• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য

মানুষ সাহিত্যের ভেতর স্বপ্ন খুঁজে বেড়ায়

আর্ট : রাকিব

সাহিত্য

জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য

  • প্রকাশিত ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জাকির আবু জাফর

সাহিত্য কার কথা বলে? এ প্রশ্ন সাম্প্রতিক নয়। আদিকালের। আদিকাল বলতে সাহিত্যের সূচনাকাল থেকেই। যখন থেকে সাহিত্যের যাত্রা শুরু, তখনো এমন প্রশ্ন ছিল। আছে আজো। হয়তো যতদিন সাহিত্য থাকবে পৃথিবীর বুকে, এ প্রশ্নও থেকে যাবে তার সাথে সাথে। থেকে যাবে কারণ সাহিত্য যাদের কথা বলে, তার তো কোনো নির্দিষ্টতা নির্বাচিত হয়নি। হয়নি কোনো সীমাবদ্ধতার সম্পৃক্তি। যেহেতু নির্দিষ্টতা এবং সীমাবদ্ধতা নির্ণয় করা যায়নি অথবা যায় না, সেখানে প্রশ্ন তো থাকবেই। এবং সে কারণেই থাকছে। সাহিত্য কার কথা বলে এটা যেমন প্রশ্ন, তেমনি সাহিত্য কার কথা বলে না এটাও একটি প্রশ্ন। সত্যি তো, সাহিত্য কার কথা বলে না! সাহিত্যের বিষয় কি কোনো নির্দিষ্টতায় নিমজ্জিত! এ প্রশ্নের জবাব হবে— নিশ্চয়ই না। যদি না হয়ে থাকে তবে অনির্দিষ্টতাকেই হ্যাঁ বলবে। অর্থাৎ সাহিত্য কোনো একটি বিষয়ে অথবা একজনের কথা শুধু নয়, অনেক বিষয়ে এবং অনেকের কথাই বলে। বোধহয় সে কারণেই সাহিত্যে এত বৈচিত্র্য! এত আনন্দ! অথবা এত বেদনার ঘনঘটা।

জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য বলে একটি কথা আছে। অর্থাৎ যে সাহিত্য জীবনের সঙ্গে জড়িত। অথবা জীবন নিয়ে যে সাহিত্য রচিত, তা-ই জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য। তাহলে সাহিত্য কার কথা বলে? এ কথার জবাবে বলাই তো যায়— সাহিত্য জীবনের কথা বলে। জীবনকে নিয়েই সাহিত্যের ছড়াছড়ি। সাহিত্যের পথ চলা। জীবন ছাড়া সাহিত্যের জীবন পাওয়া হয়তো দুষ্কর। হয়তো বলছি এ কারণে, এ নিয়ে যথেষ্ট তর্ক রয়েছে। তর্কটি সাহিত্য জীবনঘনিষ্ঠ হবে, নাকি শুধু সাহিত্যের প্রয়োজনে সাহিত্য হবে। পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসে এ নিয়ে দেশে দেশে কালে কালে সাহিত্যিকরা বিভক্ত জবাব দিয়েছেন। কেউ এর পক্ষে উক্তি করেছেন। কেউ দাঁড়িয়েছেন বিপক্ষে। বিপক্ষে যারা তাদের বক্তব্য, সাহিত্য কেন শুধু জীবনঘনিষ্ঠতায় জড়িত থাকবে। সাহিত্য তো এর বাইরেও থাকতে পারে। এবং থাকেও। সুতরাং শিল্পের জন্য শিল্প তো হতেই পারে। এমন যুক্তি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জীবনঘনিষ্ঠতা ছাড়াও সাহিত্য নির্মাণ করা যায়। সৃষ্টি করা যায়। তবে জীবনঘনিষ্ঠতা না থাকলে সে সাহিত্যের শেষ গন্তব্য হয়তো থাকে না— এমন কথা বলে থাকেন অনেকেই। অর্থাৎ যে সাহিত্য শুধু সাহিত্যের প্রয়োজনেই রচিত হয়, তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিংবা প্রয়োগের ক্ষেত্র খুব সীমিত হয়ে যায়। সীমিত এ কারণে তার ব্যবহারের ক্ষেত্র সর্বজনীন হতে পারে না। এবং হয়ও না। সর্বজনীন হতে না পারা মানে তাকে সীমাবদ্ধতার জলরাশিতে জমে থাকতে হয়। সীমাবদ্ধতা সাহিত্যের আনন্দ খর্ব করে। তাকে সর্বত্র করে তোলার সামর্থ্য থাকে না। ফলে এ সাহিত্যের প্রয়োজনও সীমিত হয়ে যায়। কখনো কখনো ফুরিয়ে যায় এর আবেদন। যে সাহিত্যের আবেদন ফুরিয়ে যায়, তাকে মহাকাল মৃত্যুহীন করার কাজ করে না। কাল তাকে বহন করে না। তবে এটা যে সর্বত্র সত্য এবং সবসময় সত্য এমনও কিন্তু নয়। সময় যেমন পরিবর্তনশীল, মানুষের প্রয়োজনও তেমনি বিভিন্ন। একই সঙ্গে মানুষের মনও কিন্তু কখনো এক জায়গায় স্থির থাকতে চায় না। এক স্থানে স্থির থাকে না। সে নিয়ত বিবর্তিত। পরিবর্তিত। এবং সবসময় নতুন সন্ধানে ব্যস্ত। সুতরাং মন যাকে গ্রহণ করে, সে তো বেঁচে যায়। মন কখন কাকে কীভাবে গ্রহণ করে বা করবে, এ তো আর বলা যায় না। তা মনই বলতে পারে কেবল। মনের ওপর তো আর জোর খাটানো চলে না। মনকে মনের ওপর ছেড়ে দিতে হয়। কেননা মনের সঙ্গে কোনো রশি বা শেকলের যোগ নেই, যা ধরে টান দেওয়া চলে। বরং সব বন্ধনমুক্তির গান করে মন।

জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্য পৃথিবীকে জয় করে রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ তার জীবনের বাইরের বিষয় নিয়ে খুব মাথা ঘামায় না। ঘামায় না কারণ মানুষের সব চিন্তাভাবনা তার পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে। মানুষ স্বপ্ন দেখে এটা সত্য। আবার স্বপ্নটা তো তার জীবনকে ঘিরেই দেখে। জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা ঘিরেই থাকে স্বপ্নের জগৎ। সম্ভাবনার সবকিছু সেই জীবনকে নিয়েই। আশা-নিরাশার কাহিনীও জীবনের বাইরের কিছু নয়। পাওয়া না পাওয়ার আনন্দের কথা তাও জীবনভর করেই। সুতরাং জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যের চাহিদা আদি থেকেই বয়ে চলছে।

জীবন মানে এক আশ্চর্যরকম প্রবাহ, যা ছুটে চলে অবাক রহস্যের ভেতর দিয়ে। এ রহস্য এমন এক রহস্য, যা ভেদ করার সাধ্য সবার থাকে না। কারো কারো ঘ্রাণেন্দ্রিয় তীক্ষতায় জেগে থাকে। তারা যৎকিঞ্চিত জীবনকে তার রহস্যের ভেতর আবিষ্কার করার আনন্দে মেতে ওঠেন। যারা এ আনন্দ স্পর্শ করে, তারা থেকে যান পৃথিবীর উদ্যানে। তারা ফুল ফোটান। তারা সৌরভ ঢালেন বাতাসের শরীরে। বাতাস সে সৌরভ নিয়ে বয়ে যায় পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে। সুতরাং জীবনঘনিষ্ঠতা সাহিত্যের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। জীবনের ফুল ফোটানোর আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি মানুষের গভীরে লুকিয়ে থাকে। কেউ জানে, কেউ জানে না এ খবর। যারা যেনে যায়, তাদের কর্মের পরিধি দীর্ঘ হয়ে ওঠে। তারা জীবনকে অন্য অর্থে নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতিতে পথ মাড়ায়। তারা নিজের দিকে ফেরে বার বার। তারা জানে জীবন একটাই। এই এক জীবনে অর্থপূর্ণ আনন্দ তাকে নির্মাণ করতেই হবে। এ আনন্দ হতে হবে সবার। হতে হবে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের। নিজেকে আবিষ্কার করার মহত্ত্ব লুকিয়ে আছে এখানেই।

মানুষ সাহিত্যের ভেতর স্বপ্ন খুঁজে বেড়ায়। খোঁজে আশা ও আনন্দের নুড়ি। মানুষ জানে সাহিত্যই তার আনন্দ জোগাবে। তার বেদনার ভার বহন করবে। বেদনার উপশমও খুঁজে পাবে সাহিত্যের ভেতর। যদি সাহিত্য জীবনঘনিষ্ঠ না হয়, সে কী করে জীবনের স্বপ্ন তুলে ধরতে সক্ষম হবে! প্রেমই জীবনের মূল কথা। প্রেমের বাইরে জীবনের যে অস্তিত্ব, তার সৌন্দর্য থাকে না। তার গাম্ভীর্য থাকে না। তার মুক্তিও থাকে না। প্রেম ছাড়া জীবনে কোনো মুক্তি নেই। এ প্রেম শুধু নারী-পুরুষে হবে তা কিন্তু নয়। কাজের সঙ্গেও প্রেমের বন্ধন চিরন্তন। যে কাজে প্রেমের স্পর্শ নেই, প্রেমের ছোঁয়া নেই- সেই কাজের সৌন্দর্যও নির্মিত হতে পারে না। প্রেমের সৌন্দর্য জীবনকে মহিমান্বিত করে। জীবনকে উদ্বোধিত করে। অর্থপূর্ণ করে জীবনের সব আনন্দকে। সাহিত্যে এসব ধারণ করতেই হবে। প্রেমের কথা, ভালোবাসার কথা সাহিত্য কেন বলবে না? কেন বলবে না জীবনের ব্যর্থতা ও সাফল্যের কাহিনী? কেন জীবনের সৌহার্দ্যকে সম্পূর্ণতার সুখে ভরে দেবে না।

সাহিত্যের জন্য সাহিত্য হতেই পারে। হয়ও। হয়ে আসছে সাহিত্যের সূচনাকাল থেকে। সাহিত্যের জন্য সাহিত্য যা হয়, তা চিরকালীন হতে ব্যর্থ হয়। কেননা মানুষের সমসাময়িক আবেদন ক্ষণস্থায়ী। আর জীবনাবেদন চিরস্থায়ী। ফলে ক্ষণস্থায়ী বিষয়-আশয় চিরস্থায়ী হবে কেমন করে? আবার জীবন যেহেতু চিরস্থায়ী আবেদনের দিকে ঝুঁকে থাকে, তাই তার ব্যবহারও চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যের আবেদনও তাই চিরকালীন।

জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যের মূল্য সবসময়ই ছিল বেশি। আজো তা বহমান। এর আবেদন কমবে না কখনো। বরং বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষতায় মানুষ জীবনকে আরো তীব্রভাবে উপলব্ধি করার অবকাশ পাবে। যান্ত্রিকতা কতটা নির্মোহ তা বোঝার ক্ষেত্রে আর কারো সন্দেহ নেই। কখনো কখনো যান্ত্রিক বিষয়াদি নির্মমতায় পর্যবসিত হয়। এ নির্মমতা কখনো জীবনকে স্নিগ্ধতায় জাগিয়ে দিতে পারে না। পারে না বলেই জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যের এত মূল্য।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads