• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
কেমন আছেন গ্রেনেড হামলায় আহতরা

২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা

সংরক্ষিত ছবি

জাতীয়

কেমন আছেন গ্রেনেড হামলায় আহতরা

  • আজাদ হোসেন সুমন
  • প্রকাশিত ২০ আগস্ট ২০১৮

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার সমাবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় আহতদের একজন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মাহবুবা পারভীন। তিনি মাথায় দুটিসহ শরীরে ১ হাজার ৮০০ স্প্লিন্টার নিয়ে বেঁচে আছেন, যেন এক জীবন্ত লাশ। দিনে ২ ঘণ্টার বেশি ঘুম হয় না। সেই ভয়াল স্মৃতি মনে হলেই চিৎকার করে ওঠেন।

আহত মাহবুবা পারভীন ২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বর স্বামীকে হারান। তারপর থেকে দুই সন্তান আসিফ ও রুশাদকে অবলম্বন করে সাভারের ব্যাংক কলোনির বাসায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন তিনি। বড় ছেলে আসিফ পারভেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ পড়ছেন আর রুশাদ জুবায়ের পড়ছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে।

গতকাল বাংলাদেশের খবরকে মাহবুবা বলেন, ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার সময় আইভি রহমানের পাশে দাঁড়িয়ে নেত্রীর (শেখ হাসিনা) বক্তব্য শুনছিলাম। একপর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেত্রী কথা আছে বলে আমাকে সেখান থেকে একটু দূরে সরিয়ে নেন। তখনই শুরু হয় মুহুর্মুহু গ্রেনেড হামলা। বৃষ্টির মতো গ্রেনেডের স্প্লিন্টার মাথাসহ পুরো শরীরের গেঁথে যায়। জ্ঞান হারাই। সেদিনের বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার পর আহত ও নিহতদের নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, মৃত ভেবে মাহবুবাকে লাশের সঙ্গে রেখে দেওয়া হয়েছিল। লাশঘরে বেওয়ারিশ অবস্থায় পড়েছিলেন অনেকক্ষণ। এ অবস্থায় তাকে ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি ফখরুল আলম সমর (বর্তমানে সাভার তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান) ও সাংবাদিক কামরুজ্জামান খান (বর্তমানে ভোরের কাগজ পত্রিকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত) তাকে জীবিত অবস্থায় শনাক্ত করে প্রথমে নিয়ে যান ধানমন্ডির নিবেদিতা নার্সিং হোমে। ওই রাতেই সেখান থেকে নিয়ে আসা হয় মহাখালীর মেট্রোপলিটান হাসপাতাল এবং পরদিন সকালে নেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। পরে আহত অবস্থায় শেখ হাসিনার নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে। ঘটনার ২৫ দিন পর পিয়ারলেস হাসপাতালেই মাহবুবার জ্ঞান ফেরে।

বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে মাহবুবা বলেন, এত চিকিৎসার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারিনি। প্রতি রাতেই স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠি। বেশি যন্ত্রণা হয় মাথায়। সামনের কয়েকটি দাঁতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছে, একটা কানে কিছু শুনতে পাই না। তিনি বলেন, প্রায় ৭-৮ বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে এককালীন ১৪ লাখ টাকা অর্থ সহায়তা পেয়েছি। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরো ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয় আমাকে।

মাহবুবা আরো জানান, গতকাল সোমবার ঢাকার মিরপুর ১৪ নম্বরে একটি ফ্ল্যাটের চাবি দলিলের নকল বুঝে পেয়েছেন। আর জাতির পিতা মেমোরিয়াল কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্রতি মাসে চিকিৎসা খরচ বাবদ ১০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। এখনো চিকিৎসা চলছে জানিয়ে মাহবুবা বলেন, ভারত থেকে চিকিৎসা শেষে ফেরার পর ৫ বছর হুইল চেয়ার, ৭ বছর ক্র্যাচে ভর করে চলতে হয়েছে। এখনো হাতে লাঠি বা একজন লোক ছাড়া চলতে পারি না। এ এক কষ্টকর জীবন। কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরণ অনেক ভালো। মাঝেমধ্যে আত্মহত্যা করার কথা ভাবি। কিন্তু হয়ে ওঠে না, ২ ছেলে এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার কথা চিন্তা করে। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা-আমাকে নিজের সন্তানের মতো মায়া করেন, খোঁজ খবর রাখেন।

চাকরি পায়নি সবুজ : ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত সম্রাট আকবর সবুজ। আহত হিসেবে একটি সরকারি চাকরির আবেদন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের ২ বছর পরও চাকরি মেলেনি তার। সবুজ বলেন, শরীরের যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। এখনো বিচার শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ জানান সবুজ।

বর্তমানে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় দিন দিন শারীরিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে জানিয়ে সবুজ বলেন, উন্নত চিকিৎসা তো দূরের কথা অর্থভাবে জীবনযাপন করাই দুরূহ ব্যাপার। বেঁচে আছি জীবন্ত লাশ হয়ে। এ দুর্বিষহ এবং অভিশপ্ত জীবন আল্লাহ যেন আর কাউকে না দেয়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ ড. নমিতা হালদার এনডিসিকে প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই নির্দেশ প্রদান করেন আমাকে চাকরি দেওয়ার জন্য। কিন্তু আজো চাকরি পাইনি।

১০ লাখ করে টাকা পেলেন আজিজসহ ৩৯ জন : বদরুদ্দিন আজিজ কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা। তার শরীরেও রয়েছে অসংখ্য স্প্লিন্টার। গতকাল এ প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি বলেন, আমার জীবন শেষ। এখন কোনো কাজকর্ম করে খাবার মতো অবস্থা নেই। বঙ্গবন্ধু ও তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রীকে ভালোবাসি, আওয়ামী লীগকে ভালোবাসি। তিনি বলেন, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে ফোন পেয়ে গিয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। তিনি আমাকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। বদরুদ্দিন আরো বলেন, ওইদিন প্রধানমন্ত্রী আরো ৩৯ জন আহত ও পঙ্গু ব্যক্তিকে ১০ লাখ করে টাকা অনুদান হিসেবে দিয়েছেন। তারেক রহমানের নির্দেশে লুৎফজ্জামান বাবর, আলী আহসান মুজাহিদসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় এ হামলা হয় বলে জেনেছি। তদন্তে যারা অভিযুক্ত হয়েছে তাদের যেন সর্বোচ্চ সাজা দেয় আদালত।

গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশের আয়োজন করে। প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা বিকালে একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। তিনি মঞ্চ থেকে নিচে নামার সময় শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরো ১২ জন নিহত হন। আহত হন ৫ শতাধিক। এর মধ্যে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করে প্রায় অর্ধশত। কমপক্ষে আরো অর্ধশত ব্যক্তির শরীরে রয়ে যায় গ্রেনেডের স্প্লিন্টার। গুরুতর এই শতাধিক আহতের মধ্যে ঘুরে ফিরে অর্ধশত ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর নেক নজর ও সহায়তা পাচ্ছেন। বাকিরা সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে থেকে পার করছেন দুর্বিষহ জীবন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads