• রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস

অনুবন্ধ

  • প্রকাশিত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শ্রাবনী প্রামানিক

 

 

বাবার ছোট আম্মা আমি গিয়ে দাঁড়ালাম তার সামনে। আমার হাতে ঝুলছে ঝকঝকে মোছা চিমনির লণ্ঠন। এখনো বাবা টেবিলের ড্রয়ারটা খুলে কী সব কাগজপত্র ঘাঁটছেন। তবে দলিল ভেবে বুক কেঁপেছিলো যে কাগজ দেখে, এখন দেখলাম না কোথাও। অন্ধকারে কীভাবে কাজ করছেন বাবা? বাবা আমার দিকে তাকালেন যেন অচেনা এক রাজকন্যা আমি!

— কাজ? কোথায় আর! তুমি দেখ— পদ্মাকে যেন আর কাঁদতে না হয়। একটু পরেই মৌলবিসাহেব আসবেন। ওদের বিয়ে পড়ানো হবে।

— আচ্ছা বাবা। আমি সবাইকে এখনই বলছি।

আমার মনে হলো, আমিই হয়তো প্রথম কোনো হরকরা যে সুখবর বয়ে নিয়ে যাচ্ছি! আগে ছুটলাম হেঁসেলে। মা যে এখনো কিছুই জানে না! পরে বুঝেছি— মা হলো প্রকৃতি। তার অজানা কিছুই নয়!

— মা, তুমি জানো এখন মৌলবিসাহেব আসবেন?

— এখন না। আরো একটু দেরি আছে। ততক্ষণে আমার রান্না শেষ হয়ে যাবে। অভিমানে আমার গাল ফুললো। সবাই যদি সব জেনেই থাকে, তবে আমাকে খবর দিতে বলা কেন?

যুদ্ধ তো কবেই শেষ! স্বাধীন মানুষের মন চিন্তাহীন, আনন্দময়! সত্যিই কী হাসছে সবাই? তিন বছর পার হয়ে গেল, কই আমার নুয়া আপা তো হাসে না আর! রাঙা আপা? যে হঠাৎ হঠাৎ হেসে ওঠার জন্য সবার ধমক শুনতো! কোন শূন্যে মেলালো তার হাসি?

লোহার ট্রাঙ্কে শুধু নুয়া আপার শাড়িই নতুন পড়ে থাকে। নুয়া আপার বিয়ের জন্য কেনা শাড়িটা? সেটাও আছে। মেজো দুলাভাই তখন সিরাজগঞ্জের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মেজো আপা আর দুলাভাই কলকাতার বেনারসি আনেন নুয়া আপার বিয়ের জন্য। হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো নরম গোলাপি বেনারসি জমিনে সবুজ পানপাতা সারি সারি তার মাঝে একটা করে জরির টিপ! মেজো আপা বলেছিলো— ফিরোজা তো শ্যাম, ওকে লাল নয় গোলাপিতে বেশি মানাবে! নুয়া আপা আজো জানে না, গোলাপি বেনারসিতে তাকে কেমন মানায়?

মা একেবারে চুপ ছিলেন। যেমন থাকেন। বাবাও কী একটু বেশিই চুপ হয়ে গেছেন? এরকম হতো না। কিচ্ছু হতো না, যদি একাত্তর সাল আমার রাঙা আপাকে খেয়ে না ফেলতো! নুয়া আপার হাসি-আনন্দ হারিয়ে না দিতো!

নুয়া আপার না হওয়া বিয়ের এতদিন পরে আবার একটা বিয়ে আমাদের ঘরে। ফুলদি একবার মৃদু বললো— মা বিয়েতে নতুন শাড়ি লাগে না? মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমাদের সবুজ রং করা মস্ত লোহার ট্রাঙ্কের দিকে তাকালো। ফুলদি যেন সাথে সাথেই ধরে ফেললো— গোলাপি বেনারসিটা মা? নুয়া আপাও মুহূর্তকাল দেরি না করে— না না.. ওইটা একদম না! আরো দুইটা পাট না ভাঙা নতুন আছে; বের করে দিচ্ছি, তবে সুতি।

আমরা তিন আধ ফোটা গোলাপ অথবা বোন চোখে চোখ রেখেছি। পদ্মা যে তখন কিছুই বোঝেনি এসব কথার রহস্য বা চোখের ইঙ্গিত, পরে একদিন বলেছে আমাকে। বাবা কখন বিয়ের আয়োজন করলেন আমরা কিছুই জানতে পারিনি! পরে অবশ্য সবই জেনেছি। পদ্মা এ বাড়িতে আসার পর বাবা একটা দিন সময় নেন সিদ্ধান্ত নিতে এবং তার পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় নেন তার চিন্তা-ভাবনা গুছিয়ে নিতে।

দাদাভাইয়ের কী বলার আছে, আমরা জানতে চাইনি। বুঝতেও চাইনি। আমরা সবাই তাকিয়ে ছিলাম বাবার মুখের দিকে। ভাবনাটা এমন— বাবা যা বুঝবেন, সেটাই ভালো। এবং আশ্চর্য; বাবার কাছ থেকে পাওয়া হঠাৎ আঘাতের পর দাদাভাই আর মুখ খোলেনি।  বাবা যে তাকে ভুল বুঝতে পারে, এটাই হয়তো তার সব ভুল ভেঙে দিলো! আর বিয়ের সন্ধ্যায়? বিকালের দিকে দাদাভাই অন্যদিনের মতোই হয়তো খেলার মাঠে যাচ্ছিলো, বাবা আটকে দিলেন। সাইকেলটা চালতা তলায় স্ট্যান্ড করা থাকে। দাদভাই তার খোপ থেকে বের হয়ে সাইকেলের দিকে যেতেই বড় ঘর থেকে বাবার গলা— আজ কোথাও যাবে না সজীব। বাড়িতেই থাকো— দরকার আছে। দাদাভাই নিঃশব্দে আবার খোপে ফিরলো, ঠিক যেন বোতাম টেপা রোবট।

মিলন বা তার মা কেউ আসেনি। দাদাভাই কি তার চিরবন্ধুকে হারালো? আমার কেমন জানি খারাপ লাগতে লাগলো। একজন তৃতীয় ব্যক্তি কী সবসময় দুজনের মধ্যে দূরত্বই সৃষ্টি করে? পরে জেনেছি— বাবা ইদ্রিস চাচাকে সঙ্গী করে উপস্থিত হয়েছিলেন মিলনের মায়ের সামনে। সে বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়— পদ্মা যখন এ বাড়ি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে, আমি আর কোনোদিন এ বাড়িতে ওকে আনবো না। ওর সম্পর্কে ভালো বা মন্দ কিছুই বলবো না। মিলন? বাড়িতেই ছিলো। বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়নি। লজ্জা না ভয়?

বাবার বাস্তুভিটা যেখানে, আমাদের বাড়ি থেকে পনেরো বা ষোলো মাইলের পথ। মাদপুর গ্রাম। সেখান থেকে আসার মতো কেউ নেই আর। ছিলেন একজনই। যে পান চিবাতে চিবাতে খয়েরি হয়ে যাওয়া ঠোঁটে হাসি মেখে আমাদের বাবার হামাগুড়িকালের গল্প বলতো। সে ছিলো আমাদের দাদি। কালাজ্বরে চলে গেল। দাদাভাইয়ের সৌভাগ্য হয়নি দাদিমায়ের পানখাওয়া রঙিন ঠোঁটের হাসি দেখার! অথবা দাদিমায়ের ভাগ্যে ছিলো না বাবার একমাত্র পুত্রসন্তানকে দেখার! তখন থেকে আমরা সাত বোন ছাড়া বাবার আম্মা বলে ডাকার আর কেউ নেই!

বাবা আমাদের আম্মা ডাকেন। কিন্তু দাদাভাইকে বাবা ডাকতে কমই শুনেছি। অথবা আব্বা? না। বাবা আসলে আব্বা বা বাবা কোনোটাই ডাকতে জানেন না! যদিও তিনিই আমাদের মুখে বাবা ডাকের সূচনা করেছেন। স্মৃতি যেন পাখির ডানা! কোথা থেকে যে কোথায় উড়াল দেয়! তবু আমি সে ডানার পালক একটা একটা করে খুলে দেখি। ছেড়ে আসতে পারি না আমি অথবা সে পাখি ছেড়ে যায় না আমাকে! আবারো পিছিয়ে যাচ্ছি...আবারো!

দাদিমা তখন মাদপুরের বালিকা বধূ। বয়স তেরোর মাঝামাঝি। দাদাজান পানসিভরা পাট নিয়ে গেলেন শাহজাদপুর। সেই যে গেলেন, আর ফিরলেন না।  মাঝিমাল্লারা ফিরলো। সবাই জানলো— দাদাজান পাট বিক্রির টাকা সঙ্গে নিয়ে গেছেন সওদা করতে; তারপর আর পানসিতে ফিরে আসেননি। বাবা তখন দাদিমায়ের পেটে একটু একটু বাড়ছেন। বাবার জন্ম হলো। কিন্তু  দাদিমা তার শ্বশুরভিটায় টিকতে পারলেন না। তাকে ফিরে যেত হলো ছোট ছেলেটা কোলে নিয়ে। সেই থেকে বাবা ছিলেন মামাদের আশ্রিত। সেসব দিনের কথা বলতে গেলে বাবার চোখ কেমন ছল ছল করে উঠতো! এ জন্যই কি বাবা এত করে বুঝতে পেরেছেন পদ্মার জীবন-জ্বালা?

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads