• শনিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৫
ads
অনল প্রবাহের কবি

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

সাহিত্য

সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী

অনল প্রবাহের কবি

  • প্রকাশিত ২০ জুলাই ২০১৯

বিখ্যাত লেখক, বাগ্মী, অনল প্রবাহের কবি, মুসলিম পুনর্জাগরণ ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের অগ্রদূত ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ১৮৮০ সালের ১৩ জুলাই সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। বহু প্রতিভার অধিকারী মানুষটি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, সমাজসংস্কারক, সংগঠক, ইসলাম প্রচারক, রাজনীতিক, সৈনিক, নারীশিক্ষা ব্রতী ও সংগীত রচয়িতা। তাঁর পিতার নাম শাহ সৈয়দ আব্দুল করিম এবং মাতা নূরজাহান খানম।

সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজীর হাতেখড়ি গ্রাম্য পাঠশালায়। ১৮৮৮ সালে সিরাজগঞ্জ বি.এল হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ স্কুলেই সিরাজীর ছাত্রজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। অর্থাভাবে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভে ব্যর্থ হন। তিনি কেবল ব্যক্তিগত চেষ্টায় যেটুকু লেখাপড়া শিখেছিলেন, তা তাঁর অসামান্য প্রতিভার পরিচায়ক। শৈশবকাল থেকেই তিনি অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি ধর্ম, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করেন।

মাইনর স্কুলে পড়ার সময় তাঁর সাহিত্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে এবং তিনি কবিতা রচনায় হাত দেন। সিরাজীর প্রথম কাব্য ‘অনল প্রবাহ’ (১৯০০), যা ছিল মূলত রাজদ্রোহমূলক কাব্যগ্রন্থ। ‘অনল প্রবাহ’ কাব্যের কারণে কারাবরণ করতে হয় কবিকে এবং এই প্রথম কোনো মুসলমান লেখকের বই বাজেয়াপ্ত করে ব্রিটিশ সরকার। এই কবিতাগ্রন্থে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিষোদগারের অভিযোগে ১৯১০ সালের মার্চ মাসে কবির বিরুদ্ধে মামলা হয়। ১৯১০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ১৯১২ সালের ১৪ মে কবি বর্তমান ভারতের ঝাড়খণ্ডের হাজারীবাগ জেল থেকে মুক্তি পান।

দেশ ও জাতির সেবা করাই তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত ছিল। এই ব্রত পালনের জন্য তিনি বাংলার গ্রামগঞ্জের মানুষের সঙ্গে নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি সেকালে বাংলার সভা-সমিতিতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতেন। তিনি লেখনীকে পরবর্তী সময়ে জীবনের প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর মননশীল মেধা, ধীশক্তি ও গৈরিক নিস্রাবের মতো অনলবর্ষী বক্তৃতায় বাংলার ঘুমন্ত মুসলমান ঘুমের ঘোর কেটে আত্মপরিচয় ফিরে পায়।

পরবর্তী যুগের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন তাঁরই মানস সন্তান। তিনি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অপরাজেয় সেনানায়ক ছিলেন। সেজন্য তাঁকে ব্রিটিশের হাতে বহু নিগ্রহ ভোগ করতে হয়েছিল। একাধারে ইংরেজ ও অন্য ধারে হিন্দু সম্প্রদায় এই দুই দলের সঙ্গে তিনি কথা ও কাজে সব্যসাচীর মতো আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।

তাঁর ‘অনল প্রবাহ’ নামক কাব্যই এই সংগ্রামের প্রধান কীর্তিস্তম্ভ। এই কাব্যে তিনি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যয়ের ‘ভারত সঙ্গীত’ নামক গাঁথার ছন্দে যে অনলবর্ষী ছন্দ সৃষ্টি করেন, তা ইংরেজ কামানের গোলাবর্ষণ থেকেও ফলদায়ক হয়ে উঠেছিল। তাই বাধ্য হয়েই এই ‘অনল প্রবাহ’ কাব্য ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে।

জেল থেকে কারামুক্তির পর বলকান যুদ্ধে বিপর্যস্ত তুরস্কের সাহায্যার্থে গঠিত ‘অল ইন্ডিয়া মেডিকেল মিশন’-এর সহযোগী হিসেবে ২ ডিসেম্বর তুরস্কের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে তিনি যুদ্ধের ময়দানে আহত সৈনিকদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তুরস্ক সরকার কবিকে ‘গাজী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এ সময় কবি সিরিয়াও ভ্রমণ করেন। সভা-সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার জন্য তিনি সমগ্র বাংলাও সফর করেন। তাঁর সেবা-ধর্ম, ইসলাম ও মুসলিমপ্রীতি এবং স্বাজাত্যবোধ এতই প্রবল ছিল যে, তিনি স্বাধীনতার জন্য আজীবন ভারতীয় কংগ্রেসের একজন খ্যাতনামা সদস্য ও জননায়ক রূপে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কবি সক্রিয়ভাবে নিখিল ভারত জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯১৯-১৯২৩ সালের খিলাফত ও অহিংস আন্দোলনে রেখেছিলেন বিরাট ভূমিকা। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে স্বরাজ দল গঠিত হলে তাতে তিনি যোগ দেন। ১৯২৯ সালে প্রাদেশিক আইনসভার প্রার্থী হিসেবে ফরিদপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মহান ব্যক্তিত্ব ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ছিলেন বাঙালি মুসলিম রেনেসাঁর অন্যতম অগ্রদূত। তিনি ছিলেন জাতীয় জাগরণের প্রবক্তা এবং খুরধার লেখনীর কবি ও সাহিত্যিক। মুসলিম তরুণদের কাছে তিনি ছিলেন বিপ্লবী আলোকবর্তিকা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাকে বাংলার তারুণ্যের পথপ্রদর্শক আলোকবর্তিকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দরিদ্র ছিলেন বটে, কিন্তু তা তাঁর স্বল্প আয়ের জন্য নয়। তিনি ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও দয়ায় হার মানিয়ে দেন। গ্রন্থ বিক্রয় করে ও বহু বক্তৃতা দিয়ে তাঁর সে-সময় প্রচুর অর্থ উপার্জন হতো। তিনি বাড়িতে দরিদ্র ছাত্রের জন্য দানসত্র খুলেছিলেন। শত শত ছাত্র তাঁর এই অর্থে লেখাপড়া করত। নারীশিক্ষার জন্যও তিনি জীবনপাত করে গেছেন। সমসাময়িক পত্রপত্রিকা প্রবাসী, কোহিনূর, সোলতান, মোহাম্মদী, সওগাত, নবযুগ ও নবনূর প্রভৃতিতে তাঁর গঠনমূলক লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর অধিকাংশ লেখাতেই ইসলাম ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারকে উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস ছিল।

ইসমাঈল হোসেন সিরাজী সিরাজগঞ্জে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি জমিদার ও মহাজনবিরোধী আন্দোলনে কৃষকদের সংগঠিত করেন। সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী সেকালে বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী ও সংগীত বিষয়ে এ পর্যন্ত তাঁর ৩১ খানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া সমসময়িক পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রায় তিন শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে অনল প্রবাহ, উদ্বোধন, স্পেন বিজয় কাব্য, প্রেমাঞ্জলি, আবেহায়াত ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্য। রায় নন্দিনী, তারাবাঈ, ফিরোজা বেগম ও নূরুদ্দীন (১৯২৪ খ্রি.) গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপন্যাস। আদব কায়দা শিক্ষা, সামাজিক প্রবন্ধ, স্বজাতি প্রেম, তুর্কী নারী জীবন, স্ত্রী শিক্ষা, স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা, মহানগরী কর্ডোভা তাঁর স্মরণযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ।

এছাড়া সিরাজীর তুরস্ক ভ্রমণ ও সিরিয়া ভ্রমণ আমাদের ভ্রমণ সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তিনি দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। সাপ্তাহিক ‘হাবলুল মতীন’ পত্রিকার তিনি সহকারী সম্পাদক ছিলেন। ১৯১৯ সালে সচিত্র মাসিক পত্র ‘নূর’ প্রকাশ ও সম্পাদনা এবং ১৯২৩ সালে নব পর্যায়ে প্রকাশিত ‘সোলতান’ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এই ক্ষণজন্মা কবি বহু প্রতিভার অধিকারী ছিলেন।

মানবদরদী, দেশহিতৈষী, সমাজসংস্কারক ও স্বাধীনতার অগ্রপথিক সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই মাত্র ৫১ বছর বয়সে নিজ জন্মভূমি সিরাজগঞ্জে মারা যান।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads