• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সাহিত্য

নিশিযাপন

  • প্রকাশিত ১৮ মে ২০১৯

সুস্মিতা মিশ্র

ঠিক রাত ৯টার সময় এলো আগের নম্বর থেকে একটি ফোন। সিঞ্জিনী ফোন তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই, ওপাশ থেকে একটি জোয়ারি গলার পুরুষ কণ্ঠস্বর শুনতে পেল- ‘আমি পারিজাত সেন বলছি। জানি না আমার নাম আপনি জানেন কি-না। তবে না জানলেই আমি বেশি খুশি হবো।’

‘না, আমি এই নামে কাউকে জানি না সেইভাবে। শুধু একজন বিখ্যাত মানুষের সাথে আপনার নামের মিল আছে। বাংলার বিখ্যাত চিত্র পরিচালক পারিজাত সেন।’

‘ও, আপনি দেখেছেন ওনার সিনেমা?’

‘হ্যাঁ, কয়েকটা। আপনার পরিচয়? মানে আমি কার সাথে কথা বলছি, সেটা না জানলে...।’ সিঞ্জিনী বলেই ভাবল, একটু কি বেশি কঠোর হয়ে গেল কথাটা!

‘ঠিকই তো, আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। সত্যি, একে তো অনাহূতভাবে জোর করে কথা বলতে চাইছি, তার ওপর পরিচয় না জানলে আপনিই বা ফোন ধরবেন কেন?’

এর পরেই ভদ্রলোক যা বললেন, সেটা সিঞ্জিনীর কাছে অপ্রত্যাশিত। উনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিই ফিল্ম ডিরেক্টর পারিজাত সেন। আজ আমি কিন্তু এই পরিচয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি না। শুধু একজন মানুষ হিসেবে একজন ভালো মানুষের সাথে কথা বলতে চাইছি। আমি আপনার কথা তন্ময়ের কাছে শুনেছি। ও আমার খুবই কাছের বন্ধু, ও-ই পরামর্শ দিল আপনাকে ফোন করার জন্য।’ কোনো কথাই মাথায় ঢুকছে না আর সিঞ্জিনীর। এত বড়মাপের একজন মানুষের কি এমন দরকার পড়ল যে ওকে বেছে নিতে হলো কথা বলার জন্য- ‘আচ্ছা, বলুন।’ ওর কথা আটকে যাচ্ছে, নার্ভাস লাগছে খুব। আবার এত বড়মাপের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পেরে উত্তেজনাও হচ্ছে খুব। তাই বেশ ঘোরের মধ্যেই বলল- ‘আমি তো ভাবতেই পারছি না আপনার সঙ্গে কথা হবে কোনোদিন। কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার কী দরকার?’

‘প্রথমেই ভুলে যান,  আমার পরিচয়। ওই পরিচয়ে আমি আজ আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই না। এই মুহূর্তে আমি নিজের তথাকথিত পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছি বিশ্বাস করুন। এমন একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাইছি, যার সঙ্গে আমার কোনোদিন কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু তা নয়, আমার বিচরণ ক্ষেত্রের একেবারে বাইরের মানুষ’, বলেই কিছুটা সময় থামলেন উনি। ‘আসলে আমি এক মানসিক ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। খুব অসুস্থ হয়ে ঘরবন্দি। হাঁপিয়ে উঠেছি কারো সঙ্গে কথা বলার জন্য। কিন্তু চেনা-পরিজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইছি না। জানি আপনার মনে অনেক প্রশ্ন। আপনি কি একটু  সময় দিতে পারবেন আমাকে, কথা বলার জন্য?’

সিঞ্জিনীর খুব বাজে লাগল। ‘না না, এমন করে বলবেন না। ঠিক আছে আমি কথা বলব। কিন্তু দিনের বেলায় তো কলেজে থাকি। তাই ওই সময়  হবে না।’ ‘না না, আপনি বলুন। আপনার সময়মতো আমি ফোন করব’, বলে উঠলেন উনি।

‘রাত আটটার পরে আমি ফ্রি থাকি, তখন যদি...।’ কথাটা লুফে নিয়ে উনি বললেন, ‘অবশ্যই, আটটার পরেই আমি ফোন করব। আজ রাখি। ধন্যবাদ, আমাকে সময় দেয়ার জন্য। শুভরাত্রি।’

অনেকক্ষণ মোবাইল হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকল সিঞ্জিনী। একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে লাগল, আমি কেন? সিঞ্জিনীর জীবনে এত বড় ঘটনা আসবে সেটা তো স্বপ্নেরও অতীত ছিল। পরদিন উঠে কলেজে গিয়ে লাইব্রেরিতে চলে গেল। কয়েকটি বই তুলে নিয়ে পড়তে চেষ্টা করল। সামনে সেমিস্টার পরীক্ষা। ছেলেমেয়েগুলোকে রেফারেন্সের জন্য বইগুলো বেছে দেবে। তাই একটু দেখে নিচ্ছিল। মোটামুটি সন্ধে ৬টা বেজে গেল কলেজে। বাড়ি ফিরে চা-জলখাবার খেয়ে একটু গড়িয়ে নিল। ভাবল সাতটায় উঠে খাবার বানিয়ে ফেলবে।

পরের ফোনটা এলো ঠিক ঘড়ি ধরে রাত ৮টায়। ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে ভারী গলার পুরুষকণ্ঠ শুনতে পেল, ‘আপনি ফ্রি আছেন তো? কোনোরকম অসুবিধা মনে হলেই কিন্তু বলবেন।’

‘না না। আমিই তো বললাম আপনাকে এই সময়ে ফোন করতে, বলুন।’

‘জানেন, কাল থেকে বেশ এক্সাইটেড, আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য। তার অন্য একটা কারণও আছে, আপনাদের জলপাইগুড়ির সঙ্গে আমার অনেক ছোটবেলার সম্পর্ক।’

‘কিন্তু আমি তো এই শহরের না, চাকরিসূত্রে এখানে থাকা।’ ‘ও হ্যাঁ, বলেছিল তন্ময়, আপনার বাড়ি কোথায় তা অবশ্য বলেনি।’

‘চন্দন নগর। আচ্ছা, কিছু যদি না মনে করেন, আপনি কাল বললেন, আপনার শরীর ভালো নেই। তাই জানতে ইচ্ছে করছে কী হয়েছে? মানে যদি বলতে আপত্তি না থাকে।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে সিঞ্জিনী থামল।

‘না, সবই বলব আপনাকে। আসলে আমার নিজের জীবনের এই অবস্থার জন্য হয়তো কিছুটা দায়ী নিজেই। বলতে পারেন, পালিয়ে এসে এক জায়গায় নিজেকে বন্দি  করে রেখেছি। খুব ঘনিষ্ঠ দু-একজন বন্ধু ছাড়া কেউ জানে না এটা। আর আপনি জানলেন।’

এরপর উনি জানালেন কেন বাড়ি ছেড়ে এখানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। প্রথমবার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর অনেক বান্ধবী এসেছে ওনার জীবনে। এই বেহিসেবি জীবনের দায় শরীর আর নিতে পারছিল না। তার মধ্যে এখন যার সঙ্গে থাকছিলেন, তার বয়স ওনার থেকে অনেকটাই কম। স্বাভাবিকভাবে এই সম্পর্কের পরিণতি যা হয়, সেটাই ঘটেছে। মেয়েটির শখ মেটানোর জন্য টাকা-পয়সার যথেচ্ছ ব্যবহার, ওনাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। তারপরেই দৈনন্দিন অশান্তি শুরু হলো, আর পাঁচটা গল্পের মতো। উনি এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি চাইলেও মেয়েটি ছাড়বে কেন? ভদ্রলোকের বিষয়-সম্পত্তি মেয়েটার নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া শুরু হলো। সেদিন ওনার বন্ধুরা পরামর্শ দিল কিছুদিনের জন্য বাইরে চলে যেতে। তারপরেই এই অজ্ঞাতবাসে চলে আসা। বাইরের সমস্যাগুলো, যেমন— মিডিয়া, প্রডিউসারের সঙ্গে কথা বলা, কিছু কাজ অসমাপ্ত রয়েছে, শুটিং শিডিউল পিছিয়ে দেওয়া- এসবের অনেকটা ওনার বন্ধুরা সামলেছে। তাই মানসিকভাবে উনি ভেঙে পড়েছেন। সাইক্রিয়াটিস্টের আন্ডারে ট্রিটমেন্টও চলছে। কিন্তু তাও যেন হাঁপিয়ে উঠছিলেন। অবশেষে তন্ময় মুখার্জির পরামর্শে এই ফোন আমাকে। এসব শুনতে শুনতে সিঞ্জিনী ভাবছিল, তাকে এতটা বিশ্বাসের কী কারণ থাকতে পারে? যাকগে, জড়িয়ে যখন পড়েছে, তখন দেখাই যাক না শেষ অবধি কী হয়। নিজের মানসিক জোরের ওপর যথেষ্ট আস্থা আছে তার।

‘অনেক সময় নিয়ে ফেললাম আপনার, আপনি ডিনার করে নিন, আমারও বিশ্রামের সময় হয়ে গেল, ডাক্তার একদম সময়ে বেঁধে দিয়েছে। এতদিনের অনিয়ম, এবার নিয়মের বেড়াজালে বন্দি, শুভরাত্রি।’

এভাবে, প্রতিদিন রাতে ফোন আসতে লাগল। ওনার ছেলেবেলার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে বদমায়েশি, প্রথম প্রেমে পড়া বয়সে দু’বছরের বড় এক মেয়ের প্রতি, তারপর কলেজ জীবন, সাহিত্যচর্চা, সিনেমার প্রতি আগ্রহ ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবের মাঝে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, আমি তো এতকিছু বলেই যাচ্ছি, আপনি কিছু বলুন। সত্যি বলতে কি, খুব জানতে ইচ্ছে করছে আপনাকে।’

সিঞ্জিনী হেসে উঠল, ‘আমার জীবনে বলার মতো এখন পর্যন্ত কিছুই ঘটেনি। কী বলব বলুন। তবে আপনার সঙ্গে এই কথা বলাটা একটি নতুন অধ্যায় বলতে পারেন।’

উনি শুনে বললেন, ‘জানেন, আপনার সঙ্গে কথা বলতে পেরে আমার নিজেকে অনেক ভারমুক্ত লাগছে। কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছিল, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। আপনাকে বলা কথাগুলো অনেকটা কনফেশনের মতো। নিজেকে আমি এভাবে মেলে ধরিনি কোনোদিন। সব কথা শুনে, খুব খারাপ মানুষ মনে হবে জেনেও আমি বললাম। জানি না কেন।’ 

সিঞ্জিনীর কলেজ আর বাড়ি- এই দুই জীবনের মধ্যে একটা নতুন ব্যস্ততা। মনকে শক্ত রাখতে পারব ভাবলেও, আজকাল অস্থিরতা একটু একটু করে বাড়ছে। ওনার কথা বলার ধরন, জীবনের গল্পগুলো সারাক্ষণ মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রায় দশ দিন ধরে একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে দুজনে। এর মধ্যে সুবর্ণা একদিন ফোন করে চিল্লাতে লাগল, ‘কী রে, সেদিনের পরে তো আর এলিও না, যোগাযোগও করলি না। শোন, আজ কলেজের পরে চলে আসবি, ডিনার সেরে যাবি, এই নে কথা বল’, বলেই ফোন ওর ছোট মেয়েকে দিয়ে দিল, ‘মাসিমণি, আজ কিন্তু অবশ্যই আসবে। তুমি না এলে আমি কেক কাটব না।’

‘তা-ই? আজ তোমার জন্মদিন, নিশ্চয়ই যাব সোনা, সন্ধ্যায় ঠিক পৌঁছে যাব।’

বলল বটে; কিন্তু তাহলে তো আজ কথা হবে না ওনার সঙ্গে। অদ্ভুত, এটা কী ভাবছে সিঞ্জিনী! এভাবে জড়িয়ে পড়ল? না, কোনো যুক্তি কাজ করছে না আর। শুধু মন চাইছে ওনার সঙ্গে কথা বলতে, না হলে ভালো লাগবে না, ব্যস। তাই একটা মেসেজ লিখে পাঠিয়ে দিল আজ রাত ৯টা ৩০ মিনিটের পরে ফোন করতে। ৎ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads