• শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সাহিত্য

অনুবন্ধ

  • প্রকাশিত ১৬ নভেম্বর ২০১৯

দেখিনি কখনো বাবা কাউকে দোষারোপ করছেন! তবে আজ তার আচরণে এমন বৈপরীত্য কেন দেখছি? আমি মানতে পারছি না... পারছি না। যে মানুষটা এত বছর এই সংসারের একজন হয়ে আছেন, যাকে মা-বাবা তাদের বড় সন্তানের স্থান দিয়েছেন মনে মনে, আর আমরা বড় ভাইয়ের আসন! তার বিরুদ্ধে দাদাভাইকে ভুল পরামর্শের অভিযোগ? না। না, বাবার কোথাও ভুল হচ্ছে! বড় দুলাভাই কখনো দাদাভাইকে এই পরামর্শ দিতে পারেন না বিয়েটা মানতে না পারলে, তুমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাও! এই অনুমান শুধু বাবার একান্ত ছিলো। আমাদের কারো সায় ছিলো না বাবার ভ্রান্ত ধারণায়। তবে আমরা বুঝলাম, দুলাভাইয়ের চরম অসম্মান হলো, তার প্রতি করা এই ভ্রান্ত ধারণার কারণে।

বাবার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো, তার যে কোনো সিদ্ধান্তে দাদাভাইয়ের অমত হবে না। এবং আজ সকালে বড় দুলাভাই দাদাভাইয়ের সাথে বাড়ির বাইরে কথা বলার কারণে বাবা ভেবে নিয়েছেন এরকম অদ্ভুত একটি কথা। আমাদের দ্বিতীয় চমক, দাদাভাই বাবার এই ধারণার কোনো বিরোধিতা না করে মাটির দিকে একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কেন? কেন দাদাভাই? বড় দুলাভাই খেয়াঘাট পাড়া এলে তুমি কী একটা মুহূর্তও তার কোল ছাড়া থেকেছো? মানতে পারছি না দাদাভাই! তোমার মননের এই পাতাল প্রবেশ মানতে পারছি না।

পরে... বহুকাল পরে জেনেছি, বড় দুলাভাই সেদিন তোমাকে বলেছিলেন ভাইরে... এখন তুমি বড় হচ্ছো। জীবনের ওঠানামা আসবে আর যাবে। চাইলেও তোমার সব অপছন্দকে তুমি জীবন থেকে বাদ দিতে পারবে না। পদ্মাকে মেনে নাও ভাই। আব্বা-আম্মার দোয়া তুমি সাথে পাবে। হ্যাঁ। এটুকুই, মাত্র এই কথাটাই বলবে বলে দাদাভাইকে নিয়ে নরম আলোর ভোরে বাইরে গিয়েছিলেন বড় দুলাভাই। আমার খুব কষ্ট হয়। বাবার মতো একজন আস্থাশীল মানুষ সম্পূর্ণ ভুল বুঝতে পারলেন কীভাবে? কে নাড়িয়ে দিলো বাবার এই বিশ্বাসের ভীত?

রাঙা আপা? পদ্মা? নাকি যুদ্ধ? তবু তো বাবাকে দেখতে হয়নি সেই ঘোরতর কৃষ্ণ রাত! শ্রাবণের সেই শেষ রাতে একটি জাতির বিশ্বাস হুড়মুড়িয়ে ভেঙে গিয়েছিলো! আর সেখানে ছোট একটি বাড়ির ছেলেবেলা থেকে সব বঞ্চিত একজন সামান্য চাকরিজীবীর তার সন্তান সম একক ব্যক্তির ওপর গড়ে ওঠা বিশ্বাসের ভীত কম্পন আতঙ্কে ভেঙে পড়তেই পারে! বাবা তার ভুল ধারণা নিয়েই পৃথিবী ছেড়েছেন। দাদাভাইয়ের বিয়ে এবং বাবার মৃত্যুর মাঝে ছিলো পরিপূর্ণ এক বছর। বড় দুলাভাই ওই এক বছরের প্রথম তিন মাসের মাথায় একবার এলেন, আগেও যেমন এসেছেন। সাথে বুবু এবং পলাশ-শিমুলও। বাবার আচরণে আদিম বর্বরতা। যেন তিনি গোষ্ঠীর বাইরে আর কাউকে চেনেন না। এবং দলে কেউ অন্যান করলে তাকে নির্মম বাদ দেওয়া হয়!

আমাদের কথা, আমার কথা বাবা বুঝতে চান নি। আমরা বোঝাতে পারিনি, বড় দুলাভাই কখনো অসৎ পরামর্শ দিয়ে দাদাভাইকে বাড়ি থেকে সরানোর চিন্তাই করবেন না। এবং আশ্চর্য হয়েছি পুনঃ পুনঃ দাদাভাইয়ের অবিচল রূপ দেখে। দাদাভাইয়ের মনে কী বড় দুলাভাই সম্পর্কে কোনো ক্ষোভের জন্ম হয়েছে? অথবা দাদাভাই তার ভুলের বোঝা অন্যের কাঁধে চাপিয়ে নিজেকে মুক্ত রাখলো?

আজ খুব বৃষ্টি হচ্ছে। এলোমেলো পড়ছে বড় বড় ফোঁটা। ঝোড়ো বাতাস বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে শান্তিতে ঝরতে দিচ্ছে না। আমি দাঁড়িয়ে আছি চিলেকোঠা ছাদে। আমার বাহু, ঘাড় আর মুখের ত্বকে বল্লম হয়ে ফুটছে বৃষ্টি। নিচের রাস্তায় চলমান গাড়ির হর্ন আমাকে বার বার খেয়াঘাট পাড়া থেকে এক যান্ত্রিক ধোঁয়া ভরা মায়াজালের ঢাকা শহরে এনে ছুড়ে দিচ্ছে! কিন্তু আমি থাকতে চাই না। আমি ফিরে যেতে চাই। আজ আমার অনন্ত অবসর! প্রেসক্রিপশন ওষুধের গন্ধ-রোগী কেউ নেই! তাই আমি ফিরে যেতে চাই আমার গুরুজীর আশ্রমে। বেহাগের সুরে। বৃষ্টি কমতে শুরু করেছে। কমছে ধীরে ধীরে। যেমন করে বেড়েছিলো! শেষ আর শুরুতে যদি কোন পার্থক্য নাই থাকে তবে কিসের জন্য এই হুড়োহুড়ি! এই ঝমঝমিয়ে চলা?

দাদাভাইয়ের বারান্দার খোপে যে রাতে প্রথম বউ হয়ে পা রাখলো পদ্মা, আমার আবারো কষ্ট হয়েছিলো আকাশীর জন্য! আবার পদ্মার জন্যও! সে রাত ছিলো দাদাভাইয়ের ফিরে আসার অথবা বড় দুলাভাইয়ের গায়ে কালি লাগার... তাকে ভুল বোঝার রাত।

পদ্মাকে বউভাতের লাল শাড়িতে সাজিয়ে নুয়া আপা হাত ধরে নিয়ে গেলো বারান্দার খোপে। যেমন নিঃশব্দ ছিলো পদ্মা, তেমন দাদাভাইও। মাও কেমন চুপ হয়ে আছেন। জ্ঞান ফেরার পর দাদাভাইকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তারপর যখন বড় ঘরে এসে বসলেন, বাবা তখন সেখানেই। বাবা তখনই উচ্চারণ করলেন বড় দুলাভাই সম্পর্কে তার ভ্রান্ত ধারণার কথা। আমাদের স্তম্ভিত মুখের কথা বাবা বুঝতে চাননি। বা আমরা বোঝাতে পারিনি। দাদাভাই এসেছে বড় ঘরে, সব শুনে নিশ্চুপ থেকেছে, এমন যেন— বাবাকেই সমর্থন করছে। এখন আমার মনে হয়, বাবা কি তখনই হেরে যাওয়ার ভয়টা পেয়েছিলেন? সেজন্য নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে তাকে এমন একটি ভ্রান্ত ধারণার আশ্রয় নিতে হয়েছে?

আমরা বড় ঘর ছেড়ে আসলে বাবা নুয়া আপাকে ডেকে নেন সেখানে। আমাকে নয়! যে কোনো বিষয়ে, যে কোনো সময় বাবার মুখে প্রথম আসতো আমার নাম! আমি যখন কেবল বেড়ে উঠছি, তখন থেকেই! তাই আজ মা ছাড়া আর সবাই বড় ঘর ছাড়ার পরে বাবার মুখে যখন ফিরোজা... ফিরোজা আম্মা এদিকে এসো তো!

বাবার ডাক শুনতে পেয়েছি আমরা সবাই; কিন্তু নুয়া আপা এবং আমি চমকে উঠেছি! নুয়া আপা আমার দিকে তাকিয়ে সহেলী বাবা ডাকছেন! তোমাকে নুয়া আপা। তুমি যাও। নুয়া আপা এরপর আর কথা বাড়ায়নি; বাবার কাছে যাওয়ার সময় আরো একবার আমার দিকে তাকায়। আমি কিছু বলি না। আসলে বলার কিছু ছিলো কী?

আমি বুঝেছি, তখন আমি বাবার কথার প্রতিবাদ করায় তিনি মানতে পারেননি! বাবা কখনো আমাদের কাছ থেকে দ্বিমত শুনতে অভ্যস্ত নন। কিন্তু আমরাও কী বাবাকে কখনো এরকম ভুলের ভেতরে নিমজ্জিত হতে দেখেছি? বাবা আমাদের চোখে, আমার চোখে এক আলোকবর্তিকা। তাঁকে কোনো রাহু গ্রাস করলে আমার জন্য তা মানা আত্মহননের মতো লজ্জার! নিজের সাথে বোঝাপড়া আমার শেষ হয় না। তার আগেই নুয়া আপা এসে কাঁধে হাত রাখে— ছোট, বাবা আজ রাত থেকেই পদ্মাকে বারান্দার খোপে থাকতে বলেছেন। আমি স্তম্ভিত হই আবারো। কেন? জানি না। ৎ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads