• মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
অনুবন্ধ

ছবি : বাংলাদেশের খবর

সাহিত্য

ধারাবাহিক উপন্যাস

অনুবন্ধ

  • প্রকাশিত ১৯ অক্টোবর ২০১৯

শ্রাবণী প্রামানিক

 

হয়তো প্রথমবার মা-বাবার কোনো নির্দেশনা পাওয়ার আগেই পদ্মাকে নিজের মনে ঠাঁই দিলেন। এবং তার জন্য মাকে নিজের কাছে সন্তুষ্ট বলে মনে হলো। বউভাতের পরের ফজরের নামাজে দাঁড়ালো পদ্মা আমাদের সাথেই। ওর স্তব্ধ গভীর ঘুম ভাঙাতে আজানের ধ্বনিই যথেষ্ট হলো।

দগদগে ঘা শুকিয়ে যাওয়ার পর কাপড়ের আড়ালে ঢেকে নিলেই যেমন স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যায়— আজ আমাদের বাড়ির সকালটাও তেমনি চলতে লাগল। বাবা কলেজ যাবেন আটটায়; সাথে আমিও। ফুলদি এখন ছুটিতে। ছুটি শেষে ও ফিরে যাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফুলদি বলে— রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ওর দ্বিতীয় প্রেম! প্রথম প্রেমের নাম ও মুখে উচ্চারণ করে না।

পদ্মা নামাজ শেষে হেঁসেলে গেলো; নিজেই! মা হেঁসেলে গিয়ে প্রচণ্ড অবাক হলেন। কিন্তু ওকে কিছু বুঝতে দিলেন না এবং মা কোনো কাজও দিলেন না বিশেষ। তবু পদ্মা বসে রইলো ঠায়। নুয়া আপা আনাজপাতি কাটতে কাটতে বললো— পদ্মা তুমি ঘরে যাও। এখন হেঁসেলে তোমার কাজ নাই তো।

পদ্মা মুখে কিছু বললো না; আবার উঠেও এলো না। নুয়া আপা বুঝলো— পদ্মা এই বাড়ির বউ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। বারান্দায় পাতা হয়েছে ফরাস। গরম গরম ভাতে মাসকলাই ডাল আর বাঁধাকপির ঝালঝাল তরকারি মেখে খেতে খেতে আমাদের কলেজে যাওয়ার সময় শেষ হয়ে এলো। ইদ্রিস চাচাও আমাদের সাথে বসে খেয়েছেন। তবে দাদাভাই বা দুলাভাইকে দেখতে পাওয়া গেল না। মা বা নুয়া আপা যখন বললেন— জানি না তো! তখন বুবু খুব সহজ স্বরে বললো— দাদাভাই তোর দুলাভাইয়ের সাথেই আছে। কোথায় আছে? প্রশ্নটা আমার ঠোঁটের প্রান্তে এসে আটকে গেল। বড় দুলাভায়ের শরীরের আড়ালে দাদাভাইয়ের পা দুটো চলছে; মাথাটা নিচু। আর বাবা ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দার সিঁড়িতে পা রাখলেন। শাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত হাতে ছাতা, সাথে ইদ্রিস চাচা। বাবা সামনে তাকিয়ে সরল হাসলেন— ফিরাজা...আম্মা...বড় জামাই আর সজীবকে ভাত দাও। বাবা নুয়া আপাকেই উদ্দেশ্য করে বেশ গলা চড়িয়ে কথাটা বললেন— কিন্তু নুয়া আপা তো বাবার পাশেই! বাবা কি হেঁসেলে থাকা মা’কেও জানিয়ে দিলেন এই বার্তা? এমনকি মায়ের সাথে থাকা পদ্মাকেও?

আমি— মা আমি যাচ্ছি, বলে বাবার পিছু হাঁটি, ডান হাতে কাঁধের ওপর শাড়ির আঁচল আর একটু গুছিয়ে নিতে নিতে। কলেজের জন্য দুইখানা শাড়ি আলাদা তোলা থাকে। যুদ্ধের পর পদ্মার বউভাতের লাল টকটকে শাড়িটা প্রথম এলো আমাদের বাড়িতে। ভাঁজ ভাঙা নতুন শাড়ি পরার আনন্দটাও যুদ্ধের সাথে চলে গেছে; যেমন চলে গেছে রাঙা আপা...গোলার ধান...দুধেল গাই বা বাবার জমানো খুচরা খুচরা টাকার থলে।

এই শাড়ির পাড়ে খুব অল্প সোনালি জড়ির কাজ। ধোয়ার পর তারে খুব টানটান না ছাড়িয়ে দিলে পাড়টা যে কুঁচকে থাকে, সেরকম ভাবে পরে কলেজে বা অন্য কোথাও গেলে আমার মনটা কেমন খচখচ করে। আজও তেমন খুঁতখুঁতে মন নিয়ে গোটা দিনটা পার করে দিতে হবে!

উচ্চমাধ্যমিক বলার চলনটা আমাদের তেমন ছিলো না, বলতাম— আইএ। বিজ্ঞান শাখায় আমার আইএ দ্বিতীয় বছর। বাবা এখানেই অফিস সহকারী। কথা ছিলো ’৭১-এ রাঙা আপা আইএ ভর্তি হবে। তার আগেই হুড়মুড়িয়ে যুদ্ধ এলো। ছিন্নভিন্ন হলো চরাচর। দাউদাউ জ্বলেছে যে আগুন, ছাই হয়েছে ফসলের মাঠ। আমাদের ধানের গোলা পোড়া ছাই মাটতে মিশে গেল নির্বিকার। বাবার আনা কষ্টের ধান...ক্ষুধার ধান...অপমানের ধান...! সেই পোড়ামাটির বুকে অপমান ভুলে একসময় জন্ম নিলো ঘাস। আমার নিজেকে সেই পোড়ামাটির বুক চিড়ে বের হওয়া ঘাস মনে হয়। মনে হয়— রাঙা আপা যে বেঞ্চটাতে বসে শিখতে চেয়েছিলো— প্রাণীর জীবন চক্র, সেই পুড়ে যাওয়া বেঞ্চটাতে এখন বসি আমি! আমার কিছু করার থাকে না! প্রকৃতির হাতে জিম্মি আমি। থেমে থাকা আমার জন্য অসম্ভব। আবার চলতে চলতে একদিন টুপ করে ঝরে যাবো, শুকিয়ে যাওয়া পাতা যেমন ঝরে যায়। আমরা শুধু জানি না, কখন আসবে সেই মুহূর্ত!

একটা বই শেষ করে আর একটা খোলার মতো আমার জীবনে সমাপ্ত করা বইয়ের সংখ্যা বেড়ে বেড়ে চালতা গাছের বয়স সমান। নতুন বই খোলা পড়ে আছে সামনে, পৃষ্ঠা নম্বরহীন। জানি না কবে শেষ হবে এই বেয়ে বেয়ে নামা-ওঠা! মনে হয়, যতটা উঠে এসেছি; আমার সমস্ত অতীত আমার সঙ্গে এসেছে। আমার শরীর ধাবিত হয় নতুনের দিকে, আমি পরিত্যক্ত খনি ঘেঁটে পোড়া কয়লা তুলে আনি অথবা মাটি। আমার কাছে মনে হয় জ্বলজ্বলে হীরা! তাই আমার ক্লান্তি আসে না। আমি স্মৃতি খুঁড়ে খুঁড়ে নেমে যাই আরো গভীরে।

সেদিন বাড়ি ফিরে শুনি দাদাভাই হারিয়েছে! সকালে বাড়ি ফেরার পর দুলাভাইয়ের সাথে বারান্দায় পাতা ফরাসে দাদাভাইয়ের জন্যও ভাতের থালা সাজিয়ে দেওয়া হলো। নুয়া আপাকে বেশ করে ডাকতে হয়েছিলো অবশ্য— দাদাভাই এসো...দাদাভাই? তোমার ভাত যে পান্তা হয়ে যায়! ওদিকে বুবু আর বড়দুলাভাই বাড়ি ফিরতে নিজেদের গুছিয়ে নেয় ঝটপট। আমরা কলেজের জন্য বের হওয়ার মুখে বুবু চট করে এসে বাবার পা ছোঁয়— বাবা আমরা এখনই চলে যাবো।

- কী বল আম্মা? আজই যেতে হবে?

এই সময় বড়দুলাভাই ভাত খাওয়া শেষে তড়িঘড়ি হাত ধুয়ে— আব্বা আজই যাওয়া লাগবে... এবারের মতো মাফ করেন আব্বা। আসা-যাওয়া তো আছেই। আবার আসবো।

- ঠিক আছে। পরের বার আমার দাদুভাইদের অবশ্যই সাথে আনবে। সাবধানে যাবে।

আমি বুবুর গলা জড়িয়ে ধরলাম। বুবু আমার কপালে ঠোঁটের পরশ দিলো। আমাদের বিদায় হলো। বহুবার ডাকাডাকি করে দাদাভাইকে এনে ভাত খাওয়ানোও হলো। কিন্তু দাদাভাই আমূলে বদলে যাওয়া হিসেবে একজন নতুন মানুষে পরিণত হলো। কথা বলে না কারো সাথে। তাকায় না কারো দিকে। ভাত খেয়ে উঠে গেলো চুপ করে। মা একবার বলেছেন— সজীব...বাপজান— একবার বড় ঘরে আয় তো।

দাদাভাই মায়ের মুখের দিকে তাকায়নি বা মুখেও কোনো শব্দ করেনি। উঠে চলে গেছে নিজের ঘরে। তারপর মা নুয়া আপা ব্যস্ত হয়ে যায় সংসারের খুঁটিনাটিতে। পদ্মা কখনো আমাদের খোঁয়াড়ে আবার কখনো মা বা নুয়া আপার পায়ে পায়ে ঘুরেছে। ফুলদি মুখে বই গুঁজে বসে থেকেছে সারাবেলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি ফুরালেই ওর পরীক্ষা। এসব কাজে-অকাজে বেলা গড়িয়ে যায়। খাড়া দুপুরের রোদ খাঁ খাঁ করে উঠানজুড়ে। মা দাদাভাইয়ের নাম ধরে ডাকতে থাকে— বাপজান... সজীব... বাপ আমার... কোথায় তুমি?

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads