• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
কোটা ‘অলমোস্ট’ বাদ!

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে রামপুরায় বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করে ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

ছবি : বাংলাদেশের খবর

জাতীয়

কোটা ‘অলমোস্ট’ বাদ!

#মুক্তিযোদ্ধা ইস্যুতে কিছুটা দোটানায় সরকারি কমিটি #‘প্রহসন’-এর অভিযোগ আন্দোলনকারীদের

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৪ আগস্ট ২০১৮

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি ‘অলমোস্ট’ বাতিলের পক্ষে প্রাথমিকভাবে সুপারিশ করার কথা জানালেও মুক্তিযোদ্ধা ইস্যুতে দোটানায় রয়েছে সরকারি কমিটি। এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হবে। আদালত বাতিল করে দিলে কোটা থাকবে না। আর যদি আদালত বলেন, ওই অংশটুকু সংরক্ষণ করতে হবে, তাহলে সেটি বাদে বাকিটুকু উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এখন সময় এসেছে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় যাওয়ার। সব মিলিয়ে কোটা সংস্কার, বাতিল ও পর্যালোচনায় গঠিত কমিটির প্রাথমিক সুপারিশ হলো কোটা ‘অলমোস্ট’ উঠিয়ে দিয়ে মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে কথাগুলো বলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও ওই কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শফিউল আলম।

মুক্তিযোদ্ধা ইস্যুতে উচ্চ আদালতের একটি আদেশের কারণে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম ‘অলমোস্ট’ বা প্রায় শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তবে সরকারের বিরুদ্ধে ‘প্রহসনের’ অভিযোগ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান মামুন বলেছেন, আমরা কোটা সংস্কার চেয়েছি। বাতিলের কোনো উদ্যোগ আমরা মানি না। মোহাম্মদ শফিউল আলমের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে হাসান আল মামুন গণমাধ্যমকে এভাবেই তার প্রতিক্রিয়া জানান।

কোটা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে সুপারিশ দিতে গত ২ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তবে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে না পারায় তিন মাস সময় বাড়ানো হয়। কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ বিষয়ে বলেন, কোটা নিয়ে সুপারিশ প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছি। আমরা ‘মেরিটকে’ (মেধা) প্রাধান্য দিয়ে ‘অলমোস্ট’ (প্রায়) কোটা উঠিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করব। সরকারি চাকরিতে দেশে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা আছে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০, জেলা ও নারী কোটা ১০ শতাংশ করে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কোটা পাঁচ এবং এক শতাংশ আছে প্রতিবন্ধী কোটা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রবর্তন করা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর এই কোটার সুবিধা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরও দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে তা নাতি-নাতনিদেরও দেওয়া হয়। এটি নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে। এর বাইরে নারীদের জন্য ১০, অনগ্রসর জেলার বাসিন্দাদের জন্য ১০, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য এক শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রয়েছে। আর সেসময় থেকেই প্রধানত জামায়াতপন্থিরা এই কোটা বাতিলের দাবিতে একাধিকবার আন্দোলনে নেমে ব্যর্থ হয়। তবে এবার কোনো বিশেষ কোটার কথা না বলে শুধু সংস্কারের দাবিতে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে গত ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলন শুরু হয়। তারা সব মিলিয়ে কোটা ১০ শতাংশ করার দাবি জানাচ্ছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ থেকে ১১ এপ্রিল নানা ঘটনার পর ১১ এপ্রিল সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো কোটা থাকবে না। তবে গত ১২ জুলাই তিনি সংসদে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায় রয়েছে। এখন এটি বাতিল হলে তিনি আদালত অবমাননায় পড়বেন। তাহলে কমিটি যে কোটা তুলে দেওয়ার সুপারিশ করতে যাচ্ছে, তা কীভাবে সম্ভব- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আমাদের কমিটি মোটামুটি সুপারিশ ঠিক করেছে। আর তা হচ্ছে কোটা অলমোস্ট উঠিয়ে সরাসরি মেধায় চলে যাওয়া। তবে সুপ্রিম কোর্টের একটি অবজারভেশন আছে। সেটা হলো, মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণ করতে হবে অথবা খালি থাকলে তা পূরণ করতে হবে। এর ওপর কমিটি কোর্টের মতামত চাইবে। তবে এটাকেও যদি রহিত করে দেওয়া হয়, তাহলে কোটা একেবারেই থাকবে না। আর কোর্ট যদি ভারডিক্ট (রায়) দেন, ওই অংশটুকু (মুক্তিযোদ্ধা কোটা) রাখতে হবে তাহলে ওইটুকু রেখে বাকি সব কোটা তুলে দেওয়া হবে। এটা আমাদের কমিটির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ৫ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা সংক্রান্ত একটি রিট কিছু পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়ে নিষ্পত্তি করে দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মামনুন রহমান এবং বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের এই রায়ে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ চাকরি সংরক্ষণ (কোটা) অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। রায়ে আরো বলা হয়, কোনো ক্ষেত্রে কোটা পূরণ যদি সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে পদ খালি রাখতে হবে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই রায়ের পর্যবেক্ষণের কিছু অংশ বাদ দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেন। আপিলের রায়েও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য চাকরিতে ৩০ শতাংশ পদ সংরক্ষণের বিষয়টি বহাল রাখা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিষয়ে আদালতের এই বক্তব্য আদেশ নাকি পর্যবেক্ষণ- এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, আমরা এই নির্দেশনা পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। তাই আমরা কোর্টের কাছে যাব।

কোটা উঠে গেলে পিছিয়ে পড়া জেলার বাসিন্দারা কীভাবে সুবিধা পাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছি, ওনারাও (পিছিয়ে পড়া জেলার চাকরি প্রার্থী) অগ্রসর হয়ে গেছেন। এখন সময় হয়েছে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় যাওয়ার। খুব শিগগিরই কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

কোটা সংস্কার চেয়েছি, বাতিলের উদ্যোগ না মানার কথা বললেন হাসান মামুন : সরকারের বিরুদ্ধে ‘প্রহসনের’ অভিযোগ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের প্লাটফর্ম ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেছেন, আমরা কোটা সংস্কার চেয়েছি। তাই বাতিলের কোনো উদ্যোগ আমরা মানি না।

‘আদালত বাতিল করে দিলে কোটা থাকবে না’ সরকারের এমন অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে মামুন বলেন, আমরা চাই ৫ দফার আলোকে কোটার একটি যৌক্তিক সংস্কার। যে কয়েক ধরনের মানুষের জন্য বর্তমানে কোটা বরাদ্দ রয়েছে তাদের সবার জন্যই কিছু সংখ্যক আসন থাকুক। তবে সেটা বর্তমানের মোট ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০, ১৫ বা ২০ শতাংশ করা যেতে পারে। আমরা কখনো কোটা সম্পূর্ণ বাতিল চাইনি, এখনো চাই না। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বক্তব্যের বিষয়ে মামুন বলেন, সরকার চাচ্ছে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও উপজাতিদের জন্য আলাদাভাবে বিশেষ নিয়োগের ব্যবস্থা করতে। এ প্রস্তাব আমাদের আগেই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটা আমরা মানিনি। যদি বিশেষভাবে তাদের নিয়োগই দেওয়া হয় তাহলে মূল নিয়োগ পরীক্ষা থেকে কোটা বাদ দেওয়ার কোনো অর্থই হয় না। আদালতের বিষয়টি বলে মূলত সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে মামুন বলেন, ওটা রায় নয়, আদালতের পর্যবেক্ষণ। পর্যবেক্ষণ মানা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। আমাদের ওপর দমন নিপীড়ন বাড়ানোর জন্যই আদালতের কথা বলে সময় নষ্ট করা হচ্ছে- অভিযোগ সংস্কার আন্দোলনের এই নেতার।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads