• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬
ads

আইন-আদালত

উইলসছাত্রী রিশা হত্যা

শেষ পর্যায়ে মামলার বিচারকাজ

  • এমদাদুল হক খান
  • প্রকাশিত ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শেষ পর্যায়ে রয়েছে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আলোচিত সুরাইয়া আক্তার রিশা হত্যা মামলার বিচারকাজ। ইতোমধ্যে চাঞ্চল্যকর এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পরই ঘোষণা করা হবে আলোচিত এ মামলার রায়। বাদীপক্ষের প্রত্যাশা, সর্বোচ্চ শাস্তি হবে রিশা হত্যাকাণ্ডে জড়িত বখাটে ওবায়দুল হকের।

২০১৬ সালের গত ২৪ আগস্ট উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সামনের ফুটওভার ব্রিজে বখাটে ওবায়দুলের ছুরিকাঘাতে আহত হয় রিশা। পরে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির চার দিন পর ২৮ আগস্ট সকাল পৌনে ৯টার দিকে রিশা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ওই ঘটনায় রিশার মা তানিয়া বেগম রমনা থানায় ওবায়দুলকে আসামি করে মামলা করেন। পরে ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর নীলফামারীর ডোমার উপজেলা থেকে ওবায়দুল হক খানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হত্যার দায় স্বীকার করে ৫ সেপ্টেম্বর আদালতে জবানবন্দিও দেয় ওবায়দুল।

আদালত সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওবায়দুল বলেছে, তার নাম ওবায়দুল হক। পিতার নাম মৃত আবদুস সামাদ, সাং মিরাটঙ্গী, থানা বীরগঞ্জ, জেলা দিনাজপুর। সে বৈশাখী টেইলার্স, ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেট (৩য় তলায়), এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, ঢাকা-এর টেইলার মাস্টার হিসেবে দুই বছর ধরে কর্মরত। প্রায় এক বছর আগে সুরাইয়া আক্তার রিশা ও তার মা কাপড় বানানোর জন্য তার টেইলার্সে গেলে তাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রথম দেখাতে সুরাইয়া আক্তার রিশাকে তার পছন্দ হয়। এর ২/৩ দিন পর সে রিশার মায়ের কাপড়ের মাপ জানার অজুহাতে তার কাছে থাকা রিশার মায়ের মোবাইল নাম্বারে ফোন দেয়। ফোন রিশা ধরলে তার সঙ্গে ওবায়দুলের কথা হয়। ওবায়দুল জানতে পারে, ওই ফোন নম্বরটি রিশা ব্যবহার করে। এরপর থেকে ওবায়দুল প্রায়ই রিশার মোবাইলে ফোন দিতে থাকে।

জবানবন্দিতে ওবায়দুল বলে, সুরাইয়া আক্তার রিশার সঙ্গে দেখা হওয়ার ২ মাস পরে আমি মোবাইলের মাধ্যমে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিই। এর কিছুদিন পর রিশা আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে আমি রিশার আম্মাকে ফোন দিয়ে বলি যে, রিশার সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক আছে। তখন রিশার আম্মা আমাকে রিশার সঙ্গে যোগাযোগ করতে নিষেধ করে। আমি তার নিষেধ না শুনে রিশার মোবাইলে কল দিলে রিশার আম্মা ও দাদি ফোন রিসিভ করে আমাকে গালিগালাজ করত। ৩/৪ মাস আগে রিশা আমার মোবাইল নম্বর ব্লক করে দেয় জানিয়ে ঘাতক ওবায়দুল বলে, এজন্য কয়েক মাস আমি সুরাইয়া আক্তার রিশার সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ করে কথা বলতে ব্যর্থ হই। আমি রিশার সঙ্গে কথা বলার জন্য বেশ কয়েকবার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সামনে যাই এবং তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু বলতে ব্যর্থ হই। এর মধ্যে একদিন আমি তার সঙ্গে জোর করে কথা বলতে চাইলে রিশা আমাকে জানায় যে, সে আমার সঙ্গে প্রেম করবে না। ইতোমধ্যে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে, অন্য একটি ছেলের সঙ্গে রিশার প্রেমের সম্পর্ক আছে। এই কথা জানার পর আমার ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওবায়দুল বলে, ‘রিশা যাতে অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক করতে না পারে সেজন্য আমি তাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করি। গত ২২ আগস্ট ২০১৬ সালে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় আমি বাংলাদেশ হার্ডওয়্যার অ্যান্ড পেইন্ট সাপ্লাই নামক দোকান হতে ১২০ টাকা দিয়ে একটি ছুরি কিনি। রিশাকে মারার জন্য গত ২৪ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার সময় আমি ছুরিসহ কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। বেলা আনুমানিক সাড়ে ১২টার সময় রিশা তার কয়েকজন সহপাঠীসহ স্কুল থেকে বের হয়ে ফুটওভার ব্রিজের ওপর ওঠে।’

রিশাকে আক্রমণ করার বর্ণনা দিয়ে ওবায়দুল বলে, ‘আমি রিশার কাছে গিয়ে আমার কাছে থাকা ছুরি দিয়ে রিশার পেটের বাম পাশে সজোরে আঘাত করে ছুরিসহ ফুটওভার ব্রিজের নিচে নেমে দৌড়ে ব্যাটারি গলি দিয়ে সেগুনবাগিচা রাজস্ব ভবনের সামনে যাই। রাজস্ব ভবনের সামনে রাস্তার ফুটপাতে ইট-সুরকি ও ময়লার মধ্যে ছুরিটি ফেলে দিয়ে পল্টন হয়ে গুলিস্তান যাই। সেখান থেকে সদরঘাট গিয়ে নদী পার হয়ে কেরানীগঞ্জে চাচাতো ভাই জসিমের কাছে যাই। ওইদিন বিকাল বেলা কেরানীগঞ্জ হতে কোনাপাড়ায় আমার পরিচিত টেইলার্স মাস্টার সুনীল ও গৌর হরিদের কাছে গিয়ে ১ হাজার টাকা নিই। তারপর আমি শ্যামলী গিয়ে হানিফ পরিবহনে করে নিজ বাড়িতে যাই। এরপর টিভিতে রিশা মারা যাবার খবর শুনে আমি নীলফামারীতে আমার বেয়াই খুশবুলের কাছে যাই। সংবাদ পেয়ে পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে রমনা থানায় নিয়ে আসে।’

২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলী হোসেন ওবায়দুল হককে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে ২৬ জনকে সাক্ষী করা হয়। ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল চাঞ্চল্যকর এই মামলায় ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবুল কাশেম এই একমাত্র আসামি ওবায়দুল হকের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অভিযোগ গঠন করেন। এরপর ২৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীসহ ২০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর এই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেছে আদালত। যুক্তিতর্ক শেষেই এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাহমিদা আক্তার বলেন, মামলার বিচারকার্য শেষ পর্যায়ে। দুয়েক মাসের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় দেওয়া হবে। তিনি বলেন, আরো আগেই এ মামলার রায় হয়ে যেত। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী সময়ক্ষেপণ করার কারণে মামলাটির বিচারকাজ শেষ হতে প্রায় ৩ বছরের মতো সময় লেগে গেছে।

রিশার বাবা রমজান আলী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, গত ২৮ আগস্ট আমার মেয়ের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হলো। এদিন তার আত্মার শান্তির জন্য কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এখন আদালতের দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের প্রত্যাশা খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads