• বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ৪ মাঘ ১৪২৪
কীভাবে বই এলো

কালের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সবচেয়ে পুরনো বই

ছবি : সংগৃহীত

সাহিত্য

কীভাবে বই এলো

  • মাসুদুজ্জামান
  • প্রকাশিত ১২ জানুয়ারি ২০১৯

জার্নাল জনান্তিকে এর আগে লিখেছিলাম, বই আমাদের মানবিক করে তোলে। বলেছিলাম, কীভাবে হঠাৎ করে বইয়ের সাহচর্য জুটেছিল আমার। সেই যে ছোট্ট একটা লাইব্রেরি — উডহেড পাবলিক লাইব্রেরি, ছোটোই তো। কিন্তু কী সম্মোহন তার। কীভাবে যেন আমাকে বদলে দিতে থাকে। তো যে বই-ই হোক, আমি হাতে তুলে নিতে দ্বিধা বোধ করি না। এখন অবশ্য শুধু ছাপা বই নয়, ইবুকের যুগ এসে গেছে। এসে গেছে অডিও বুকের যুগ। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে বইয়ের ইতিহাসের কথা। বইয়ের জন্য মানুষের পিপাসা অদম্য বলেই মানুষ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে চমৎকার সব বই প্রকাশ করে চলেছে।
শুরু হয়েছিল সেই প্রাচীন কালে, পাথর খোদাই করা লেখা দিয়ে। আসলে লেখার যখন থেকে প্রচলন শুরু, মানুষ তখনই চেয়েছিল লেখাকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার কথা। উদ্ভাবন করেছিল সেই প্রক্রিয়া। পাথরে খচিত করে সূচনা ঘটানো হয়েছিল এর। পরে কাঠখোদাই করেও লেখাকে সংরক্ষণের চেষ্টা করে মানুষ। এ ছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতক থেকে চতুর্থ শতকের কথা। কিন্তু পাথরে বা কাঠে খোদাই করা লেখা তো সহজে ব্যবহারযোগ্য অথবা বহনযোগ্য হতে পারে না, ফলে মানুষ নতুন নতুন উপায় খুঁজতে শুরু করে। এরই এক পর্যায়ে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মেসোপটেমিয়ার মানুষ আবিষ্কার করে মাটির টুকরোর গায়ে লেখার রীতি। মাটিকে কাদার মতো নরম করে নিয়ে তার গায়ে নিজের কথা লিখতে শুরু করে তারা। এরপর তা আগুনে শুকিয়ে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে। এভাবেই সূচনা ঘটে বইয়ের। প্রত্নতত্ত্ববিদরা একটা জায়গায় এরকম প্রায় ২২ হাজার মাটির বই খুঁজে পেয়েছেন। এসব বই তৈরি করা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে। সংরক্ষিত ছিল আসিরিয়ার একটা পাঠাগারে। এরপর প্রাচীন মিসরে কাগজের পূর্বসুরি হিসেবে আবিষ্কৃত হয় প্যাপিরাসের মতো একধরনের কাগজ। ইতিহাস বলছে, খ্রিস্টপূর্ব দু হাজার চারশো বছর আগে এই প্যাপিরাস দিয়ে বই লেখা হতো। কলম হিসেবে ব্যবহার করা হতো পাখির পালক। ছোট ছোট পাতার সমষ্টি যে বইয়ের সঙ্গে আমরা এখন পরিচিত, সেই ধরনের বই তখনও মিসরীয়রা আবিষ্কার করতে পারেনি। প্যাপিরাসের বইগুলো ছিল চাদরের মতো দীর্ঘ, সর্বোচ্চ ১০ মিটারের মতো লম্বা। ফলে তা মুড়িয়ে রাখা হতো। পড়বার সময় একটু একটু করে খুলে খুলে পড়তে হতো। মিসরের অনেক প্রাচীন মন্দিরে এই ধরনের বই সংরক্ষিত আছে।
এশিয়ায় অবশ্য লেখার প্রচলন হয়েছিল আরও আগে, বিশেষ করে চীনে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে প্রাণীর হাড়, শামুকের খোল, কাঠ আর সিল্কের কাপড়ে বই লেখা হতো। এরপর চীনারাই খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে কাগজ আবিষ্কার করে, প্যাপিরাসের তুলনায় যা ছিল অনেক উন্নত। কাঠের ব্লক ব্যবহার করে একসঙ্গে অনেক বই উৎপাদনের প্রক্রিয়াও আবিষ্কার করেছিল তারা। চীনারাই প্রথম বই ছাপার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এবং প্রথম বই চীন থেকেই প্রকাশিত হয়। ট্যাং রাজবংশের রাজত্বকালেই (৬১৮-৯০৭ খ্রিস্টাব্দ) এটা ঘটে, তবে ঠিক কোন সালে প্রথম বই বেরিয়েছিল সেটা জানা যায়নি। রোমেও খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে লাতিন ভাষায় বই ছাপা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকেরা উল্লেখ করেছেন। সেখানেই প্রথম শুরু হয় বইয়ের বাণিজ্য। রোম সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই ব্যবসা। ইতিহাস থেকে আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়। ব্যক্তিগত বা গণপাঠাগার স্থাপন করাকে সেকালে গৌরবজনক কাজ বলে মনে করা হতো। জুলিয়াস সিজারের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রোমে একটা গণপাঠাগার স্থাপন করেছিলেন। ৩৭৭ খ্রিস্টাব্দে শুধু রোমেই প্রতিষ্ঠিত ছিল ২৮টি গণপাঠাগার।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, কাগজের আবিষ্কারই বই প্রকাশনার পথকে সহজ করে দেয়। হ্যান রাজত্বের কালে ১০৫ খ্রিস্টাব্দে চীন প্রথম কাগজ আবিষ্কার করে। চীনেই বাণিজ্যিকভাবে কাগজ উৎপাদন শুরু হয়। তেরোশ শতকে ইউরোপ এই প্রযুক্তির অধিকারী হয়। মধ্যযুগের ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় অসংখ্য পাঠাগার। তবে বারোশ শতকের পূর্বপর্যন্ত ব্যাপকভাবে বই প্রকাশ শুরু হয়নি। চীন থেকে আরবদের মাধ্যমে এগারোশ আর বারোশ শতকে স্পেনে কাগজ এসে পৌঁছায়। এর মাত্র একশ বছর পরে ১৪৪০ সালে জার্মানির গুটেনবার্গ যন্ত্রচালিত ছাপাখানা আবিষ্কার করেন। বইয়ের প্রকাশনা এরই সূত্র ধরে শিল্পবিপ্লবের অংশ হয়ে ওঠে। এভাবেই একটি বা কয়েকটি বই হাতে লিখে প্রকাশ করা যুগের অবসান ঘটে, খুব দ্রুত ইউরোপজুড়ে ব্যাপক হারে বই প্রকাশ শুরু হয়ে যায়। আঠারো শতকে স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রকাশনা জগতে বৈপ্লবিক যুগের সূত্রপাত ঘটে।
এর পরের ইতিহাস তো প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইতিহাস। বিশ শতকে এসে ঘটে সেই যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৯০ দশকের দিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটলে বই প্রকাশ খুবই সহজ এবং ব্যাপক হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন আমরা পাচ্ছি ই-বুক, ঝকঝকে ছাপা বই। ই-বুক আবার কাগজে প্রকাশিত হয় না, কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে ডিজিটাল আকারে প্রকাশিত হয়। একটা মূল ডিজিটাল পাণ্ডুলিপি তৈরি করে প্রায় বিনা পরিশ্রমে ঠিক মূল কপির মতো লাখ লাখ কপি করা যায়। বিশ্বব্যাপী ছড়ানো অন্তর্জাল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায় বা পাঠানো যায়। কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কে বা ট্যাবে খুব সামান্য জায়গা নেয় বলে সামান্য শক্তির একটা কম্পিউটারে বা ট্যাবে হাজার হাজার ই-বুক সংরক্ষণ করা যায়। কম্পিউটার বা ট্যাব থাকলে বইগুলো পড়াও যায় খুব সহজে। তবে ছাপা বই পড়ার যে সুবিধা তা এই ধরনের বই থেকে পাওয়া যায় না। তবু ই-বুকের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ বাড়ছে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০১১ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে সে দেশে ই-বুকের চাহিদা ১৬৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু যাদের আর্থিক সংগতি নেই তারাই গণপাঠাগার থেকে বই ধার করে নিয়ে পড়ে। অন্যেরা, যাদের সংগতি আছে, তারা ইন্টারনেটে ই-বুক কিনছে, ফলে ই-বুক বিক্রির পরিমাণও দিন দিন বাড়ছে। তবে উন্নত দেশগুলোতে যা-ই ঘটুক, আমাদের দেশে ছাপা বইয়েরই প্রাধান্য আরও বেশ কিছুকাল অক্ষুণ্ন থাকবে বলেই মনে হয়। বাংলায় সেইভাবে এখনও ই-বুক প্রকাশ শুরু হয়নি; হলে হয়তো বর্তমান প্রজন্ম ই-বুকের প্রতি ঝুঁকতে পারে, যেভাবে তারা ঝুঁকেছে ফেসবুকের মতো সোসাল মিডিয়া বা ব্লগের প্রতি। আমার ধারণা, ছাপা বই বাংলাদেশে অদূর ভবিষ্যতে খুব বেশি সংকটে পড়বে বলে মনে হয় না। প্রতিবছর বাংলা একাডেমির বইমেলায় যে পরিমাণ ছাপা বই বিক্রি হয়, তাতে এই শঙ্কার কোনো কারণ নেই।
শুরু করেছিলাম ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা দিয়ে। কীভাবে বইপড়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম আমি, কীভাবে উডহেড পাবলিক লাইব্রেরি আমার স্মৃতিসত্তায় আজও মিশে আছে। পরিশেষে একথা বলে শেষ করবো যে, বই শুধু জ্ঞানের উৎস নয়, বই আমাদের জীবনকে বদলে দেয়, আমাদেরকে মানবিক অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। আসুন আমরা সবাই বই কিনি, বই পড়ি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads