• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
অনশনে অসুস্থ শিক্ষকরা চিকিৎসা নিচ্ছেন না

এমপিওভুক্তির দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে আমরণ অনশনে শিক্ষকরা

ছবি : বাংলাদেশের খবর

জাতীয়

অনশনে অসুস্থ শিক্ষকরা চিকিৎসা নিচ্ছেন না

বহু শিক্ষক শারীরকভাবে দুর্বল

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৬ জুলাই ২০১৮

খুলনা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার রাস্তার পাশে ফুটপাথের ওপর পলিথিন বিছিয়ে শুয়ে আছেন। মুখটা শুকনো। বার বার ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছেন জিহ্বা দিয়ে। একটানা অনশন করে যাওয়ায় তার মুখাবয়বে এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। গতকাল ছিল অনশনের ১১তম দিন। এদিন তিনি কোনো স্যালাইনও নেননি। নেননি চিকিৎসা। কারণ আগের দিন বুধবার বলেছেন, বৃহস্পতিবার থেকে অনশনরত শিক্ষকরা কোনো স্যালাইন কিংবা চিকিৎসা নেবেন না। এ প্রতিজ্ঞা রক্ষায় গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলারের মতো বহু শিক্ষক দুর্বল হয়ে পড়েছেন, যা গত বুধবারের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। ওইদিন পর্যন্ত অনশনে ২শ’র বেশি শিক্ষক চিকিৎসা নেন।

আন্দোলনরত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি গতকাল বিকালে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, গত কয়েক দিন সরকারের বিভিন্ন দফতরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বিষয়ে আলোচনা হলেও বৃহস্পতিবার (গতকাল) কোনো আলোচনা হয়নি। বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকালও শিক্ষকরা অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন।

অনশনে অংশ নেওয়া শিক্ষকরা বলেছেন, সারা দেশে প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে আসছেন। তারা পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা দিতে না পেরে নিজেরাই বোঝা হয়ে গেছেন। অপরদিকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাও নেই। একটি স্বাধীন দেশে জাতি গড়ার কারিগররা সরকারের খামখেয়ালিপনায় তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে, এ শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের কোনো দায়দায়িত্ব নেই। তারা বলেন, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী এমপিওভুক্তির প্রতিশ্রুতি দিলে শিক্ষকরা আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন। কিন্তু এমপিওভুক্তি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় শিক্ষকরা হতাশ, ক্ষুব্ধ। সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, শিক্ষামন্ত্রী প্রহসনের এমপিও নীতিমালা করে শিক্ষকদের রাজপথে ঠেলে দিলেন। দিন-রাত রোদ-বৃষ্টির মধ্যে শিক্ষকরা পরিবার-পরিজন ছেড়ে রাজপথে মানবেতর পরিবেশে আমরণ অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

গতকাল সরজমিনে দেখা গেছে, অনশনের ১১তম দিনে এসে অসুস্থ শিক্ষকরা আর চিকিৎসা নিতে চাইছেন না। একটি বেসরকারি মেডিকেল টিম চিকিৎসা সেবা দিতে এলে তাদের ফিরিয়ে দেন শিক্ষকরা।

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সম্পাদক ড. বিনয় ভূষণ রায় বলেন, অনশনের ১১ দিনে ২শ’র বেশি শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অসুস্থ শিক্ষকরা হাসপাতালে ভর্তি হতে চাইছেন না। এখন থেকে তারা স্যালাইন ও চিকিৎসা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। একটি বেসরকারি মেডিকেল টিম চিকিৎসা দিতে এসেছিল। কিন্তু শিক্ষকরা তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর শিক্ষকরা যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটা যদি তিনি (প্রধানমন্ত্রী) দেখেন, তাহলে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে তারা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। এমপিওভুক্তির বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি এভাবেই চলবে বলে জানান তিনি।

আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলেন, গত ১২ জুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করা হয়েছে। এই নীতিমালা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান অনুমতি ও স্বীকৃতির সময় আরোপিত শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। চলতি ২০১৮-১৯ বাজেটে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দের কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা নেই। ফলে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা একেবারেই হতাশ। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে সারা দেশের নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে এমপিওভুক্তি হলে সবাই সন্তুষ্টচিত্তে বাড়ি ফিরে যাবেন।

সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) দাবিতে গত ১০ জুন থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান করে আসছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সরকার থেকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় ২৫ জুন থেকে তারা আমরণ অনশন করছেন। ২০১০ সালের পর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়নি। স্বীকৃতি পাওয়া নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ৫ হাজার ২৪২টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী আছেন প্রায় ৮০ হাজার। গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে টানা পাঁচ দিন আমরণ অনশনের পর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার তৎকালীন একান্ত সচিব সাজ্জাদুল হাসান এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিলে আন্দোলন স্থগিত করেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের যে বাজেট বক্তৃতা দেন, সেখানে নতুন এমপিওভুক্তির বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য না থাকায় গত ১০ জুন থেকে ফের রাজপথে নামেন তারা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads