• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৬

সাহিত্য

নোবেলজয়ী লুইজ গ্ল্যুক, অজানা নিরীক্ষা

  • রায়হান উল্লাহ
  • প্রকাশিত ১৭ অক্টোবর ২০২০

কোনোকিছুর অণুপ্রেরণা কবিতা। বাকি সব সৃষ্টি তার মতো চলুক। এটি যেকোনো কবির ভাবনা। তিনি কবি হতে পারেন বলেই এমন ধৃষ্টতা। বাদ দেই প্রসঙ্গ। কবি না হলেও কবিতা ভালোবাসে; সাহিত্য ভালোবাসে; শিল্প আলোড়ন তোলে এমন মানুষতো প্রায় সবাই। বাহুল্য এত কথা বলছি ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী আমেরকাির কবি লুইজ গ্ল্যুকের কথা বলব বলে। বলব কীভাবে, তার সমন্ধে জানি কি কিছু? বলা যেতে পারে গুগল আছে। গুগলেও তিনি বেশি নেই। স্বল্প সময়ে বাংলায় তাকে খুঁজেছি। ইংরেজিতেও খুঁজেছি।

এতে যা জেনেছি তিনি একজন কবি। অধ্যাপনা করেন। ভাব বিলিয়ে যান পরিবেশে। তার ১২টি কবিতার বই আছে, প্রবন্ধও লেখেন। তার বিখ্যাত কাব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ এবং ‘ফেইথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট’। অন্য কাব্যগুলো হচ্ছে- ফার্স্টবর্ন (১৯৬৮), দ্য হাউস অন মার্শল্যান্ড (১৯৭৫), দ্য গার্ডেন (১৯৭৬), ডিসেনডিং ফিগার (১৯৮০), দ্য ট্রায়াম্ফ অব অ্যাকিলিস (১৯৮৫), ভিটা নোভা (১৯৯৯), দ্য সেভেন এইজেস (২০০১), অক্টোবর (২০০৪), অ্যা ভিলেজ লাইফ (২০০৯), পোয়েমস ১৯৬২-২০১২ (২০১২) প্রভৃতি। সাহিত্যগুণের জন্য সবসময়ই সমাদৃত লুইস। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত কবিতার বই ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ তাকে এনে দেয় পুলিৎজার পুরস্কার। ৭৭ বছর বয়সী এই সাহিত্যিক যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যানিটিজ মেডেল, ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল বুক ক্রিটিক সার্কেল অ্যাওয়ার্ড ও বলিঞ্জেন পুরস্কারসহ অনেক বড় বড় সাহিত্য পুরস্কার জিতেছেন।

তার লেখায় দেখা মেলে পারিবারিক জীবন, বাল্যকাল আর গ্রিক-রোমান পৌরাণিক কাহিনীর সাবলীল ও নান্দনিক প্রকাশ। লুইজ গ্ল্যুক ১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে এক হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যে কারণে তার বংশনাম ইদ্দিশ ভাষার অন্তর্গত। তিনি এখন ক্যামব্রিজে বসবাস করেন।

একজন শিল্পপ্রেমিক হিসেবে প্রতি বছরের সাহিত্যে নোবলজয়ী কে হন— তা জানার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকে জানার প্রাণান্ত চেষ্টা দেশে দেশে চলবে আগামী অরও কয়েক দিন। সেই জানার অবকাশ ও পরিধি থেকেই বলছি, একজন গুন্টার গ্রাস যখন ঢাকা-কলকাতা ঘুরে বেড়ান এবং তার সহযাত্রীর মুখে যখন তার বর্ণনা শুনি, তখন নোবেলজয়ী মানুষটি নানাভাবে পাশেই ঘুরতে থাকেন। একজন অ্যালেন গিন্সবার্গ যখন আমার দেশ নিয়ে কবিতা লেখেন তখন তিনি পাশের মানুষই হন। আবার তার ধোঁয়া ছাড়ার ছবি যখন আপন কেউ তোলেন তখন তিনি পাশেরই হন। এভাবে একজন বাঙালি; আরো এগিয়ে সহিত্যপ্রেমী বাঙালি নোবেলজয়ী সাহিত্যিকদের চিনে যান। যেমন আমরা এবার চিনছি মার্কিন কবি লুইজ গ্ল্যুককে।

খোদ নোবেলসংশ্লিষ্ট সুইডিস কমিটি বলছে, মার্কিন সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য গ্ল্যুককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে ইতিহাসে ১৬তম নারী হিসেবে নোবেল পেলেন লুইস গ্ল্যুক। ১৯৯৩ সালে নোবেল পাওয়া বিখ্যাত উপন্যাসিক টনি মরিসনের পর এই প্রথম কোনো আমেরিকান নারী সাহিত্যিকের এ সম্মাননা লাভ। নোবেল কমিটি বলছে, লুইস হলেন আমেরিকার বর্তমান সাহিত্যজগতের সেরাদের অন্যতম। মার্কিন সাহিত্যে লুইসের অবদানের বিষয়ে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান আন্ডেরস ওলসন বলেন, তার লেখায় রয়েছে রসবোধের তীব্র উপস্থিতি, সরলতা, আর দৃঢ়তা। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতার বই ফার্স্টবর্ন। এ বইয়ে তার লেখার ছন্দ আর সাহিত্যবোধের যে প্রকাশ তার প্রশংসা করতে ভোলেনি নোবেল কমিটি। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তার সব কাজেই স্পষ্টবাদিতার প্রয়াস লক্ষণীয়। শৈশব ও পারিবারিক জীবন এবং বাবা-মা আর ভাইবোনের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক সবসময় তার কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। তিনি মিথ ও শাস্ত্রীয় মোটিফ থেকে প্রেরণা নিয়ে বিশ্বজনীন হওয়ার চেষ্টা করেছেন। টেকনিকের অভিনবত্ব, সেন্সিটিভিটি তথা স্পর্শকাতরতা তার কবিতার অস্থিমজ্জায়। কবিতার শিল্পপ্রকৌশলগত ভিন্নতার কারণে তিনি বহুল প্রশংসিত।

কিন্তু এখন আমাদের শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্ভর করলে হবে না, বরং গ্ল্যুকের সৃষ্টি পড়তে হবে। লুইজ গ্ল্যুক একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাব্যকলা পড়িয়েছেন। লঙ সারা লরেন্স কলেজ, উইলিয়াম কলেজ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাব্যকলা পড়িয়েছেন। বর্তমানে কানেকটিকাটের নিউ হেভেনের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এই কবি। ভাবার চেষ্টা করছি একজন কবি জগতের অধীশ্বর একটি দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাব্যকলার ক্লাস নিচ্ছেন; কেমন দৃশ্য হবে। আমার চোখে এটি চমৎকার একটি মোহলাগা ক্ষণ। এমন ক্ষণের স্বাক্ষী যদি কোনোভাবে হতে পারতাম। আর এমন ক্ষণের নিয়ন্তা কত না ক্ষমতাধর। গ্ল্যুক সেই ক্ষমতাধর মানুষ।

সমাজ কাউকে তুলে ধরলেই আমরা তাকে চিনি এ অক্ষমতা নিয়েই বলি দেখা যাবে গ্ল্যুক এবার অনুবাদ হবে; হয়তো তিনি এদেশে আসবেন। ফলে তাকে জানা হবে। তাকে নানাভাবে এখন আমরা সংগ্রহ করব। এমন ক্ষণে গুগল হাতড়ে পড়েছি— আমাদের এক প্রবাসী কবির গ্ল্যুককে দেখার সময়। এতে তিনি গ্ল্যুকের সঙ্গে তার দেখা হওয়ার একটি ক্ষণ বর্ণনা করেছেন। গ্ল্যুক কবিকে বলছেন- একজন কবি কীভাবে দেশ ছেড়ে বাঁচে? এ কথাটি থেকে গ্ল্যুককে ‘অদেখা’ আবিষ্কার করছি। তিনি সত্যিই আরাধ্য; সাহিত্যে, দেশপ্রেমে, সংস্কৃতিতে।

তবে উইকিপিডিয়া বলছে, গ্ল্যুককে মাঝে মাঝে আত্মজীবনীমূলক কবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এ কথাটি মনে ধরেছে। পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্যিক-কবি চেতনে-অবচেতনে সাহিত্যে তাকেই বলে গেছেন। নানাভাবে এটি হয়েছে। এ ছাড়া কোনো গতি নেই বলে আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানের মতো। মতান্তর থাকতে পারে তবে আমি বলব, শিল্প শিল্পীকেই উপস্থাপন করে। জানা যায়, গ্ল্যুকের বাবাও কবি হতে চেয়েছিলেন। পরে ব্যবসায়ী হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। হয়তো তার ব্যবসায়ী হওয়ার ফলেই গ্ল্যুকের কবি হয়ে ওঠা। বাবার জিনই তার মধ্যে প্রবাহিত। পয়েটস অ্যান্ড রাইটারস ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্ল্যুক তার জীবন ও কাজের মাঝে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে বলেন, আপনি যদি আপনার প্রকৃত কাজ খুঁজে পান তবে আপনি বাস করতে পারবেন।

শেষের কথা এই, লুইজ গ্ল্যুক একজন নাগরিক কবি। একজন আধুনিক কবি। একুশ শতকের অগ্রণী কবি। তিনি পাঠ হবেন নিরন্তর। ৎ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads