• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

সাহিত্য

আলোচনা-সমালোচনার নোবেল ও দুই বিজয়ী

  • মীম মিজান
  • প্রকাশিত ১৯ অক্টোবর ২০১৯

প্রতিষ্ঠান কখনোই একজন ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একাধিক মানুষ বা পরিচালনা পর্ষদ। প্রতিষ্ঠাতা যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান শুরু করেন, সে উদ্দেশ্য নানা মুনির নানা মতে এসে হয়ে যায় পথভ্রান্ত। এরকম এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সাহিত্যের নোবেল ঘোষণার সুইডিশ একাডেমি। যে আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজে লাগাতে চাইলেন, তা পূরণও হলো। তিনি অর্থ-কড়িতে সমৃদ্ধ হলেন। কিন্তু সমাজের পেঁচারা সেই ডিনামাইটকে লাগালো মানবতার হত্যায়। মহাত্মা আলফ্রেড নোবেল লজ্জায় ও ঘৃণায় করলেন আত্মহত্যা।

কয়েক বছর ধরে সাহিত্যের নোবেল ঘোষণা কমিটির ১৮ সদস্যের মধ্যে এক নারী সদস্য ক্যাটারিনা ফ্রসটেনসন নোবেলের শর্ট লিস্ট, এমনকি কে পেতে যাচ্ছেন সে-বছরের নোবেল সেই তথ্য তার স্বামী জঁ-ক্লদ আরনল্টের কাছে ফাঁস করতেন। আর জঁ-ক্লদ সেই তথ্য জুয়াড়িদের কাছে বিক্রি করত মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। জঁ-ক্লদ সুইডিশ একাডেমির অর্থে পরিচালিত একটি এনজিওর দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি তার অধস্তন নারীকর্মীদের ওপর যৌন নির্যাতন করতেন, যা গত বছর ‘মি টু’ আন্দোলনের ঢেউয়ে ভাইরাল হয়। যার ফলে অস্বস্তিতে পড়ে যায় নোবেল কমিটি। স্থগিতাদেশ জারি করে দুই হাজার আঠারোর নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণায়। সেই স্থগিতাদেশের নোবেল এবং চলতি বছরের নোবেল গত ১০ অক্টোবর ঘোষণা দিয়েছে সুইডিশ একাডেমি।

প্রথমেই যেমনটি বলেছিলাম, নানা মুনি আসলে নানা মতে প্রারম্ভিক সেই আদর্শ থেকে চ্যুতি ঘটে প্রতিষ্ঠানের। আলফ্রেড নোবেলের করে যাওয়া উইল অনুসারে জানা যায়, তিনি বলে গেছেন, ‘তাদেরই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হবে যারা একটি আদর্শগত প্রবণতার মাধ্যমে কোনো অনন্য সাধারণ কাজ প্রদর্শন করতে পারবেন।’ দেখুন, সেই সুইডিশ কমিটি কতটা চ্যুত তাদের সেই আদর্শ থেকে। অন্যভাবে যদি বলি তাহলে বলা যায়, এই সাহিত্যের নোবেলের যেন কেলেঙ্কারি পিছুই ছাড়ছে না। এক কেলেঙ্কারি থেকে মুক্তি পাওয়ার সময়কালেই আরেক কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে তারা। এবার অর্থাৎ ২০১৯ সালে যে সাহিত্যিককে নোবেলে ভূষিত করা হলো তিনি চিন্তাগত বা মজ্জাগত দিক থেকে একজন অমানবিক মানুষ। কেননা তিনি ১৯৯০ সালে যুগোস্লাভিয়ায় স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মানবতার কীট বলকানের কসাই স্লোবেদান মিলোসেভিচের চালানো গণহত্যাকে সমর্থন করেছেন। বসনিয়া-হার্জেগোভিনিয়া স্বাধীনতা লাভের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে এই কসাইয়ের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলাকালীন ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করলে সেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এসে তার (স্লোবেদানের) স্তুতি করে বক্তব্য দেন ২০১৯ সালের নোবেলবিজয়ী পিটার হ্যান্ডকে। বরাবরই তাকে এবং তার কর্মকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে আসছে এই পিটার।

ইতোপূর্বে পিটারের মতো আরো একাধিক সমালোচিত সাহিত্যিকের কর্মকে বিচার-বিশ্লেষণ করে নোবেলে ভূষিত করে নোবেল কমিটি তাদের গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড খুইয়েছে।

 

২.

একসঙ্গে ঘোষিত দু’বছরের নোবেল পুরস্কারে ২০১৮ সালে যিনি ভূষিত হয়েছেন, তিনি গত বছর থেকে শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনের আলোচনার শীর্ষে অবস্থানকারিনী ওলগা তোকারচুক। ওলগা সত্যিই নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতোই একজন লেখিকা। কেননা গত বছর তিনি সাহিত্যের দ্বিতীয় মর্যাদাবান পুরস্কার ম্যান বুকারে ভূষিত হয়েছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের যে মান তা অনন্য। নতুন আঙ্গিক নিজ সৃজনে ধারণ করার জন্যই তিনি স্বতন্ত্র।

মধ্য ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডের সুলেচোউতে ১৯৬২ সালের ২৯ জানুয়ারি জন্ম নেন এই প্রথিতযশা লেখিকা। পাঠদানের সঙ্গে জড়িত মাতা-পিতার সন্তান ওলগা। পাঠদানের পাশাপাশি ওলগার বাবা একটি গ্রন্থাগারের দায়িত্বে ছিলেন। গ্রন্থাগারিকের তনয়া হিসেবে জ্ঞানসমুদ্রের গহিনে অবগাহন করতেন তিনি। আর সেখান থেকেই তাঁর লেখালেখির ঝোঁকপ্রবণতা জেগে ওঠে। অতঃপর কবিতা লেখা শুরু করেন। যদিও কবিতার মাধ্যমে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করা শুরু করেছিলেন ওলগা তথাপি তিনি উত্তরোত্তর কথাসাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

যুবক বয়সে তোকারচুক ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন। বিশ শতকের শেষের দিক অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয়। চড়ফৎষ্টু ষঁফুর কংরবমর (ঞযব ঔড়ঁৎহবু ড়ভ ঃযব ইড়ড়শ-চবড়ঢ়ষব) নামের সে বইটিতে ছিল সপ্তদশ শতকের ফ্রান্স ও স্পেনের কাহিনী, যেখানে বিভিন্ন চরিত্র একটি রহস্যময় বই খুঁজে চলেছে। শেষে এসে তারা একটি সমাধানে উপনীত হয়।

তাঁর সাড়া জাগানো প্রথম উপন্যাস চৎধরিবশ রহহব পুধংু প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। এই উপন্যাসের মাধ্যমে নিজের সাহিত্যিক অবস্থানকে জানান দেন তিনি। সমসাময়িক পোলিশ লেখক জগতে তাকে নিয়ে আলোচনা-মুখরতা দেখা যায়। ২০১০ সালে সে বইয়ের অনুবাদ হয় ইংরেজি ভাষায়। ইংরেজিতে বইটির নাম ছিল চৎরসবাধষ ধহফ ঙঃযবৎ ঞরসবং। এ অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে এক উদীয়মান সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় জানতে পারে পাঠক। এ উপন্যাসের প্রেক্ষিতও এক মিথিক্যাল স্থান, অথচ তা ভরপুর বস্তুনিষ্ঠ অনুপুঙ্খে। সুইডিশ একাডেমি বলেছে, তোকারচুকের জাবি এই ন্যারেটিভ হলো অতীতের জাতীয় ভাবমূর্তির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার চেষ্টা। ১৯৮৯ পরবর্তী নতুন পোলিশ সাহিত্যের এ এক চমৎকার উদাহরণ, যেখানে নীতিবিচারকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা হয়েছে এবং জাতির বিবেকের প্রতিনিধিত্ব করতে অনিচ্ছা বিবৃত হয়েছে। এটি বিশ্বের অনেক শক্তিশালী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

এরপর ওলগার লেখার ধারা ভিন্ন দিকে ধাবিত হয়। তিনি নভেলা বা ছোটগল্প লেখার দিকে মনোনিবেশ করেন। উপন্যাস রচনার মতো এখানেও সোনা ফলান ওলগা। পাশাপাশি প্রবন্ধ রচনার দিকেও ঝুঁকে পড়েন তিনি। ‘দ্য ওয়ারড্রব’ নামক একটি গ্রন্থ ১৯৯৭ সালে প্রকাশ করেন। তিনটি নভেলার সংকলন এই গ্রন্থটি। ওলগার প্রথম ইংরেজিতে প্রকাশিত গ্রন্থের নাম ‘হাউজ অব ডে, হাউজ অব নাইট’। লেখকের ব্যক্তিজীবন, সাংসারিক জীবন, গ্রামে যাপিত দিনলিপি ইত্যাদি এখানে আলোচিত হয়েছে।

অব্যাহতি কাল পরেই ২০০১ সালে তিনি ছোটগল্প সংকলন ‘প্লেয়িং অন ম্যানি ড্রামস’ শীর্ষক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তারপরই ওলগা বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বোলেসলও প্রাসের ক্লাসিক উপন্যাস ‘ডল’-এর থিম থেকে ‘দ্য ডন অ্যান্ড দ্য পার্ল’ নামে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। যা ননফিকশন সেকশনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আধুনিক রীতিতে তিনি তিনটি ক্রিস্টমাস গল্প লিখেছেন তার তিন অনুজের সঙ্গে। ২০০৪ সালে ‘দ্য লাস্ট স্টোরিজ’ নামক একটি উপন্যাস প্রকাশ করেন ওলগা। যেখানে মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তিন প্রজন্মকে একত্র করেছেন তিনি এই নভেলে।

প্রায় সব সমালোচকদের মতে, ওলগার সবথেকে প্রোজ্জ্বল উপন্যাসের নাম ‘ফ্লাইটস’, যা পোলিশ ভাষায় ‘বিগুনি’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ‘বিগুনি’-কে ‘ফ্লাইটস’ শিরোনামে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেন জেনিফার ক্রোফট। আর এই অনুবাদই তাকে এনে দেয় সুখ্যাতি ও সম্মানের পুরস্কার ম্যান বুকার। পোলিশ ভাষায় উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে, আর এর ভাষান্তর প্রকাশ হয় ২০১৭ সালে। দার্শনিক বিষয়াবলি নির্ভর করে উপন্যাসটি এগিয়েছে। উপন্যাসের প্রশংসায় বুকার কমিটির চেয়ারম্যান লিসা আপিংনানেসি বলেছেন, ‘একজন চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত লেখক, কল্পনাপ্রবণ এবং প্রোজ্জ্বল সাহিত্য মেধা।’

২০০৯ সালে ‘ড্রাইভ ইওর প্লো ওভার দ্য বোনস’ নামক সাড়া জাগানো উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ওলগার সর্ববৃহৎ কাজ হচ্ছে ২০১৪ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘কংরবমর ঔধশঁনড়বি’ যার ইংরেজি ভাষান্তর নাম ‘ঞযব ইড়ড়শং ড়ভ ঔধপড়ন’। ৯০০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাস অষ্টাদশ শতাব্দীর এক সম্প্রদায়ের নেতা জ্যাকব ফ্র্যাঙ্ককে নিয়ে, যার নাম খুব কম লোকেই জানে। জ্যাকব ইহুদি, ক্রিশ্চান ও মুসলিম সম্প্রদায়কে একত্র করার প্রয়াসের মাধ্যমে গোঁড়াদের চক্ষুশূল হয়েছিলেন।

রোমান ফিংগাস নামক এক শিল্পসমঝদার মানুষের সঙ্গে ওলগার পরিণয় হয়। তাদের দুজনের সংসারে দুটি সন্তান আছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি একটি প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী। সমসাময়িক সকল অনাচার, অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। সমাজকর্মী হিশেবে খ্যাত। বামপন্থি চিন্তাধারার এবং নিরামিষভোজী।

 

৩.

বর্তমান সময়ের সবথেকে সমালোচিত লেখক, কবি, অনুবাদক, নির্মাতা, নাট্যকার হচ্ছেন পিটার হ্যান্ডকে। প্রথমদিকে এই লেখক সম্পর্কে কিছুটা বলা হয়েছে। তাই তাঁর বিষয়ে বিশদ আলোচনার সুযোগ প্রয়াস না করে সংক্ষিপ্তাকারে তাঁর সম্পর্কে জানব। ১৯৪২ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি অস্ট্রিয়ার গ্রিফেন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জার্মান এক সৈন্যের সন্তান তিনি। সৈনিক সেই পিতা একসময় ব্যাংকের ক্লার্ক ছিলেন। তাঁর মা দুবার বিয়ে বসেছেন। মায়ের দিক থেকে তিনি অস্ট্রিয়ান। ডাই হরনিসেন, ক্যাসপার, উইংস অব ডিজায়ারের মতো অনেকগুলো সৃষ্টিকর্ম শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনে জ্বলজ্বল করছে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ, বেতার নাটক, দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র, স্ক্রিপ্ট লিখেছেন।

ব্যক্তি জীবনে পিটার দুবার বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথমবার ১৯৬৭ সালে। কিন্তু সে বিয়ে ১৯৯৪ সালে এসে টিকেনি। পরে ১৯৯৫ সালে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। অদ্যাবধি তার সাথেই সংসার করছেন ৭৬ বছর বয়স্ক পিটার। দুই সংসার মিলে তাঁর সন্তানের সংখ্যা দুটি। রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য বরাবরই পিটার সমালোচিত। তাঁর নোবেল প্রাপ্তিতে পেন ইন্টারন্যাশনালসহ প্রায় সব শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন ও ব্যক্তি সমালোচনার ঝড় তুলেছেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads