• বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬
ads
পেশাদার লেখকের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত

ফাইল ছবি

সাহিত্য

পেশাদার লেখকের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ২০ জুলাই ২০১৯

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন প্রকৃত অর্থে একজন প্রতিভাধর লেখক। তিনি বুঝতে পারতেন পাঠক কী চায়। তা না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে দিয়ে সার্বক্ষণিক জীবিকা হিসেবে সাহিত্যকে বেছে নিতেন না। লেখকরা অবশ্যই সাহসী। সাহসের সঙ্গেই লেখকরা তুলে ধরেন সমাজজীবনের নানা অসংগতি।

লেখালেখিকে একমাত্র পেশা হিসেবে নেওয়াটা দুঃসাহস ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে! লেখকরা জীবনযাপনের প্রয়োজনে কত কাজের সঙ্গেই না যুক্ত হন। পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টিভি চ্যানেল, প্রকাশনা, এমনকি নিজেরাই কখনো পত্রিকা করেন। হুমায়ূন আহমেদ এমনি একজন সাহসী বুদ্ধিমান লেখক তিনি কোনো কিছুতে জড়াননি নিজেকে। কী করে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একমাত্র লেখালেখির আয় থেকেই জীবনযাপন সম্ভব! তিনি রাজকীয় শৌখিন জীবনযাপনে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন শুধু লেখালেখির পেশাতেও সমৃদ্ধ জীবনযাপন সম্ভব। লেখালেখি ও চলচ্চিত্র নির্মাণে নিয়মিত সময় দেওয়ার জন্য শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে গেলেন পুরোদুস্তর লেখক। একালে একথা যেন কল্পনা করাও দুরূহ ব্যাপার।

হুমায়ূন আহমেদ তার সাহসিকতার কথা জানান দিয়েছেন কৌশলে ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের রচনায় হুমায়ূন আহমেদই প্রথম ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহারের সূচনা করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধ-উত্তরকালে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সাহিত্য রচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেখানে ধর্মীয় অনুষঙ্গ এবং ধর্মীয় চিত্রকল্পের ব্যবহার তেমনভাবে ফুটে ওঠেনি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মায়েরা সন্তানদের যুদ্ধ জয় করে নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসার জন্য নফল নামাজ পড়তেন। নফল রোজা মানত করতেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্যও নফল রোজা মানত করেছেন। এসব বিষয় আমাদের সাহিত্যে তেমনভাবে আসেনি। হুমায়ূন আহমেদ গুরুত্বের সঙ্গে অত্যন্ত সহজভাবে এসব বিষয় তুলে এনেছেন গল্প-নাটক ও সিনেমায়। তার নির্মিত চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’, উপন্যাস ‘জোসনা ও জননীর গল্প’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

হুমায়ূন আহমেদ তার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক রচনায় দেশবিরোধী রাজাকারদের প্রতি যেমন তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ছিল তার গভীর শ্রদ্ধাবোধ। বুদ্ধিদীপ্ত চরম সাহসিকতার সঙ্গে সামরিক স্বৈরশাসকের দম্ভের মাঝে ‘রাজাকার’ শব্দটি তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত কোনো অনুষ্ঠানে কারো উচ্চারণ করার সাহস ছিল না। সেই সময়ে হুমায়ূন আহমেদ তার জাদুকরি কৌশলে বিটিভির ‘বহুব্রীহি’ নাটকের একটি চরিত্র পাখির মুখ দিয়ে উচ্চারণ করালেন ‘তুই রাজাকার’। তখন ‘রাজাকার’ শব্দটির মাধ্যমে এ দেশের মানুষের যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি তাদের দীর্ঘ দিনের জমে থাকা ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।

হুমায়ূন আহমেদের লেখায় আছে মধ্যবিত্তের শেকড়ের টান। সারা বিশ্বে মধ্যবিত্তরাই সাহিত্য পাঠ করে বেশি। সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে মধ্যবিত্তরাই। ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে মধ্যবিত্তরা। হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য রচনা করলেন মধ্যবিত্তের সূক্ষ্ম জীবনবোধকে কেন্দ্র করে। কারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে নানা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। মধ্যবিত্তের সেন্টিমেন্ট, টানাপড়েন, স্বপ্ন-কল্পনা, আনন্দ-বেদনা তিনি মর্ম দিয়ে উপলব্ধি করতে পারতেন। সমাজের জটিল ও রহস্যময় চরিত্রের মানুষগুলো তার লেখনীতে আরো বেশি উজ্জ্বল ও অসাধারণ হয়ে উঠত। এ কারণে ছেলে-বুড়ো সর্বস্তরের পাঠকের কাছে তিনি পৌঁছাতে পেরেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের বেশির ভাগ লেখায় স্থান পেয়েছে মধ্যবিত্তের জীবন ও জীবনের টানাপড়েন। মধ্যবিত্ত জীবনের কথকতা সহজ সরল গদ্যে তুলে ধরে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন তার পাঠক ক্যানভাস। বাঙালির ইতিহাসে অনুকরণীয় চরিত্রের রূপকার নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ। তিনি কিছু নতুন মৌলিক চরিত্রের সঙ্গে বাঙালি পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। পাঠকও এসব চরিত্রকে নিয়েছেন আপনজন হিসেবে। পাঠক ধারণ করেছেন এসব চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো। হিমু এর মধ্যে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য চরিত্র। যে চরিত্রটি তারুণ্যের উন্মাদনায় চেতনাধর্মী হয়ে উঠেছে। হিমুর জীবনাচরণ এবং হলুদ পাঞ্জাবি এখন প্রতীকের স্বরূপ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। সিদ্ধার্থ চরিত্রটি হাজার বছর ধরে আমাদের আলোড়িত করে আসছে। এই মানুষটি জীবনকে উপলব্ধি করার জন্য প্রাসাদের ভোগের জীবনকে ত্যাগ করে পৃথিবীর পথে মানুষের মুক্তির পথ খুঁজেছেন। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি হিমু এরকম একটি চরিত্র। হিমু সংসারবিমুখ মানুষ। সে মানুষের উপকার করে বেড়ায়। তার নিজের কোনো চাহিদা নেই। হাঁটে খালি পায়ে। পৃথিবীখ্যাত মহাপুরুষরা যেমনটি করেছেন। এভাবে হুমায়ূন আধুনিক তরুণদের সামনে খেয়ালি আদর্শের এক মূর্তি গড়ে দিলেন। হিমু চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের এক অভিনব সংযোজন হিসেবে মূল্যায়িত হবে। তারপর মিসির আলী, শুভ্র তো আছেই। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি আরেকটি ভিন্নমাত্রিক চরিত্র বাকের ভাই ও নান্দাইলের ইউনুস। তার টেলিভিশন নাটক—‘কোথাও কেউ নেই’-এর চরিত্রে বাকের ভাইয়ের যেন শাস্তি না হয়, সেজন্য দেশের শহর ও গ্রামগঞ্জে মিছিল হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ পাঠক সৃষ্টিতে বাংলাদেশে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। ভারতীয় বাঙালি লেখকদের বই পড়ার জন্য বাংলাদেশের পাঠককুলের হুমড়ি খেয়ে পড়ার দিন অতীত হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাবে। তিনি পাঠকের এক বিশাল পৃথিবী গড়ে তুলেছেন, যেখানে আছে আমাদের স্বকীয়তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি। তাই হুমায়ূন আহমেদের অনুপস্থিতিতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে অনন্তকাল। হুমায়ূন আহমেদ আশির দশকে যে ধাক্কা দিয়েছিলেন, সে ধাক্কায় বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে নাড়া দিয়েছে মূল ভিতে। তাকে ঘিরেই হয়তো হু হু করে বেড়েছে পাঠক। বই বিক্রি বেড়েছে। তাই বলা যায়, পশ্চিমের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে লেখক হয়েও যে অর্থনৈতিক ব্যাপক সমৃদ্ধি আসে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হুমায়ূন আহমেদ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads