্গে দেওয়া হয়।’

হামলার কারণ : পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল- দেশকে অস্থিতিশীল করা, যাতে করে সরকার চাপের মুখে পড়ে। পাশাপাশি বিদেশি জঙ্গি সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যও ছিল হামলাকারীদের।

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশকে অস্থিতিশীল করে জঙ্গিরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে, সরকারকে কোণঠাসা করতে, দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত করতে ও বিদেশি ক্রেতারা যেন চলে যায়- এসব কারণে হলি আর্টিজানে ওই হামলা চালানো হয়। এখানে সরাসরি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তবে জঙ্গিদের এই হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্য ছিল। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী থেকে প্রযুক্তিগত সুবিধা পেতে তারা হামলা চালিয়েছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘হামলাকারীরা ভেবেছিল বেশি বিদেশি হত্যা করলে আন্তর্জাতিকভাবে বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের দৃষ্টি আকর্ষণ হবে। এজন্য তারা হলি আর্টিজানকেই বেছে নেয়।’

অভিযোগপত্রে নাম আছে যাদের : পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, জীবিত আট আসামির মধ্যে ছয়জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে। তারা হলো- জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগান, রাশেদুল ইসলাম ওরফে র্যাশ, সোহেল মাহফুজ, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান এবং হাদিসুর রহমান সাগর। পলাতক দুই আসামি শহীদুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে গ্রেফতারি পরোয়ানা চাওয়া হয়েছে বলে জানান মনিরুল।

বাদ পড়া মৃত আসামিরা : হামলায় অংশ নেওয়া নব্য জেএমবির (জামা’আতুল মুজাহেদীন বাংলাদেশ) পাঁচ জঙ্গি নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল নিহত হয় ওই অভিযানে। হামলায় রেহান ইমতিয়াজ এবং খায়রুল ইসলাম পায়েল নেতৃত্ব দিয়েছিল বলে জানায় পুলিশ। পরে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে তামিম চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান, আবু রায়হান তারেক, সারোয়ার জাহান, বাসারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান নিহত হয়।

হামলার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরীকে। ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় পুলিশ সদর দফতর ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের জঙ্গিবিরোধী এক অভিযানে দুই সহযোগীসহ মারা যায় তামিম। পরিকল্পনায় অন্যতম সহযোগী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে সরোয়ার জাহান ওরফে আবদুর রহমানের নাম। ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর আশুলিয়ায় সারোয়ার জাহানের বাড়িতে র্যাব অভিযান চালালে পাঁচতলা থেকে পালাতে গিয়ে নিচে পড়ে নিহত হয় সরোয়ার। হামলাকারীদের আশ্রয় ও অর্থদাতা হিসেবে নাম এসেছে তানভীর কাদেরী ওরফে জামসেদের। ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুর এলাকায় সিটিটিসির এক অভিযানে নিহত হয় তানভীর। নূরুল ইসলাম মারজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীর সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চার্জশিটে। ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এক সহযোগীসহ নিহত হয় সে। বাশারুজ্জামান চকলেটও শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর সহযোগী হিসেবে হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে সিটিটিসির এক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয় সে। হামলায় অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহে মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজানের ভূমিকা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বাশারুজ্জামানের সঙ্গে একই দিন শিবগঞ্জে সিটিটিসির জঙ্গিবিরোধী অভিযানে মারা যায় মিজান।

হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে তদন্তে নাম এসেছে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া মেজর জাহিদুল ইসলামের। ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রূপনগরে সিটিটিসির জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয় জাহিদ। রায়হান কবির ওরফে তারেকও হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। তারেক ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে আট সহযোগীসহ নিহত হয়।

অব্যাহতি পেলেন হাসনাত : হামলার পরদিন সকালে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ থেকে গ্রেফতার নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমের নাম অভিযোগপত্রে আসেনি। অভিযানে নিহত হলি আর্টিজানের পাচক সাইফুল ইসলামকে শুরুতে সন্দেহের তালিকায় রাখা হলেও তার সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ তদন্তকারীরা পাননি। এ ছাড়া শাওন নামে একজনকে সন্দেহ করা হলেও তার বিরুদ্ধে হামলায় জড়িতের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে মনিরুল বলেন, ‘মামলার এজাহারের কলামে কোনো আসামির নাম ছিল না। বডিতে নাম ছিল। যাদের জীবিত উদ্ধার করেছি, এমন ১৭ জনের জবানবন্দি আদালতে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব আসামি জীবিত উদ্ধার হয়েছে, তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং আলামত যাচাই-বাছাই করে যাদের সম্পৃক্ততার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের নাম চার্জশিটে দেওয়া হয়েছে।’ হাসনাত করিমের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, নব্য জেএমবির একটি সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে এ হামলা করা হয়েছে। তাদের এই পরিকল্পনার কোথাও হাসনাত করিমের সম্পৃক্ততা পাইনি। যারা জীবিত গ্রেফতার হয়েছে, তাদের কথায়ও হাসনাতের নাম আসেনি। আমরা প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দির ওপর ডিপেন্ড করেছি এবং চার্জশিটে আদালতকে ব্যাখ্যা করেছি।’

২০১৬ সালের ২ জুলাই সকালে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ থেকে উদ্ধার করা জিম্মিদের মধ্যে ‘রহস্যজনক’ আচরণের কারণে হাসনাত করিমকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার কয়েক দিন পর হাসনাতকে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানানো হলেও তাকে আর ছাড়া হয়নি। একজন কোরিয়ান নাগরিকের গোপনে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর হাসনাতের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। সাবেক এই শিক্ষকের নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।

হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় ওই বছরের ৩ আগস্ট হাসনাতকে ৫৪ ধারায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। ৪ আগস্ট প্রথম দফায় তার আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ১৩ আগস্ট গুলশানে হামলার মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২৪ আগস্ট জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। তিনি বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে রয়েছেন। ঢাকার বনানীর ব্যবসায়ী প্রকৌশলী রেজাউল করিমের ছেলে হাসনাত করিম মেয়ের জন্মদিন উদযাপনের জন্য ওই বছরের ১ জুলাই সপরিবারে হলি আর্টিজানে গিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads