• রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬
ads
ছয় বছরেও শুরু হয়নি মামলার বিচারকাজ

ছবি: সংগৃহীত

আইন-আদালত

যুবলীগ নেতা মিল্কি হত্যা

ছয় বছরেও শুরু হয়নি মামলার বিচারকাজ

  • এমদাদুল হক খান
  • প্রকাশিত ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রাজধানীর গুলশানে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যা মামলার বিচারকাজ গত ছয় বছরেও শুরু হয়নি। হাইকোর্টের আদেশের অপেক্ষায় চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার বিচারকাজ বন্ধ হয়ে আছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে এই মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে ২০১৫ সালের অক্টোবরে। পরে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করতে গেলে তারা এর বিরোধিতা করে হাইকোর্টে যাওয়ার কথা বলে। এরপর থেকেই থমকে যায় এই মামলার কার্যক্রম।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রাতে গুলশানে শপার্স ওয়ার্ল্ড নামে একটি বিপণিবিতানের সামনে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই বিপণিবিতানের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওচিত্র দেখে মিল্কির একসময়ের সহযোগী যুবলীগের আরেক নেতা জাহিদ সিদ্দিকী তারেকসহ ভাড়াটে কিলাররা তাকে হত্যা করে বলে নিশ্চিত হন পুলিশ কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় মিল্কির ছোট ভাই রাশেদুল হক খান বাদী হয়ে গুলশান থানায় এজাহার নামীয় ১১ জন এবং অজ্ঞাত আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারভুক্ত ১১ আসামির মধ্যে হত্যাকারী জাহিদ সিদ্দিকী তারেকসহ সাতজনকে আটক করে পুলিশ। ফরচুন হাসপাতাল থেকে গুলশান থানায় নেওয়ার পথে তারেকের সহযোগীরা র্যাবের গাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে উভয়পক্ষের গুলি বিনিময়কালে তারেক ও তার সহযোগী শাহ আলম নিহত হন। আটকদের মধ্যে মিল্কি হত্যার দায় স্বীকার করে ছয়জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

এ ঘটনায় ২০১৪ সালের অক্টোবরে ১২ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে র্যাব। তদন্তকারী কর্মকর্তা র্যাব-১-এর সহকারী কমিশনার কাজেমুর রশিদ ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট তারেক মইনুল ইসলাম ভূঁইয়ার আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত যুবলীগ নেতা এইচএম জাহিদ সিদ্দিকী তারেককে প্রধান আসামি করা হয়। অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত অন্য ১১ আসামি হলো— সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, ফাহিমা ইসলাম লোপা, মো. জাহাঙ্গীর মণ্ডল, শহীদুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম ওরফে হাবিব, মো. সোহেল মামুন, চুন্নু মিয়া, আরিফ, ইবরাহীম খলিল, রফিকুল ইসলাম এবং শরীফুদ্দিন চৌধুরী। অভিযোগপত্র থেকে মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও যুবলীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহেদুল ইসলাম আরিফসহ নয়জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জাহিদুল ও ওয়াহেদুল মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। এ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি দেন বাদীপক্ষ।

তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটিকে ভিন্ন দিকে প্রভাবিত করতে মূল আসামিদের নাম অভিযোগপত্রে উল্লেখ না করায় ২০১৪ সালের ৯ জুন মামলার বাদী ও নিহত মিল্কির ভাই রাশেদ হক খান মিল্কি মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে দেওয়ার আবেদন করেন। ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ তারেক মঈনুল ইসলাম ভূঁইয়া ২০১৪ সালের ১৭ জুন আবেদন মঞ্জুর করে সিআইডিকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।

নিহত মিল্কির ভাই কায়ছার মিল্কী ওই সময় বলেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে কয়েকজন আসামির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। একটি পক্ষ এ মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা এ অভিযোগপত্র মানি না।

কায়ছার মিল্কী বলেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে জাহিদুল ও ওয়াহেদুলকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমার ভাই হত্যার পরিকল্পনায় ছিলেন জাহিদুল। আর ঘটনার সময় আশপাশে ছিলেন ওয়াহেদুল। অথচ তাদের নাম বাদ দেওয়া হলো। আমরা ধরে নেব, যারা তাদের নাম বাদ দেওয়ার কলকাঠি নেড়েছে, তারাও আমার ভাই হত্যায় জড়িত। ভবিষ্যতে তারাও এ মামলার আওতাভুক্ত হতে পারে।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার উত্তম কুমার বিশ্বাস ১৮ জনকে আসামি করে ঢাকার সিএমএম আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আগের অভিযোগপত্রের ১১ আসামির সঙ্গে আরো সাতজনকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। আর অভিযোগপত্রে ৯ জনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। চঞ্চলসহ চারজনকে পলাতক দেখিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়। অভিযুক্ত ১৮ আসামি হলো— সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে হাবিব, মো. সোহেল মাহমুদ ওরফে সোহেল ভূঁইয়া, মো. চুন্নু মিয়া, মো. আরিফ ওরফে আরিফ হোসেন, মো. সাহিদুল ইসলাম, মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ, মো. জাহাঙ্গীর মণ্ডল, ফাহিমা ইসলাম লোপা, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, মো. শরীফ উদ্দিন চৌধুরী ওরফে পাপ্পু, তুহিন রহমান ফাহিম, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রকাশ রুমী, মোহাম্মদ রাশেদ মাহমুদ ওরফে আলী হোসেন রাশেদ ওরফে মাহমুদ, সাইদুল ইসলাম ওরফে নুরুজ্জামান, মো. সুজন হাওলাদার, ডা. দেওয়ান মো. ফরিউদ্দৌলা ওরফে পাপ্পু ও মো. মামুন-উর রশীদ। এদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, মো. আরিফ ওরফে আরিফ হোসেন, মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ ও রফিকুল ইসলাম চৌধুরীকে পলাতক দেখিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়। অব্যাহতিদানের সুপারিশের ৯ আসামি হলো— এস এম জাহিদ সিদ্দিক তারেক ওরফে কিলার তারেক, মো. মাহবুবুল হক হিরক, জাহিদুল ইসলাম টিপু, আবুল মোনায়েম মোহাম্মদ আমিনুল এহসান বাবু ওরফে টমেটো বাবু ওরফে ডিশ বাবু, এনামুল হক, মাসুম উদ্দিন, আহকাম উল্লাহ, ওয়াহিদুল আলম প্রকাশ আরিফ ভূঁইয়া ও তানজিম মাহমুদ তানিম।

ঢাকা মহানগর জজ আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সিআইডি অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর চাঞ্চল্যকর এই মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালত বলে, আমরা হাইকোর্টে যাব। এর পর থেকেই এ মামলার বিচারকাজ বন্ধ হয়ে আছে। গত ২০ মার্চ এ মামলার শুনানির তারিখ থাকলেও হাইকোর্টের আদেশ না আসায় সাক্ষীদের উপস্থিত হতে সমন দিতে পারেনি আদালত।

মামলার বাদী ও নিহত মিল্কির ভাই রাশেদ হক খান বলেন, আমরা এ হত্যা মামলার ন্যায়বিচার নিয়ে সন্দিহান। আসামিরা ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ও প্রভাবশালী হওয়ায় বারবার মামলাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। ফলে ছয় বছরেও চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিচারকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads