• বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
ads

সাহিত্য

চিহ্ন : স্মরণার্হ সাঁইত্রিশ

  • প্রকাশিত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাদ্দাম হুসাইন

 

 

ক্রোড়পত্রকেন্দ্রিক ক্রোমায়োজনে ষাণ্মাসিক সাহিত্যপত্র ‘চিহ্ন’র সাঁইত্রিশ ক্রমের ক্রোড়ে ঠাঁই হয়েছে ‘নন-ফিকশন’ গদ্য। নিষ্ঠসম্পাদক শহীদ ইকবালের নিরন্তর শ্রমের ঘামের নিকষেই যার জন্ম। সংখ্যাটিকে ‘চিহ্ন’র স্মারকস্তম্ভের আরেকটি স্মরণার্হস্তম্ভ বললে অত্যুক্তি হবে না হয়তো। কারণ, বাংলাভাষায় রচিত নন-ফিকশনকেন্দ্রিক কীর্ণ কীর্তনীয় লেখাগুলোর স্তূপীকৃত রূপ এই সংখ্যাটি। ‘সম্পাদকের কলমে’ অংশে ‘নন-ফিকশন’ গদ্য সম্পর্কে সম্পাদক বলেছেন : “ ‘নন-ফিকশন’ ব্যাপারটা মাঝেমধ্যেই ঘোঁট পাকায়। প্রবন্ধ তো নানা রকমের হয়! বঙ্কিমচন্দ্র সেটি দেখিয়েছিলেন। মননশীল প্রবন্ধ কতোটা উইটপ্রবণ ও ক্ষুরধার হয় তা আমরা দেখেছি প্রমথ চৌধুরীর লেখায়। তবে সংবাদপত্রের প্রবন্ধ-নিবন্ধ, বিজ্ঞাপনের গদ্য, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার গদ্য, স্মৃতিময় ব্যক্তিধর্মী গদ্য, রচনাগদ্য এগুলো কী? এখন তো প্রকাশশীলতার ধারণাই বদলে গেছে— যার ভরকেন্দ্র এই গদ্য। শশিভূষণ মহাশয় বেশ আগে ‘বাঙলা সাহিত্যের একদিক [রচনা-সাহিত্য]’ লিখে এ বিষয়টার বেশ কাটাছেঁড়া করেছিলেন। সবমিলে একাডেমিকভাবেও ‘নন-ফিকশন’ সংজ্ঞার্থ বা কাকে নন-ফিকশন বলবো, কেন বলবো, কোনটা কী— এসব তর্ক শেষাবধি সৃষ্টিশীল আছে। তাই এ বিষয়টা নিয়ে আগ্রহ আর উপলব্ধির জন্য এবার এর নিরন্তর নাড়াচাড়া। ‘ক্রোড়পত্র’ করে সে স্বভাবটা একটু তুলে ধরা, এ সময়ের নানাবয়সী লেখকের মধ্যে।” সংখ্যাটির জন্ম দিয়ে সম্পাদক নিশ্চয়ই ‘নন-ফিকশন’ গদ্যের পাকানো ঘোঁট খুলেছেন, এবং খুলেই কেবল প্রশান্ত হন নি, বরং সেটাকে পরিণদ্ধ করে পুনরায় বেণিনৈপুণ্যে শৈল্পিক সৌন্দর্যসীমায় নিয়ে গেছেন সত্য। তবে এখানেই সংহূতি নয়, বরং এখান থেকে সূচনাই বটে। এই অর্থে সাঁইত্রিশ সংখ্যাটিকে নন-ফিকশন বিষয়ক ‘সন্ধানপুস্তক’ও বলা চলে। ‘ক্রোড়পত্র-১’ অংশে যে আঠারোটি লেখা নিরীক্ষ্যমাণ, সেগুলো বর্তমান সময়েরই (এপার বাংলা-ওপার বাংলা মিলিয়ে) কিছু নতুন, কিছু স্বনামখ্যাত এবং কিছু আলোচিত লেখকের। যারা নন-ফিকশন বিষয়ে বেশ নিশিতজ্ঞানের অধিকারীই বটে। তারা হলেন— নাসিমুজ্জামান সরকার, দেবেশ রায়, মহীবুল আজিজ, প্রদীপ বসু, শোয়েব শাহরিয়ার, মোহাম্মদ আজম, আবু হেনা মোস্তফা এনাম, মাসুদ রহমান, মাহবুব বোরহান, তরুণ মুখোপাধ্যায়, অমলেন্দু বিশ্বাস, তারেক রেজা, সরকার মাসুদ, মামুন মুস্তাফা, সৈকত হাবিব, শিবলী মোকতাদির ও শামীম সাঈদ। তাছাড়া ‘ক্রোড়পত্র-২’ অংশে যে সাতটি লেখা (কিছু নতুন এবং কিছু পুনর্মুদ্রিত) ‘নন-ফিকশন [পুনঃপাঠ]’ নামাঙ্কিত, সেগুলোর প্রতি কোনো প্রকার পক্ষপাত কিংবা সন্দেহপোষণ না করেই বলা যায় যে, লেখাগুলো নন-ফিকশনকেন্দ্রিক ‘অদ্বৈতাদ্রি’ লেখা। এ পর্যায়ের লেখকরা হলেন— জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ, সলিমুল্লাহ খান, জুলফিকর মতিন ও গিরিশ কারনাড।

ক্রোড়পত্রের পরেই গোচর হয় ‘নিয়মিত বিভাগ’। কবিতা, গল্প, অনুবাদ, সাক্ষাৎকার, বিজ্ঞানের সহজপাঠ, কী লিখি কেন লিখি, ধারাবাহিক রচনা, বই-পত্রিকার পরিচিত এবং শেষ পাতার আহ্বান যার সরঞ্জাম। এই অংশে সম্পাদক সর্বসময়ই ‘নিকষনীরিক্ষা’র স্বাক্ষর রাখেন। এই অংশে বাড়তি বিষয় হিসেবে যোগ হয়েছে ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা ২০১৯’— যাকে ‘ঢাকী’ (আত্মপ্রচারক) বললে ভ্রান্ত ধারণাই পোষণ করা হবে; বরং ব্যাপারটাকে সাকুল্যে ‘সাকি’ (প্রেমপরিবেশক) বলাই শ্রেয়। কারণ, ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাঙলা’র সুবাসিত সৌরভ একজন সাকি হিসেবেই সম্পাদক সাধারণ এবং বিদ্বৎ লেখক-পাঠক-সম্পাদকের মাঝে ছড়িয়েছেন এবং বোঝাতে চেয়েছেন— বৃত্তের কেন্দ্রে না থেকে প্রান্তে থেকেও ‘প্রান্তজনের সখা’ হয়ে সাহিত্যসুরা পরিবেশন করা যায়, যার জন্য প্রয়োজন প্রবল ‘ইচ্ছাশক্তি’। কথাটা বলার কারণ হলো— কেবল ‘ইচ্ছাশক্তি’র জোরেই ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নানানামে এবং নানামাত্রিক আয়োজনে চারবার ‘চিহ্নমেলা’ হয়েছে, যার একটি রূপরেখা এই অংশে অবলোকিত হয়।

ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সুসংহত স্ফুরণ, এবং বাঙালির আত্ম-আবিষ্কারের সূচনালগ্ন। এই আন্দোলনের গুরুত্ব বা মহত্ত্ব কেবল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে ‘অন্যতম রাষ্ট্রভাষা’ করার দাবিতে ঢাকায় ছাত্রদের মিছিল-সংগ্রাম ও শহীদদের আত্ম-বিসর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন নিয়ে বিভাগপূর্বকালেই বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শুরু হয়েছিল চিন্তা-ভাবনা এবং এই আন্দোলনের তাৎপর্য ভাষা বা সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের দাবি ছাড়িয়ে মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইয়ের মধ্যেই তার পরিণতি খুঁজেছিল। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন কেবল সাংস্কৃতিক-আন্দোলন কিংবা বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন নয়, অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইও বটে। তাছাড়া আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা নাগরিক সমাজের আন্দোলন মনে হলেও সারা বাংলার গণমানুষের ক্ষোভ এবং বিক্ষোভের জ্বালামুখ হিসেবে কাজ করেছিল এই ভাষা আন্দোলন। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের সর্বশ্রেণির ও সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলন। পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় মুক্তি-আন্দোলন বিকাশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন এজন্যই এত তাৎপর্যপূর্ণ। আর এ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ে বিশিষ্ট বামপন্থি বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গল্পকার পাভেল চৌধুরী, ‘চিহ্ন’কর্মী নিখিলেশ রনি ও ‘চিহ্ন’সম্পাদক নিজে। সাক্ষাৎকারটি এ সংখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা পাঠের মাধ্যমে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং তৎকালীন রাজনীতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়; এবং যাকে বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ এবং ‘যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ’ গ্রন্থের ‘বিন্দুতে সিন্ধুরূপ’ও বলা যেতে পারে অনেকাংশে, এবং যা পাঠের মাধ্যমে তাঁর এই দুই আকরগ্রন্থ পড়ার সন্ধিৎসা সৃষ্টি করবে এ সময়ের নতুন পাঠকদের। তবে এ সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দীন উমর কিছু ‘বাড়তি কথা’ (প্রচলিত ইতিহাসের বিপরীত কথা) বলেছেন। যেমন :

চিহ্ন : ...ভাষা আন্দোলন নিয়ে যেমন এখন রাজনৈতিকভাবে নানান ধরনের প্রচার চলছে, নানান কথাই ভাষা-আন্দোলন নিয়ে বলা হচ্ছে,  তো এগুলোতে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর কোন বক্তব্যটা আপনার মনে হয়?

বদরুদ্দীন উমর : সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য হচ্ছে যে শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এটা একটা ভুয়ো কথা সম্পূর্ণভাবে। শেখ মুজিবের সময়— ভাষা আন্দোলনের সময় আটচল্লিশ সালে উনি এখানে এসেছিলেন। উনি তো থাকতেন কলকাতায়। উনি তো ঢাকায় রাজনীতি করেননি। উনি তো কলকাতায় রাজনীতি করেছেন। ফরিদপুর থেকে ওদিকে কলকাতায় গিয়ে রাজনীতি করেছেন। এইখানে এসে উনাকে একটা নিজের অবস্থান তৈরি করতে সময় লেগেছিল। আটচল্লিশ সালে যখন উনি এলেন, তখন তো নেতা-ফেতা কিছু ছিলেন না।... তারপরে শেখ মুজিব নিজেও মিথ্যা করে টেলিভিশনে— আমি নিজেও শুনেছি উনাকে বলতে, তিনি ওই যে হাসপাতালের গবাক্ষ থেকে বাথরুমের ওইখান থেকে চিরকুট ছুড়ে ছুড়ে তিনি আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। বায়ান্ন সালে এই আওয়ামী লীগের অবস্থাই কি ছিল, আর উনার অবস্থাই বা কি ছিল— উনি যাতে করে ভাষা আন্দোলন পরিচালনা করতে পারেন? অ্যাবসার্ড কথা!’ (পৃ. ৩৪১-৩৪২) তাহলে কী ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ভূমিকাই ছিল না?, বঙ্গবন্ধু কী তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে নিজেকে ভাষা আন্দোলনের নায়ক প্রমাণ করেছেন?, নাকি বদরুদ্দীন উমর বাড়িয়ে বলেছেন?, তাহলে— সত্য কে, বঙ্গবন্ধু না বদরুদ্দীন? ‘চিহ্ন’র আরো কিছু প্রশ্ন :

চিহ্ন : আপনিও তো ইন্টারভিউ করেছিলেন শেখ মুজিবকে?

বদরুদ্দীন উমর : হ্যাঁ। শেখ মুজিবকে আমি ইন্টারভিউ করি, তাকে আমি নাস্তানাবুদই করেছিলাম বলা চলে!... আমি উনাকে একদিন ফোন করলাম যে, আমি আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। তো বললেন ঠিক আছে, এসো তুমি সকাল সাতটার সময়। সাতটার সময় গেলাম। সেটা ছিল ঊনসত্তর সাল। অনেক লোক সেখানে ভিড় করা। তারপর আমি গেলাম। আমাকে নিয়ে ঘরের মধ্যে বসালেন। দরজা-জানলা একদম বন্ধ। আমি গেলাম। তা সেখানে নানারকম কথা, তারপর উনি আমাকে বলতে চেষ্টা করলেন, চিন্তা করেন যে— আটচল্লিশ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়। আমি বললাম, আটচল্লিশ সালে তো আপনি কিছুই ছিলেন না। আটচল্লিশ সালের ভাষা আন্দোলনে আপনার কিছুই ভূমিকা ছিল না। আপনি তো স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি অব অ্যাকশনের মেম্বারও ছিলেন না। তারপরে এখানে জিন্নাহ সাহেব যখন এসেছিলেন, তখন জিন্নাহ সাহেবের সাথে ছাত্রলীগের যে সমস্ত নেতা আলাপ করতে চেয়েছিলেন— ছাত্রলীগের যে ডেডিকেশন জিন্নাহ সাহেবের সাথে দেখা করেছিলেন, তার মধ্যে তো আপনি ছিলেন না। তখন আমাকে বলেন যে, হ্যাঁ আমি ছিলাম না, তাজউদ্দীন আর নজরুল ইসলামকে দিয়েছিলাম। আমি বললাম যে তাজউদ্দীন, নজরুল ইসলাম ছিলেন, কিন্তু আপনি ছিলেন না। তো পরে একথা তাজউদ্দীন, নজরুল ইসলামকে বলাতে ইসলাম বললেন যে, ‘উনি এসব কথা বলেই থাকেন এরকমভাবে।’ আর তাজউদ্দীন খুব মুখ খারাপ করে একটা গাল দিয়েছিলেন! যেটা আমি এখানে বলতে চাই না। তারপরে বললেন যে, জিন্নাহ সাহেবের সাথে দুবার দেখা হয়েছিল, ছাত্রলীগের ডেডিকেশন এবং স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি অব অ্যাকশনের সময়, কোনোটাতেই তো আপনি ছিলেন না। এই সব চিকন কথার পরে উনি বুঝতে পারলেন যে, উনি আমাকে যেভাবে এসব বলতে চাইছেন সেগুলো চলবে না। আমার কাছে চলবে না সেটা আলাদা, কিন্তু চালিয়ে তো দিলেন জাতির কাছে! কারণ, আমার ওপর কোনো হাত নাই, কিন্তু জাতির ওপর হাত আছে তো! কোনো আড়াল চলবে না, এগুলো লিখতে হবে, যদি সাহস থাকে’ (পৃ. ৩৪৩-৪৪)। এছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘খুনী’, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধুর চাইতে ‘বড় খুনী’ এবং প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্যকে ‘হারামজাদা তথ্য’ বলেছেন। এমনসব ‘আপত্তিকর’ তথ্য ৩৩৫ থেকে ৩৮২ পর্যন্ত পাতায় পাতায়! তাহলে এমন আপত্তিকর তথ্যসংবলিত সাক্ষাৎকারটি ‘চিহ্ন’ ছাপল কেন?, ‘চিহ্ন’সম্পাদক কী বদরুদ্দীন উমরের কথায় : ‘যদি সাহস থাকে’র সাহসিকতা দেখিয়েছেন?, নাকি সত্যটাই এ সময়ের লেখক-পাঠক-গবেষককে জানাতে চেয়েছেন? এমন দ্বিমতভিত্তিক সাক্ষাৎকার-সংবলিত সংখ্যাটি আগস্ট ২০১৯-এ বের হয়েছে, অথচ অদ্যাবধি কোনো প্রকার আলোচনা কিংবা আলোড়নই হয়নি! তাহলে আমরা যারা ‘চিহ্ন’র নিয়মিত পাঠক, তারা কী ধরেই নেব বদরুদ্দীন উমর সঠিকই বলেছেন; অথবা সঠিক তথ্য ছাপিয়ে সম্পাদক সাহসিকতারই স্বাক্ষর রেখেছেন? সর্বোপরি এ সময়ে কি ‘চিহ্ন’পাঠকের সংখ্যা অনধিক? না, ‘চিহ্ন’র বৃহৎ কলেবর দেখে পাঠকের কলিজার কলকব্জা কেঁপে ওঠে— ফলে ভয়ে কেউ পড়ে না? নাকি পাঠক পাঠ করে ভয়ে নিশ্চুপে-নির্বিঘ্নে টিকটিকির মতো আলোর কাছে লেজ নাড়িয়ে সুবিধা ভোগ করছে?— এমনসব জিজ্ঞাসার ঊর্ধ্বে নয় সাক্ষাৎকারটি। স্মর্তব্য, রাজনৈতিক বিষয় বাদ দিয়ে সাহিত্য এবং সাহিত্যিক সম্পর্কিত আলাপচারিতাটি বেশ চমৎকার। তবে এখানেও অনেক সাহিত্যিককে অবজ্ঞা বা অবহেলা করা হয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব এবং নির্মোহ বৈশিষ্ট্যের স্বাক্ষর রেখেছেন, যা থাকতেই পারে। কারণ, একজন লেখক সবার কাছে সমান নয়। তাছাড়া, স্বব্যাখ্যাতা এবং প্রজ্ঞাবান বদরুদ্দীন উমরের ক্ষেত্রে ‘নির্মোহ বৈশিষ্ট্য’ থাকাটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে ব্যাপারটিকে নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবার কিছু নেই। তবে রাজনৈতিক বিষয় বাদ দিয়ে কেবল সাহিত্য এবং সাহিত্যিক সম্পর্কিত সাক্ষাৎকারটি সংশোধন করে সম্পাদক ছাপালেই ভালো করতেন বোধ হয়। কারণ, ‘চিহ্ন’ কোনো ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিকপত্র নয়, ‘সাহিত্যপত্র’। তাই সাহিত্যপত্র হিসেবে রাজনৈতিক বিষয়কে ‘চিত্তের প্রসারতা মস্তিষ্কের মুক্তি’র মোক্ষদ হিসেবে না ভেবে, সাহিত্য বা সাহিত্যিক সম্পর্কিত বিষয়টিকে মোক্ষদ হিসাবে ভাবলেই বোধহয় মোক্ষম হতো।

‘ধারাবাহিক রচনা’ অংশের হোসেনউদ্দীন হোসেনের ‘আত্মকথা : ধুলায় ধূসর’ দিন দিন ধুলায় ধূসরই হয়ে যাচ্ছে। ফলে এ ধরনের ধারাবাহিক রচনা ‘চিহ্ন’র মানকে কতখানি সমুন্নত রাখছে সেটাই উপলব্ধির বিষয়! এ ধরনের ক্রমাগত ‘ধুলায় ধূসর’ হয়ে যাওয়া লেখা আর বর্ধিত না করাই ভালো বোধ হয়। এ সংখ্যায় প্রচুর নতুন লেখকের লেখা দৃষ্টিগোচর হয়, যা পত্রিকার ভালো দিক হিসেবে বিবেচ্য। ‘চিহ্ন’ দীর্ঘজীবী হোক। স্মরণার্হ সাঁইত্রিশ সংখ্যার মতো দেখাক সাহসিকতা সময়ের বিরুদ্ধস্রোতে। অনির্বাণ হয়ে জ্বলুক দীপশিখা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads