• মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৪
ads

সাহিত্য

একুশে ফেব্রুয়ারি দ্বৈপায়ন এবং দিকসঞ্চারী মাস্তুল

  • শহীদ ইকবাল
  • প্রকাশিত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

হাতে নিই, বুলিয়ে দেখি, আবেগের কামড়ে হয়ে উঠি এক ছিন্নবাঁধা পলাতক, হাসান হাফিজুর রহমানকে জেনে রাখি— পরম ধারণায়— এই একটি গ্রন্থের জন্য, হয়ে উঠি গর্বেভরা মানুষ। আমরা এক সময় চকচকি মার্বেলের জীবন দেখেছি, ভোরের শিশিরের ঘাসডগা দেখে অশ্রুপাত করেছি, কামিনী-যুথি আর কাঠগোলাপের ভারে নতজানু হয়েছি, সময়টুকু এই জীবনের অমোঘ আস্বাদ থেকে পাওয়া। কান্দনে কান্দনে সেই কাঁটাতার আর হানাহানির সকালে একদিন দেখি এক কাগজওয়ালা বাইরের শানবাঁধা ছোট্ট বারান্দায় ফেলে গেছে এই বই। তখন একুশ আর এক একুশ হয়ে এলো। পড়ে নিই থোকা থোকা কবিতার বেশ কিছু চরণ। ছুঁয়ে চলে মন। প্রহরের পর প্রহরে বলি আর চলি ‘আর যেন না দেখি কার্তিকের চাঁদ কিংবা/ পৃথিবীর কোনো হীরার সকাল/ কোনোদিন আর যেন আমার চোখের কিনারে/আকাশের প্রতিভা, সন্ধ্যা নদীর অভিজ্ঞান আর/ রাত্রি রহস্যের গাঢ় ভাষা কেঁপে না ওঠে— এসব। এরপর কাঁটাতার পরিবেষ্টিত কাভারে কাঁচা লেটারিংয়ে হাসান হাফিজুর রহমানের নামাঙ্কন নিয়ে যেন জীবনের একটা অভিশাপ ঘটে গেল। প্রভাতফেরীর যাদুজীবনের সঙ্গে এই বইয়ের থোকা থোকা অক্ষরমালায় আঁকা সালাম রফিকউদ্দিন জব্বার অনেক মহান হয়ে ওঠেন। মহার্ঘ্যও। অনেকেই অনেক কবিতা নিয়ে এ বইয়ে সংযুক্ত থাকলেও আমাদের কিশোর চোখে তারা লেখা হয়ে যান। গড়ে দেন অভাবনীয় আমোদ মাখা সব প্রণয় অনুভূতি। এর মাঝে এ বই নিয়ে ঘটে যায় অন্য ঘটনা। বইটি হঠাৎ হারিয়ে যায়। কীভাবে! ঠিক জানা যায় না। বিরাট অন্ধকার মাটির ঘরের এক কোণায় যে বইয়ের র্যাক [রোয়াক] ছিল সেখান থেকে নাই হয়ে যায়। তখন এর জন্য ভীরু অনুভূতি জমা হতে থাকে। কান গরম হয়ে যায়। মাথা নষ্ট হয়। পাশের বড় দোকানটায় ও বই না থাকায় অনেকদিন মন খারাপ হয়। কাঁটাতারমার্কা ছবি বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। এর মাঝে একুশ এসে গেলে কেউ যখন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ কবিতা আবৃত্তি করে তখন শিউরে ওঠে শরীর। এ কবিতার বই কার? সেখানে একপ্রকার জটলা তৈরি হয়। পরে উদ্ধার হয়, ওইটিই ছিল আমাদের র্যাকে রাখা বইটি। কিন্তু আর ফেরত আসে না। ক্রন্দনেও ফেরেনি তা। এভাবে একুশের মাঠে আর ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ একরকম ছিল আমাদের জীবনে। তপ্ত আর সুনসান শাসনে তা আরো অম্লমধুর মাখা।

২.

বইটি নিয়ে এবার অন্য কথা। ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ একটি বড় কাজ। হাসান হাফিজুর রহমান মনের দিক থেকে কত বড় মানুষ ছিলেন তা বোঝা মুশকিল। ওই সময় এরকম জাতীয় কাজে তিনি অসীম হয়ে উঠেছিলেন। শুধু কবিতা নয়, কবিতা-সংস্কৃতি, কবিতার জীবনযাপন, কবিতার প্রণয় আগলে রেখেছিলেন। কত স্পষ্ট তার অনুভূতি, স্বচ্ছ তার জীবনযাপন, রুচি তার উচ্চমানের— এরকম ক’জনা— সেসময়! আশ্চর্য, সংস্কৃতির জন্য, কবিতার জন্য প্রাণপাত, এই বই তো নিজের জমি বেচে করা! হায়, শুধু তা-ই কী! এটা তো সংস্কৃতির উৎসমূল, ভিটে। কী উর্বর সে ভিটে। নরম সে মাটি। এইটিই যে আসল কবিতার ধারা এবং এর পাদপীঠ যে প্রকৃত তা বুঝতে এতটুকু তিনি সংশয়ে পড়েননি। ঝড়ের বেগে ঠিক খুঁজে নিয়েছিলেন আসল ঠিকানা। বাংলাদেশের কবিতার আসল জায়গা। প্রসঙ্গত একটি কথা বলা যায়, তখন কিন্তু কবিতার বোধ অপরিপক্ব ছিল। বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের। ধারাটি চিনতে গিয়ে আটকে পড়ে যান অনেকেই। মুসলমান না হিন্দু অথবা আরবি-উর্দু-ফারসি বা বাংলা এসব হ্যাজার্ড-এর মধ্যে পাকিস্তান আর কায়েদ-ই-আজমের বুঁদ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ছিল। সত্যিকার অর্থে পাকিস্তান তো এ বঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের স্বপ্নই ছিল। তা তো সহজে কাটানো কঠিন। মনে হয় এখনো অনেক মানুষ বিভ্রান্তি আর ধর্মীয় আবেগের উন্মাদনায় দ্বিধাহীন হন না। কিন্তু তখন মাত্র স্বল্পসময়ের এই নতুন রাষ্ট্র ঠিক নবজাতকের অনুভূতির মতো সবাইকে আবদ্ধ করে রাখে। ফলে কবিতা বা সাহিত্য একপ্রকার বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে পড়ে। অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে। বিচ্ছিরি সব বিকিরিত কষ্ট ঘিরে ধরে সবাইকে। মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান রাষ্ট্রটির সুবিধা-অসুবিধার সমস্যাতেও পড়েন। এভাবে  অস্তাচলের আড়ষ্টতায় খুব পাথেয় হয়ে ওঠে এই বই— ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’। সেটি খুব অভিপ্রেতরূপে দৃঢ় ভিত্তি পেয়ে চললে পাঁচের দশকেই সে পাঞ্চজন্য হয়ে ওঠে। বইটি নেতৃত্বের নিয়তি ধারণ করতে থাকে। ওইরূপে ভাষায় শাণিত হয়ে ওঠে রূপ ও তার শ্রেয় রূপবৈচিত্র্য। পিক্ত ও চরণে অমিয় আনন্দ আর সম্পূর্ণ সাবলীল হয়ে ওঠেন, গড়ে ওঠে স্বচ্ছন্দ প্রবণতার প্রণয়ী আকর্ষণ। রস আর রূপের ভাব যখন তাৎপর্য করে তোলেন পূর্বাপর কবিবৃন্দ, সেটি পাকিস্তান প্রত্যাদেশ ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত গড়ায়, ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সে দায়টুকুতে পৌঁছায়। বলতে চাই, ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’র সংঘশক্তির সমুন্নত বীক্ষণ ও চিত্রিত অবভাস। বইটি বিস্ময় হয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায় বিভাগোত্তর বাংলাদেশের কবিতার নেতৃত্ব স্কন্ধে ধারণ করে। আর এ মতে প্রস্তুত থাকেন এই গ্রন্থের কবিবৃন্দ। ইতিহাসে তাকে কারুণ্য করে তুলি।

 

৩.

একুশে ফেব্রুয়ারী অনবদ্যতায় নয়, কবিতার ভেতরে তার যে অবস্থান প্রণয়ীর ভেতরে, গভীর অন্তরঙ্গ আয়াসে তাকে অপূর্ণ কাব্য-সঞ্চয়নই বলতে চাই কিন্তু গ্রহণ করতে চাই পূর্ণ রূপময় কাব্য হিসেবে। অর্থাৎ মান-গুণ বিচারে অপূর্ণ কিন্তু আবেগের উচ্চতায় সম্পূর্ণ। ওর নেতৃত্বেই কবিতার অভিলাস চিহ্নিত হয়। তাই গড়ন যেমনই হোক, গড়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেই নিতে পেরেছিল, ঘটনাটি সবার অলক্ষেই, আজ সেটি স্পষ্ট হয়ে গেছে। চিরকাল সে স্পষ্টতা আরো বৃদ্ধিচিহ্নিত হতেই থাকবে। আর এ মতে আমাদের প্রাণে যে কৈশোর প্রণয় সেটি অগোচরে, শুধুই স্বপ্নসারথি হিসেবে, হয়তো রক্তের স্পন্দনের ঘনিষ্ঠতায়। তাই ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’কে চিরকাল প্রথম প্রেমের প্রাণায়াম হিসেবে নেই, আর ইতিহাসের অভিমুখে শ্রেষ্ঠতে রাখি এবং গুণে নয় মানে নয়— ভূমির রক্তবীজের প্রলাপনে সব বাঙালির ইতিহাসের ‘আইকন’রূপেই ওকে চিরকালরূপে অভিনন্দিত করি। তাই বুঝি দ্বৈপায়ন হয়েই সে চিরকালের দিকসঞ্চারী। ৎ

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads