• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

সাহিত্য

লালন ফকির মানবতার মূর্ত প্রতীক

  • বঙ্গ রাখাল
  • প্রকাশিত ১৯ অক্টোবর ২০১৯

মানুষের মনোজগৎ কিংবা জীবজগতের অপার রহস্যের সন্ধান যারা করে গেছেন বা করে যাচ্ছেন তারা সন্ন্যাস- যোগী বা সাধক। তারা মনে করেন হূদয়মাঝে পাওয়া যায় সব প্রশ্নের উত্তর। যে কারণে তারা শুধু নিজের সাধনা কাজেই নিজেদের ব্যস্ত রাখেন না, মানবতার বাণীও প্রচার করে থাকেন। তাদের সাংসারিক কিংবা পারিবারিক কোনো চিন্তা তারা করেন না; তবে নিজের আত্মাকে শুদ্ধি করতে চান। কেননা তারা জানেন এই মহাপৃথিবীতে যা আছে এই মানব হূদয়ের মধ্যেও তা বিরাজমান। এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই তত্ত্বসাহিত্যে। এই তত্ত্বসাহিত্যের একটি অংশ ‘বাউল’। এই বাউল ধারাটি প্রাচীনযুগ থেকে প্রবাহিত হয়ে আসছে এবং তা পূর্ণাঙ্গরূপে সম্প্রসারিত হয়েছে যার মাধ্যমে তিনি বাউল সম্রাট হিসেবে মনোনীত লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০)। এই মতাদর্শন বা দর্শন যা কিছুই বলি না কেন- লালনই এই ধর্মদর্শনকে জীবন্ত এবং যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন। বাউলদের এই মতবাদ, ধর্মমতে গুরুসাধনা কিংবা ভক্তি, অনুরাগ বা ভাবের আদান-প্রদানের জ্ঞান তাদের করে তুলেছে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তবে তাদের এই জ্ঞান, দর্শন, মতবাদ কিংবা বৈরাগী হয়ে ওঠা একদিনে গড়ে ওঠেনি। এটার রয়েছে একটা দীর্ঘদিনের ইতিহাস, ঐতিহ্য। বাউলদের আচার-আচরণ, স্বভাবের মধ্যেও রয়েছে সাধারণ জীবনযাপনের ছাপ। যে কারণে তাদের জীবন্ত জীবন থাকলেও মরার মতো জীবনকে আপন করে নিতে হয়। বিসর্জন দিতে হয় কামনা-বাসনাকে বা দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিতে হয়। আমরা গ্রামগঞ্জে যাদের সাধু বলি। আসলে সাধুর ভেকধারণ করা সহজ।

লালন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ড উপজেলার হরিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই মত নিয়েও অনেকে দ্বিমত পোষণ করেছেন তবে বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসের মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় বলা হয়েছে লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে।

লালনের জাত, ধর্ম, বর্ণ, জন্ম নিয়ে আমাদের বাউল সাহিত্যে যে পরিমাণ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে তা হয়তো অন্য কোনো বিষয় নিয়ে এভাবে সৃষ্টি হয়নি। তিনি এসব নিয়ে কখনো ভাবেননি। কারণ তার হূদয়জুড়ে রয়েছে সমাজসচেতনতা, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও প্রগতিশীলতার ভাবনা। গানকে তিনি তার বাণী করে এক মহান সমাজসংস্কারের দায়িত্ব পালন করেছেন। সামাজিক কিংবা মানবিক যে গান তাকে সমৃদ্ধি এনে দিয়েছে, সে গান শুধু তিনি নিজের জন্যই গাননি, তা একই সঙ্গে শিষ্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দিয়েছেন। লালন ফকির নিজের কুটিরে বসেই শিষ্যদের দিয়ে গেছেন আধ্যাত্মিকতা ও আত্মদর্শনের শিক্ষা। যে কারণে একজন লালন গাইতে পারেন— ‘জগৎ বেড়ে জাতের কথা/লোকে গৌরব করে যথাতথা/লালন সেই জাতের ফাতা/বিকিয়েছে সাত বাজারে।’

লালনের গানের সারকথা হলো প্রতীকী জাতিভেদের অন্তঃসারশূন্য বক্রোক্তি আরোপন করা। যেখানে তিনি সমাজের ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত, তাদের উপহাস করে এক ধরনের বিদ্রোহী গানের আনয়ন করেছেন। তিনি তার দীর্ঘজীবন ধরেই মানুষের জয়গান করেছেন, যা তাকে একজন মানববাদীর প্রবক্তায় রূপান্তরিত করেছে। প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন মানবতার সেই সব হূদয় ছুঁয়ে যাওয়া গান যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আসল পদার্থ চিনিয়ে একজন সচেতন মানুষ হতে সাহায্য করে। দুঃখের ব্যাপার আজ আমরা যে মানবতাহীন সময় অতিবাহিত করছি, সেই মুহূর্তে আমাদের জন্য লালনের বাণী খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। লালন আত্মার শুদ্ধতার জন্য সাধনা করেছেন আর এই সাধনার একমাত্র উপাদান মানুষ। এই মানুষ ছাড়া কেউ কোনোদিন সাধনাই সিদ্ধিলাভ করতে পারবে না। লালন গাইলেন— ‘এই মানুষের আছেরে মন/তারে বলে মানুষ রতন/লালন বলে পেয়ে ধন/পারলাম না চিনিতে।’

মানুষের মাঝেই বিরাজমান আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর, গড। মানুষই লালনের কাছে পূজনীয় এবং একমাত্র সাধনার ধন। জীবদ্দশায় তিনি যা ধারণ করেছেন তা আজও জীবন্ত হয়ে আছে তার শিষ্যদের মাঝে এবং সাধারণ মানুষও তাকে মনের কুটিরে জায়গা দিয়েছে। ঘর-বাড়ি, জাত ছোট-বড় যা একজন মানুষকে আলাদা করে; লালন ফকির সেসব কিছুর ঊর্ধ্বে একজন মানুষ। সে জন্যই আজ লালন সবার লালন হয়েই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। মানুষ ছাড়া মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। মানুষের এই দেহের মাঝেই আছে মসজিদ, মন্দির। জ্ঞানসাধনার মাধ্যমেই মানবমুক্তি পথ। আর লালন ফকির সেই পথই বেছে নিয়েছিলেন। এ জন্যই তিনি আজো আমাদের প্রাসঙ্গিক একজন সত্যের পথ প্রদর্শক হতে পেরেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মনের মানুষ, অচিন পাখি কিংবা মানুষ-রতন সবই এই অবিনাশী দেহের মধ্যেই চলাফেরা করে।

মানবপ্রেমিক, মানবতার কবি লালন ফকির জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবমুক্তির সংগ্রামে দীর্ঘ জীবনে গানের সাধনা করে গেছেন এবং বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন মানবতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার গভীর দায়িত্ববোধ থেকে। সেই সাথে নিজের অন্তর যাতনাই বিদগ্ধ  হয়ে বসে থাকতেন আর নির্জীব সুরে গাইতেন— ‘কে কথা কয়রে দেখা দেয় না/উড়ে চড়ে হাতের কাছে/খুঁজলে জনম ভর মেলে না।’ আর এ কারণেই লালনের বাণী পেয়েছে অমরত্বের সন্ধান আর তিনি হয়েছেন সবার। ৎ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads